সভ্যতা ও সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠত্বে ব্রিটেন আজ অনেক উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত। একসময়ে দেশটি সারা বিশ্বজুড়ে দাপিয়ে বেরিয়েছে, তাই উপনিবেশভুক্ত দেশগুলো তাদের পুরোনো অভ্যাসবশত আজও অনেক ক্ষেত্রেই তাদের অনুকরণ করে থাকে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না প্রদীপের নিচেই থাকে অন্ধকার।
নারী-পুরুষের সমাধিকারে চলা আজকের ব্রিটেন, ভিক্টোরিয়ান যুগে মোটেই এমনি ছিল না। সে দেশেও একসময় পুরুষের সমান অধিকার পেতে নারীকে বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে, যা হয়ত এখন অনেকের বিশ্বাসের বাইরে।
আমাদের দেশের নারীরা যেমন ঘেরাটোপে বন্দি কিংবা যদি বলা হয় অবরোধবাসিনী, ঠিক তেমনটি হবহু না হলেও তাদেরকেও পুরুষের থেকে দুর্বল ভাবা হতো এই তিন শতাব্দী আগেই। সামাজিক অধিকারে পশ্চাৎপদ হয়ে তো থাকতেনই , তার সাথে শিক্ষাক্ষেত্রের অনেক ধাপেই মনে করা হতো অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন কিংবা অযোগ্য।
এমন এক সময়ে জন্ম নিয়েছিল ব্রিটেনের প্রথম নারী চিকিৎসক, যদিও তার নারী পরিচয়টি ছিল সকলের অগোচরে, তবুও তো তিনি পরবর্তী নারীদের জন্যে আলোকবর্তিকা।
১৭৮৯ সাল। আয়ারল্যান্ডের কর্ক শহরের এক মুদি দোকানির ঘরে জন্ম হলো একটি কন্যা শিশুর। নাম রাখা হলো মার্গারেট বাকলে। অনেক কষ্টের সংসার ছিল তাদের। একটা সময়ে অভাবে ঘর ভেঙে গেল তাদের। পিতার দ্বারা বিতাড়িত হয়ে মাকে নিয়ে পারি দেন লন্ডনে।
মার্গারেট বেশ মেধাবী ছিলেন। চোখে স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হবেন। সে সময়ে মেয়েদের সেবিকা হওয়াটা স্বীকৃত ছিল, কিন্তু চিকিৎসক হবার কোনো অনুমতি ছিল না। কোনো মহিলা ডাক্তারি পড়তে পারতেন না।
লন্ডনে ম্যারির শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন পেশায় চিত্রকর ভাই জেমস ব্যারি আর পারিবারিক বন্ধু ফ্রান্সিসকো ডি মিরান্ডা ও ডেভিড স্টুয়ার্ড। এরাই উৎসাহ আর সাহস জোগালেন। কঠোর সিদ্ধান্তে দাঁড়ালেন মার্গারেটের মা ম্যারি। মেয়েকে সাজিয়ে তুললেন পুরুষের বেশে। গায়ে চড়লো পুরু কোর্ট আর পায়ে উঠল তিন ইঞ্চি উঁচু হিলের জুতা।কালের গহ্বরে হারিয়ে গেল মার্গারেট। তার স্থানে সামনের পথ ধরল জেমস মিরান্ডা স্টুয়ার্ড ব্যারি। ম্যারির পরিচয় এখন তিনি জেমস ব্যারির ফুপি।
জেমস নাম নিয়েই ভর্তি হলেন এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদে। ভর্তি হলেন, কিন্তু শিক্ষক থেকে ছাত্র - সকলের সন্দেহের চোখ যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ল না তার। বরাবরই শুনতে হতে টিটকারী, কেমন কেমন মেয়েলি স্বর , অনুচ্চ গড়ন, মুখে এক চুল দাঁড়ি পর্যন্ত নেই, মসৃণ একটা অবয়ব - মনে হয় যেন ছেলেটা এখনো কৈশোর পার করেনি।
একদল লোক এই নিয়ে ভীষণ হাসাহাসি করে যেত, কিন্তু এসবের কোনো তোয়াক্কা না করেই নিরলস পরিশ্রম করে ২২ বছর বয়সেই জেমস ব্যারি সফলতার সাথে মেডিসিন আর সার্জারি পাস করে ফেললেন। পাশাপাশি শিখে নিলেন ধাত্রীবিদ্যা আর উদ্ভিদতত্ত্ব।
পড়াশুনা শেষ করতেই চাকরি হয়ে গেলো রয়েল মিলিটারি হসপিটালে। অগত্যা স্বপ্ন সফল করলেন ব্রিটেনের আর্মি বাহিনীর চিকিৎসক পদে উঠে। তো স্বাভাবিক অর্থেই পাড়ি জমাতে হলো ব্রিটিশ শাসনভুক্ত নানান দেশে, যার মধ্যে বেশিরভাগ ছিল দ্বীপরাষ্ট্র।
