কোভিড সুনামির সতর্কতা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)। বলশালী শুঁয়া (করোনা) ভাইরাসের ধরন ডেল্টা এবং অতিসংক্রামক নবাগত ধরন ওমিক্রনের দাপটে করোনার সুনামি দুনিয়াকে ভাসিয়ে নিতে পারে বলে সতর্কবার্তায় উল্লেখ করা হয়। এতে করে বিশ্বের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা ব্যক্ত করে হু।
এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে আবারো টিকা প্রদানে সমতা প্রতিষ্ঠার তাগিদ দিয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান।
এবারে চলুন একটু ইশপের ষাঁড় ও কুকুরের গল্পের দিকে নজর দেই। খড়ের চাড়িতে কুকুর বসে আসে। খড় কুকুরের খাবার নয় মোটেও। ক্ষুধার্ত ষাঁড় বেচারা খড়ে মুখ দিতে গেলেই তেড়ে ওঠে কুকুর। ক্ষুধাকাতর এবং ক্লান্ত ষাঁড় অবাক গলায় বলে, এ কেমন বিচার? তুমি খড় খাচ্ছো না কিন্তু আমাকেও খেতে দিচ্ছো না!
খড়ের চাড়ির বদলে টিকা, ষাঁড়ের বদলে তৃতীয় বিশ্বের তুলনামূলক কম সম্পদশালী দেশগুলো এবং কুকুরের বদলে ইউরোপ এবং আমেরিকার ধনী দেশগুলোকে যদি পড়ি তাহলে আমাদের কল্পনায় চলমান পৃথিবীর চেহারাটাই ফুটে উঠবে।
আজ অব্দি যতটুকু জানা গেছে, করোনাভাইরাসের যে কোনো ধরন ঠেকাতে কমবেশি কার্যকর হচ্ছে টিকা। প্রয়োজনে দিতে হচ্ছে বুস্টার ডোজ। আর এতে স্বস্তির শ্বাস ছাড়ার অবকাশ পাচ্ছে সম্পদশালী দেশের মানুষগুলো। পরম আরামে কফির কাপে দিতে পারছে নিরুপদ্রব চুমুক।
কিন্তু দুনিয়ায় উঁচু এবং নিচু আয়ের দেশগুলোতে টিকার ক্ষেত্রে রয়েছে আকাশ ছোঁয়া অসাম্য। এতে কফির কাপে কড়া চুমুক দেওয়ার আগে আরেকবার ভাবতে হবে। পরিস্থিতি এমন যে বিশ্বের জন্য করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রন নিয়ে আসতে পারে মহা বিপদ। সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হলে যে সব রোগ-বালাই ঠেকানো যায়, তারই কাতারে পরে ওমিক্রন। কিন্তু তা না হলে, উন্নয়নশীল পৃথিবী আবার নতুন করে পড়বে অকাল মৃত্যু আর অসহনীয় দারিদ্র্যের কবলে। এসব শঙ্কার মধ্য দিয়েই বিশ্বের এ প্রান্তের মানুষগুলো বিশ্বমারির বিরুদ্ধে অসম লড়াই করছে।
শান্ত মনে কফিতে চুমুক দেওয়ার আগে আরো একটা বিষয়ে ভাবতে হবে, টিকা অসাম্য হটিয়ে দিতে সরকাররা (পড়তে হবে সমৃদ্ধ-সরকাররা) জরুরি ব্যবস্থা না নিলে ঘটনা আরো খারাপই হবে। করোনার আরো ধরন আসতে থাকবেই। কোনো কোনোটি হয়তো টিকার প্রতিরক্ষার প্রাচীর পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মতোই চালু হবে। দ্যা কনভারসন ডট কমে এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের লা ট্রাব বিশ্ববিদ্যালয়ের গণস্বাস্থ্যের সহযোগী অধ্যাপক ডেবোরা গ্লিসন।
টিকা নিয়ে যত অসাম্য
গত নভেম্বরের শেষ নাগাদ, দুনিয়ার প্রায় ৫৪.২ শতাংশ মানুষ কোভিড-১৯’এর অন্তত এক ডোজ টিকা নিয়েছে। তবে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এরকম টিকা নেওয়ার হার মাত্র ৫.৮ শতাংশ।
উচ্চ-আয়ের এবং উচ্চ-মধ্যম-আয়ের এবং অন্যদিকে নিম্ন-আয়ের দেশগুলোর মধ্যে টিকা দেওয়ার হার নিয়ে বিশাল একটা ব্যবধান বিরাজ করছে। এখানে টিকা অসাম্যের মাত্রা হয়ে উঠেছে প্রকট।
