Loading...

টেরারিয়াম – কাঁচের জারেই আস্তো বাগান!

| Updated: March 29, 2022 12:21:29


ছবি – দ্য স্পুস ছবি – দ্য স্পুস

কেমন হতো যদি ঘরের ভেতর অথবা টেবিলের উপরেই বেড়ে উঠতো একটি ক্ষুদ্র বাগান, যেখানে থাকবে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ও কীট পতঙ্গের সমারোহ; যা সময়ের সাথে বেড়ে উঠতো, তৈরি হতো স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি ইকোসিস্টেম। শুনতে কিছুটা অবাস্তব হলেও এর সবকিছুই সম্ভব টেরারিয়ামে।

টেরারিয়াম হলো ছোট আকৃতির একটি কাঁচের ঘর। অনেকটা অ্যাকুরিয়ামের মতো। তবে পার্থক্য হলো, অ্যাকুরিয়ামে থাকে মাছ আর টেরারিয়ামে থাকে গাছ!

ছোট আকারের গাছপালা, শৈবাল, ফার্ণ, নানান বর্ণের পাথর, আবার অনেক সময় ছোট ছোট জীবজন্তু ও পোকা-মাকড় দিয়ে সাজানো হয় টেরারিয়াম। এর কাঁচের আবরণ অনেকটা গ্রীন হাউজের মতো কাজ করে; বাইরে থেকে উত্তাপ ভেতরে প্রবেশ করলে সহজে তা আর বের হতে পারেনা। ফলে ভেতরের উদ্ভিদগুলো সতেজ থাকে।

ছবি – নিউইয়র্ক টাইমস

টেরারিয়াম অবশ্য বিভিন্ন আকৃতির হয়। অ্যাকুরিয়ামের মতো বড় আকৃতি থেকে শুরু করে হাতে রাখার মতো ছোট আকারের টেরারিয়ামও কিনতে পাওয়া যায়। ঘরে কৃত্রিম উদ্ভিদের পরিবর্তে টেরারিয়াম হতে পারে একটি আদর্শ আসবাব। কারণ এটি জীবন্ত এবং এর খুব একটা পরিচর্যারও দরকার পরে না।

টেরারিয়ামের ইতিহাস কিন্তু বেশ পুরোনো। বিশ্বের প্রথম টেরারিয়ামটি তৈরি হয় ১৮৪২ সালে। এটি তৈরি করেছিলেন নাথানিয়েল বাগশো ওয়ার্ড নামের একজন ইংরেজ উদ্ভিদবিদ। গবেষণাগারে কাজ করার পর ভুলবশত একটি কাচের বাক্স খোলা রেখে চলে যান তিনি। বেশ কিছুদিন পর ফিরে এসে দেখতে পান তার ভেতর একটি উদ্ভিদ জন্ম নিয়েছে। তখন তিনি বুঝতে পারেন কাঁচের বাক্সে আবদ্ধ অবস্থাতেও উদ্ভিদ বেঁচে থাকতে পারে।

ওয়ার্ড এরপর বিভিন্ন ডিজাইনের কাঁচের বাক্স তৈরি করে তাতে উদ্ভিদ রোপণ করতে থাকেন। এভাবেই সর্বপ্রথম টেরারিয়াম তৈরি করা হয়। তখন অবশ্য এটিকে টেরারিয়াম বলা হতো না। ওয়ার্ডের নামানুসারে এর নাম দেয়া হয়েছিলওয়ার্ডিয়ান কেইস

সে সময় ইংল্যান্ডে এই ওয়ার্ডিয়ান কেইস বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। এটি ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। ইংল্যান্ডের অভিজাতরা তাদের ঘরের শোভাবর্ধক হিসেবে ওয়ার্ডিয়ান কেইস রাখতে চাইতেন, তাই এটি তখন চড়া দামে বিক্রি করা হতো।

এমনকি এই কেইসে করে ইংল্যান্ড থেকে অস্ট্রেলিয়াতে উদ্ভিদ পাঠানো হতো। জাহাজের দীর্ঘ যাত্রাপথের পুরোটা সময় উদ্ভিদগুলো সতেজ হয়ে থাকতো।