দক্ষিণ আফ্রিকা, কানাডা, মরিশাস, সেন্ট হেলেনা দ্বীপ, জ্যামাইকা, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ, মাল্টা, করফু (গ্রিসের একটি দ্বীপ) - এসব জায়গায় বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধে আহত ও নানা রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন।
তিনি প্রথম সফল সিজারিয়ান চিকিৎসক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তার শল্যবিদ্যার পারদর্শিতায় পেট ফুঁড়ে একটি শিশু পৃথিবীর আলো দেখেছিল। ধীরে ধীরে ব্যারি হয়ে উঠেছিলেন সবার ভরসা যোগ্য শল্যচিকিৎসক।
শুধু ডাক্তার ছিলেন না, ছিলেন আর্তের কন্ঠস্বর। কানাডায় চিকিৎসা শিবিরে থাকাকালীন বন্দী, মানসিক রোগী ও কুষ্ঠ রোগীদের স্বাস্থ্য ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার প্রতি তিনি বেশ মনোযোগী হন। কারণটি ছিল সেসময়ে কলেরা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া।
ব্যক্তিগত জীবনে ব্যারি নিরামিষাশী ছিলেন, যেকোনো ধরনের মদ্যপান অপছন্দ করতেন। জাহাজে করে যেখানেই পাড়ি জমাতেন সাথে যেত, তার সংগৃহীত বন্য প্রাণীর ছোট্ট একটি বহর। অবসরে ব্যারি পোষা কুকুর সাইকির সাথে সময় কাটাতেন। ব্যারি মানুষটি জনদরদী হলেও রেগে গেলে ভয়াবহ রূপ ধারণ করতেন, জিনিস ছোড়াছুড়ির মতো ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতেন কখনো। শোনা যায়, একবার নাকি নাইটেঙ্গেল ফ্লোরেন্সের সাথে ঘোর বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েছিলেন!
জীবনের শেষ সময়ে মারাত্মক ডায়রিয়া রোগে পড়েন। ব্যারির শেষ ইচ্ছা ছিল, তিনি যখন মারা যাবেন, তখন যে অবস্থায় থাকবেন, সেভাবেই যেন বিছানার চাদর পেচিয়ে তাকে দাফন করা হয়, শেষকৃত্যের জন্যে কোনো রকম দেহ শোধন ছাড়া। কিন্তু এই কথাটি তার মৃত্যুর পরে মানা হয়নি।
১৮৬৫ সালের ২৫ জুলাই আবিষ্কৃত হলো সেই চাঞ্চল্যকর সত্য। যখন তারপরিচারিকা যখন মৃতদেহ ধৌত করতে যান, তখন তিনি ভীষন স্তম্ভিত হয়ে পড়েন, ব্যারি নামের পুরুষটির দেহটি আসলে একটি নারীর দেহ। মানে ডাক্তার জেমস ব্যারি পুরুষ ছিলেন না। এই কথাটি ব্যারির ব্যক্তিগত ডাক্তার ম্যাক কিনোনকে জানানো হয়। ময়নাতদন্তে বেরিয়ে আসে সত্যি।
পরে ডাক্তার জানান, ব্যারি পুরুষ কিংবা নারীসেটা আমার মাথা ঘামাবার বিষয় না।
ডা.ব্যারির সম্পর্কিত সকল নথি লোপাট করে, ব্রিটিশ আর্মি পরবর্তী ১০০ বছর ধরে এই জ্বলন্ত সত্য কেনসাল গ্রিন সিমেট্রিতেই আজীবন চাপা রাখবার চেষ্টা করে যায়। কিন্তু অনুসন্ধিৎসু মানুষের নজরে ইতিহাস ধরা দিয়ে ফেলে।
ডাক্তার জেমস ব্যারি খুব সতর্কভাবে নারী পরিচয় গোপন রাখতেন। তিনি ঘরে বাইরে সব জায়গায় পুরুষের মতোই জীবন যাপন করতেন। এ জন্য যখন একা থাকতেন, তখন তার ব্যক্তিগত ঘরটিতে কারো প্রবেশের অনুমতি ছিল না।
ব্যারি যে পুরুষ নন, এ কথা যে একেবারেই কেউ জানতেন না এমন নয়। খুব ঘনিষ্ট জনেরা জানতেন। এদের সাথে যে চিঠি বিনিময় হতো, সেই চিঠিতে ব্যারির নাম থাকলেও, খামটি আসতো মিস বাকলের নামে।
বড় ভাইকে লেখা একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, "মেয়ে না হলে আমি সৈনিক হতাম।" ব্যারির এই সকল ব্যক্তিগত চিঠি হতেই অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে মার্গারেট বাকলেই ছিলেন ডা. জেমস ব্যারি, যিনি সৈনিকের মতোই অকুতোভয় হয়ে বিশ্বকে নীরবে জানিয়ে গিয়েছিলেন, চাইলে জীবন যুদ্ধে নিজের ঈপ্সিত অর্জন করা সম্ভব।
সুস্মিতা রায় বর্তমানে শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজে ৩য় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।