নব্বইয়ের দশকে জন্ম হয়েছে, এমন কমবেশি সবাই দাদী-নানীর কাছে গল্প শুনে ঘুমাতে যেত। গল্প শুনে ঘুমাতে যাওয়ার এটিই সম্ভবত শেষ প্রজন্ম। সেসব গল্পের মধ্যে রূপকথার ছিল বিশেষ আবেদন। আর এমনই এক গল্পের ভাণ্ডার হলো ‘ঠাকুরমার ঝুলি’, যা বহুবর্ষ ধরেই বাংলার লোকমুখে, বই-পুস্তকে প্রচলিত। লেখক জহির রায়হান থেকে ধার করে বলা যায়, হাজার বছরের পুরনো সেই গল্প।
ঠাকুরমার ঝুলি
কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধেয় দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারকে। তিনি এক শতাব্দী পূর্বে আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন পাড়াগাঁয়ের ঠাকুরমাদের মুখে প্রচলিত গল্প গুলোর সাথে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র সম্পর্কে বলেছিলেন, "দক্ষিণাবাবুকে ধন্য! তিনি ঠাকুরমার মুখের কথাকে ছাপার অক্ষরে তুলিয়া পুঁতিয়াছেন, তবু তাহার পাতাগুলি প্রায় তেমনি সবুজ, তেমনি তাজাই রহিয়াছে"।
১৯০৭ সালে বই আকারে প্রথম প্রকাশিত হওয়ার পর দক্ষিণা বাবুর সংগ্রহ ব্যাপক সাড়া ফেলে। এই জনপ্রিয়তার আরেকটি ঢেউ দেখি টেলিভিশনের যুগে। টেলিভিশনে কার্টুন সিরিজ আকারে ঠাকুরমার ঝুলির আত্মপ্রকাশ ঘটে। কার্টুন চরিত্রগুলোর কাণ্ডকীর্তি দেখে শিশু-বুড়ো সবাই হাসিঠাট্টা করার পাশাপাশি তাদের সাথে অনেকে নিজের সাদৃশ্য খুঁজে পায়।
আমাদের শৈশবের স্মৃতি ঘেরা কমিকসের পাতা উল্টোতে উল্টোতে টেলিভিশন পর্দা, হালের ইউটিউব চ্যানেল ইত্যাদিতে ঠাকুরমার আবির্ভাবের সাথে ভিন্ন মাত্রা যোগ হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আবির্ভাবে।
ঠাকুরমার জুলাই
নতুনভাবে, নতুন সাজে ঠাকুরমার ঝুলির চরিত্রগুলোকে নিয়ে এসেছেন মাসুদা খান। তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ও মানবিক বিভাগের সপ্তম সিমেস্টারের শিক্ষার্থী; বর্তমানে মেজর করছেন, ইংরেজি ভাষা শিক্ষাদানে। তাঁর আঁকাআঁকি নিয়ে একটি ফেসবুক পেজ আছে, যা ইতোমধ্যেই শিল্পপ্রেমীদের দৃষ্টি কেড়েছে। সেখানে তিনি দর্শকদের সাথে নিজেকে পরিচয় দেন ‘মাসু আঁকে’ বলে। ‘ঠাকুরমার জুলাই’ নামে (ঝুলি থেকে জুলাই) ২০২০ সাল থেকে জুলাই মাসব্যাপী এক অনলাইন আর্ট চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে তিনি প্রকাশ করে যাচ্ছেন চরিত্রগুলো।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘ঠাকুরমার ঝুলি’
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঠাকুরমার ঝুলির চরিত্রগুলোর আবির্ভাব গল্প আকারে নয় বরং কৌতুক বা মিম আকারে। এই কৌতুক বা ‘মিম’গুলোতে চরিত্রগুলোর সংলাপ বা সংলাপের অংশবিশেষ প্রকাশ পায়। ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের মন্তব্য সেকশনে আমরা এই সংলাপের প্রকাশ দেখতে পাই।
আসন্ন বিপদের আশঙ্কা থেকে যেমন, একই দিনে কয়েকটি এসাইনমেন্ট করতে হলে "আজ বোধহয় আর রক্ষে নেই" ধরনের মন্তব্য প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মন্তব্য সেকশন কিংবা ইনবক্সে করতে দেখা যায়।
বিনোদন হিসেবে
যেমনটা আগেই উল্লেখ করেছিলাম যে দর্শকরা নিজের সাথে চরিত্রগুলোর মিল খুঁজে পায়। তাই অনেকেই ঠাকুরমার ঝুলির চরিত্রগুলোর বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ‘পোস্ট দেয়। যারা সেই চরিত্রের সাথে নিজের মিল খুঁজে পায়, তারা তা ‘শেয়ার’করে।
সেসব পোস্ট অনুযায়ী, আপনি যদি একাকিত্বের জন্য হতাশা অনুভব করেন, একা একা কথা বলেন, কাউকে পছন্দ হলেই তাকে নিজের করে নিতে চান- তাহলে আপনার চরিত্রটি শাঁকচুন্নীর সাথে মিলে গেল!
অনলাইন আর্ট চ্যালেঞ্জ বা প্রতিযোগিতা
ইঙ্কটোবর (Inktober), নামটি বহুল পরিচিত। এটি হলো অক্টোবর মাসব্যাপী একটি আর্ট চ্যালেঞ্জ বা প্রতিযোগিতা, যা প্রতি বছর সারা বিশ্ব জুড়ে হয়ে থাকে। এই ইঙ্কটোবর থেকেই অনুপ্রাণিত হয়েই ‘ঠাকুরমার জুলাই’য়ের ভাবনা আসে মাসুদা খানের। শৈশব ইউরোপীয় ফেইরি টেইল শুনে কেটে গেলেও নিজের দেশের সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসাই, ‘ঠাকুরমার জুলাই’ সৃষ্টিতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে, জানান তিনি।
২০২০ সালের জুলাইয়ে, ঠাকুরমার ঝুলির চরিত্রগুলোকে রঙ-তুলিতে ফুটিয়ে তাঁর ইনস্টাগ্রাম ও ফেইসবুকে অ্যাকাউন্টে সবার সাথে ভাগ করে নেন। এই শিল্পী বলেন, "সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, মত বিনিময় এবং শেয়ারিংয়ের জন্য একটি কার্যকরী জায়গা। ফলে দর্শকের সাড়াও পেয়েছি খুব"।
চরিত্রগুলো কীভাবে বাছাই করেন- এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, "আমি প্রথমে কিছু বিখ্যাত চরিত্র বাছাই করেছি, কিছু করেছি উদ্ভট নাম শুনে। তারপর সবার কাছে নাম জানতে চেয়েছি। এতে অনেকেই সাড়া দিয়েছেন এবং দর্শকদের অনুরোধে প্রায় একশোটি চরিত্র বাছাই করেছি।”
শিল্পীর উদ্দেশ্য, সবার মাঝে শৈশবের প্রিয় ঠাকুরমার ঝুলিকে ভিন্ন ভাবে উপস্থাপন করে স্মৃতিকাতর করে তোলা। তিনি বলেন, "ঠাকুরমার ঝুলি সবার অতীতের সাথে জড়িত, তাই এটি নস্টালজিক হবে। তাছাড়া ‘বড় হয়েও কেউ কার্টুন দেখবে কেন?’ আমি এই ধারণাটিও ভাঙতে চাই"।
ভবিষ্যতে এই আর্ট চ্যালেঞ্জ চালিয়ে যাবার ইচ্ছা আছে কি না, এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন "যতদিন আমি বেঁচে থাকব, আঁকার জন্য সক্ষম থাকব, প্রতি বছর জুলাইয়ের একত্রিশ দিন এই কাজটি করার ইচ্ছা রাখি। এটা আমার নিজের প্রতি অঙ্গীকার"। তাছাড়া মার্চ মাসকে কেন্দ্র করেও আগামীতে ‘মার্চে (মাছে) ভাতে বাঙালি’নামে আরেকটি আর্ট চ্যালেঞ্জ করার ইচ্ছা পোষণ করেছেন তিনি।
একদা নবম-দশম শ্রেণীর পাঠ্য বইয়ের রচনা পল্লিসাহিত্যে ড: মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ আমাদের কাছে নিয়ে এসেছিলেন গ্রামবাংলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রূপকথা ও লোককথার অমূল্য রত্নখনি। ঠাকুরমার ঝুলির সংগ্রাহক দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের প্রশংসা করে বলেছিলেন, "বাংলাদেশের সমগ্র উপকথা এক জায়গায় জড় করলে বিশ্বকোষের মতো কয়েক বালামে তার সংকুলান হতো না"।
বর্তমান শিশু-কিশোর প্রজন্ম বই থেকে অনেকটা দূরে সরে গেলেও ঠাকুরমার ঝুলি ঠিকই তাদের নাগালে পোঁছে যাচ্ছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে দক্ষিণারঞ্জন বাবুর এই পরম্পরা হয়তো আজকের মাসুদাদের হাত ধরেই এগিয়ে যাবে।
মোঃ ইমরান খান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।
mohd.imranasifkhan@gmail.com