আফ্রিকাতে টিকা দেওয়ার হারে অন্ধকার বিরাজ করছে। ৪০টি বা তারও বেশি দেশে তাদের মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশের কমকে পুরোপুরি টিকা দেওয়া গেছে। দুঃখজনকভাবে সত্যি হলো, এ দেশগুলোর বেশির ভাগকে খুঁজে পাওয়া যাবে আফ্রিকা মহাদেশের মানচিত্রে।
টিকা অসাম্য রাতারাতি দেখা দেয়নি। বিশেষজ্ঞরা বিশ্বমারির সূচনাকাল থেকেই কোভিড-১৯’এর টিকা নিয়ে অসাম্য রয়েছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এতদিন পরে তাহলে কেন এখনো এ সমস্যা জিইয়ে আছে-এবারে সেটাই প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।
কোভ্যাক্সের প্রতিশ্রুতি ফাঁকা বুলি হয়ে দেখা দিলো
কোভিড-১৯’এর টিকা কেনা এবং বিতরণের বৈশ্বিক কর্মসূচি কোভ্যাক্স পড়েছে ‘মাইনক্যা চিপায়’। জন্মের পর থেকেই এ কর্মসূচি পর্যাপ্ত টিকা যোগাড় করতে সমস্যার অথই সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে।
প্রায় ১০০ নিম্ন আয়ের দেশ টিকার জন্য ভরসা করছে এ কর্মসূচির ওপর। ২০২১ সাল শেষ হওয়ার আগেই ২ বিলিয়ন ডোজ টিকা বিতরণ করার প্রাথমিক কর্মসূচি ছিল কোভ্যাক্সের। উন্নয়নশীল দেশগুলোর উঁচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে -- এমন নাগরিকদের টিকা দেওয়ার জন্য এ সংখ্যাকে যথেষ্ট গণ্য করা যায়। কিন্তু সেপ্টেম্বরে টিকা বিতরণের সে সূচিকে বদল করে কোভ্যাক্স। এবারে বলে, ২০২১ সালের শেষ নাগাদ তারা কেবল ১.৪২৫ বিলিয়ন টিকা বিতরণ করতে পারবে। তবে নভেম্বরের শেষ নাগাদ দেখা গেল, কার্যত বিলি হয়েছে ৫৭ কোটি ৬০ লাখ ডোজ টিকা।
এখানে খড়ের চাড়িতে কুকুর বসে থাকার সেই নাটকীয় ঘটনাই ঘটে। সমৃদ্ধ দেশগুলো তাদের অর্থশক্তির জোরে বিক্রি-পূর্ব চুক্তির দৌলতে হাতিয়ে নেয় সাড় সাত বিলিয়ন টিকা। আর কোভ্যাক্সের বরাতে রইলো উচ্ছিষ্ট সামান্য সংখ্যক টিকা!
পর্যাপ্ত তহবিল এবং টিকার অভাব নিয়ে জন্ম থেকেই ভুগছে কোভ্যাক্স। বাংলাদেশে অনেক ট্রাকের জ্বালানি আধারে লেখা থাকে ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’। এ বাক্যই যেনো কোভ্যাক্সের বরাত-লিপি হয়ে উঠেছে! অন্যদিকে, জটিল বেতো রোগীর মতোই কার্যত অচল হয়ে পড়ে কোভিক্সের টিকা কর্মসূচি। এদিকে বুস্টার ডোজের জন্য টিকার মজুতদারি করছে সমৃদ্ধ দেশগুলো। আর এতে করে অতি প্রয়োজন এমন দেশগুলোতে কোভ্যাক্সের টিকা সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোই অনশনে মরার দশায় পড়েছে। প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে এ ব্যবস্থা।
দানের টিকাও আসেনি শেষে
স্বল্প এবং মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে প্রচুর পরিমাণে টিকা দানের প্রতিশ্রুতি দিতে ধনী দেশগুলো নতুন গ্রাম্য বউয়ের মতোই শরমের প্রকাশ ঘটিয়েছে। তারপরও লাজনত শিরে টিকা দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তাও এখনো বাস্তবায়ন করেনি। ২৫ অক্টোবরের মধ্যে তারা ১.৩ বিলিয়ন ডোজ টিকা দেওয়ার অঙ্গীকার করলেও শেষ পর্যন্ত তার মাত্র ১০ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে।
বিশ্ব জুড়ে টিকা দেওয়া শেষ না করা পর্যন্ত বুস্টার ডোজের টিকার কর্মসূচি নিজ নিজ দেশে না চালু না করার একান্ত আবেদন জানায় হু। টাকাওলা দেশগুলো হু এর সে আহ্বানকে পাত্তাই দেয়নি। ওদিকে সীমান্তহীন চিকিৎসক বা এমএসএফ হিসাব দিয়েছে যে বুস্টার দেওয়ার পরও ২০২১ সাল শেষে বিশ্বের ১০ বিত্তশালী দেশের চিকিৎসা ভান্ডারে ৮৭ কোটি বাড়তি টিকা মজুত থাকবে। এগুলো হবে সেই চাড়ির খড়। বিক্রয়পূর্ব চুক্তির আওতায় এক অস্ট্রেলিয়াই কিনেছে ২৮ কোটি ৮ হাজার টিকার ডোজ। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, প্রতি অস্ট্রেলিয়বাসীর মাথা পিছু ১০ ডোজের বেশি টিকা কিনে মজুত রাখা হয়েছে।
বাণিজ্য বিধিতে পরিবর্তন আসেনি
কোভিড-১৯ সংক্রান্ত স্বাস্থ্য-পণ্য এবং প্রযুক্তি যেন কোন ওষুধ কোম্পানির একচ্ছত্র আধিপত্য না থাকে মানবিক সে লক্ষ্যকে সামনে এনে বাণিজ্য বিধিমালায় সাময়িক পরিবর্তন চাওয়া হয়েছিল। টাকার কুমীর দেশগুলো এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করতে আদা পানি খেয়েই নেমেছে।

২০২০এর অক্টোবরে প্রথম এ প্রস্তাব দেয় ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকা। এটি কার্যকর হলে মেধাসত্ত্বের মামলা খাওয়ার ভয় থাকবে না। মুক্তভাবেই বিশ্বের দেশগুলো বানাতে পারবে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত স্বাস্থ্য-পণ্য এবং প্রযুক্তি। বর্তমানে ৬৩ দেশ এ প্রস্তাবের প্রতি সহ সমর্থন ব্যক্ত করেছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ১৬৪ দেশের মধ্যে একশ’র বেশি দেশের সমর্থন পেয়েছে এ প্রস্তাব। টিকার মেধাসত্ত্ব প্রত্যাহার করবে বলে মে মাসে আভাস দেয় আমেরিকা। তারপরও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাবের প্রতি সহ সমর্থন দেয়নি। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য এবং সুইজারল্যান্ড এ প্রস্তাব বিরোধী ভূমিকা অব্যাহত রেখেছে। বিশেষ করে জার্মানি প্রস্তাবের বিপরীতে কঠোর বিরোধিতা করছে। অথচ এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে কোভিড-১৯ চিকিৎসায় ব্যবহৃত সবকিছু সহজে তৈরি করতে পারতো স্বল্প আয়ের দেশগুলো।
জেগে উঠুন, সময় নেই
টাকার কুমীর দেশগুলো টিকার মজুদ গড়ে তুলছে। প্রয়োজনীয় টিকা এবং তহবিলের যোগান না দিয়ে কোভ্যাক্স কর্মসূচিকে ‘হাতে না মেরে ভাতে মারার’ কৌশল বেছে নিয়েছে। এখানেই শেষ নয়, প্রতিশ্রুত দানের অর্থ ফোঁটা ফোঁটা করে ছাড়ছে! বাণিজ্য বিধিমালায় সাময়িক সংস্কার করার প্রস্তাবও রুখে দিচ্ছে। এতে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ব্যাপকভাবে কোভিড-১৯ স্বাস্থ্য পণ্য, টিকা এবং প্রযুক্তি তৈরির কাজ বাধায় পড়েছে।
ওমিক্রনের করাল ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে বোঝা যাচ্ছে, বিশ্বে টিকা তৈরি ও বিতরণের উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়ছে। দাবানল দ্বারে এসে গেছে। এখনি জেগে না উঠলে আর সময় পাওয়া যাবে না। খেদাতে হবে চাড়ির খড়ের ওপর বসে থাকা কুকুর। ক্ষুধাকাতর ষাঁড়কে খেতে দাও খড়!