এখন প্রশ্ন হলো টেরারিয়ামের ভেতর উদ্ভিদ জীবন্ত থাকে কিভাবে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে টেরারিয়াম তৈরির প্রক্রিয়ায়। টেরারিয়ামের ভূমি অনেকটা পৃথিবীর আদলে তৈরি। পৃথিবীর ন্যায় টেরারিয়ামের নিচে থাকে শক্ত নুড়িপাথরের স্তর, তার উপর থাকে কাঠকয়লার পাতলা আবরণ এবং সবশেষে প্রয়োজন অনুযায়ী মাটি দিয়ে উদ্ভিদ রোপনের জন্য প্রস্তুত করা হয়।

কাঠকয়লা মাটি থেকে ক্ষতিকর উপাদানগুলো শোষণ করে, অনেকটা ছাঁকনির মতো কাজ করে। কিছু ক্ষেত্রে কৃত্রিম আলোর ব্যবস্থাও রাখা হয়। টেরারিয়ামের কাঁচের দেয়াল উত্তাপ ধরে রাখে; অনেকটা গ্রীন হাউজের মতো। এ সকল কারণে টেরারিয়ামে উদ্ভিদ সামান্য পরিচর্যাতেও জীবন্ত থাকে।

টেরারিয়ামের বিভিন্ন লেয়ার।

সব উদ্ভিদ টেরারিয়ামে রাখা সম্ভব নয়। দ্রুতবর্ধনশীল উদ্ভিদের তুলনায় ছোট আকারের উদ্ভিদ যেমন শৈবাল, ফার্ণ, পেপারমোনিয়া ও ক্ষুদ্র লতাপাতা বিশিষ্ট উদ্ভিদ টেরারিয়ামে সংরক্ষণ করা সুবিধাজনক।

বাংলাদেশে এখনো টেরারিয়াম খুব একটা জনপ্রিয় নয়। মানসম্মতভাবে টেরারিয়াম তৈরিও হচ্ছে কম। বর্তমানে অবশ্য বেশকিছু ফেসবুক পেইজ রয়েছে যারা বিক্রির উদ্দেশ্যে টেরারিয়াম তৈরি করে থাকে।

তেমনই কিছু ফেসবুক পেইজ হলোদ্যা ওয়াইল্ড ফার্ণ’, ‘টেরারিয়াম’ এবংসাকুলেন্ট’। বিভিন্ন ডিজাইনের কাঁচের তৈরি বক্সে তারা বিচিত্র উদ্ভিদযুক্ত টেরারিয়াম তৈরি করে থাকে। কিছু পেইজ থেকে ঢাকার মধ্যে হোম ডেলিভারির সুবিধাও দেয়া হয়।

টেরারিয়ামগুলোর দামও অনেকটা হাতের নাগালে। টেরারিয়ামের আকার ও উদ্ভিদ অনুযায়ী এর দামের তারতম্য ঘটে। টেবিলে রাখার মতো ক্ষুদ্র আকৃতির টেরারিয়ামের দাম পনেরো’শ টাকা থেকে শুরু করে চার হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে বড় আকারের টেরারিয়ামের দাম কিছুটা বেশি। 

টেরারিয়াম ঘরের শোভাবর্ধন করে। বাতাসে ক্ষতিকর উপাদানের পরিমাণ কমিয়ে ঘরের পরিবেশকে সতেজ ও জীবন্ত করে রাখতে সাহায্য করে। টেরারিয়ামের সবুজ গাছপালা ও উদ্ভিদ অক্সিজেন সরবরাহ করে যা পরিবেশের জন্য উপকারী।

যারা বেশিরভাগ সময় ঘরেই সময় কাটাতে পছন্দ করেন এবং বিশেষ করে ঘরের পরিবেশকে সবুজ শ্যামল রাখতে চান তারা ঘরের ভেতর টেরারিয়াম রাখতে পারেন। এটি রক্ষণাবেক্ষণও খুব সহজ, সামান্য পরিচর্যাতেই টিকে থাকে বহুদিন। প্রিয়জনের জন্য টেরারিয়াম হতে পারে অসাধারণ একটি উপহার।

সাজিদ আল মাহমুদ বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়াশুনা করছেন

shajidmahmud11@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic