ইলিশ না চিংড়ি? ইস্টবেঙ্গল না মোহনবাগান? ঝাল না মিষ্টি? ওপার বাংলায় এ প্রশ্নগুলো হরহামেশাই শোনা যায়।
পার্ক স্ট্রিট থেকে হাওড়া ব্রিজ, কফি হাউজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, গড়ের মাঠ থেকে টালিপাড়া, হেন স্থান নেই যেখানে প্রতিদিন বাঙাল-ঘটির খিস্তি-খেউড় লাগে না।
পূর্ববঙ্গে, অধুনাতন বাংলাদেশে, বাঙাল-ঘটির খুনসুটি সেভাবে চোখে পড়ে না। মরমে ধরমে এদিককার সবাই বাঙাল।
কবে এবং কোত্থেকে এ দ্বন্দ্বের উদ্ভব হলো সেটি বলা মুশকিল। কলকাতার জন্মের আগে থেকেই কি বাঙাল-ঘটি বলে কিছু ছিল?
দুই বাংলা এক থাকলে অথবা নগর হিসেবে কলকাতার পত্তন না হলে হয়ত বাঙালির ভেতর সাংস্কৃতিক দ্বিধাবিভক্তি হিসেবে বাঙাল-ঘটির উদ্ভব হতো না। পূর্ববঙ্গীয় বাঙালিদের কলকাতাকেন্দ্রিক বাঙালিরা আনুষ্ঠানিকভাবে লেখাজোখায়, শিল্প-সাহিত্যে বাঙাল' বলা শুরু করে উনিশ শতকের মাঝের দিকে।
জনপদের যুগে পূর্ববঙ্গের অনেকটা অংশ বঙ্গ নামীয় জনপদের অংশবিশেষ ছিল। বঙ্গ থেকে বঙ্গাল, বঙ্গাল থেকে বাঙাল।
তৎকালীন পূর্ববঙ্গ শিক্ষা-দীক্ষায় কলকাতার চেয়ে অনেক পিছিয়ে ছিল। তাই কলকাতার বাবুদের মুখের বাঙাল' ডাকটি এ পারের অধিবাসীদের প্রতি ব্যঙ্গ-তাচ্ছিল্যপূর্ণ একটি বিশেষণে পরিণত হয়।
বাঙালরাও কম কীসে? তারা ওপারের বাঙালিদের ঘটি' ডাকা শুরু করে। প্রত্যুষের প্রাতঃকৃত্য সারতে ঘট (ছোট কলসি) হাতে ওদের দৌড়াদৌড়ি দেখে বাঙালরা ঘটি' ডেকে প্রতিশোধ নেয়।
৪৭ সালে দেশভাগের সময় মোটামুটি কোটিখানেক হিন্দু ওপারে গিয়ে আশ্রয় নেয়। পরের বছরগুলোতেও দেশত্যাগের ধারা অব্যাহত ছিল। একাত্তরে শরণার্থী হয়ে যারা গেল তাদের অনেকেই আর ফেরেনি।
এভাবেই পশ্চিম বাংলায়, বিশেষ করে কলকাতায়, পূর্ববঙ্গীয় সংস্কৃতির বাহক একটি সম্প্রদায় তৈরি হতে শুরু করে। তারা স্ব যোগ্যতায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে বহাল হয়। তারা এপারের ভিটেমাটি ছেড়ে দিলেও খাদ্যাভ্যাস, লোকাচার ছাড়তে পারেনি।
সর্ষে ইলিশ, পেঁয়াজ ইলিশ, শুঁটকির ভর্তা-তরকারি এগুলো সবই তারা নিয়ে গেল সাথে করে। পাড়ায় বাঙাল বৌ শুঁটকির তরকারি রাঁধলে পাড়াসুদ্ধ ঘটিরা নাকে কাপড় দিয়ে টিটকারি দেওয়া শুরু করলে পরদিন ঘটি বউ যখন ঝোল-অম্বলের তরকারিতে মুঠোভরে চিনি ঢালতো, বাঙালরা ঢোলে বাড়ি দিয়ে টিপ্পনী কেটে দিত। এভাবেই বাঙাল-ঘটির প্রণয়কলহের শুরু।
যদি ঘটিরা বলে, ইলিশ নয় চিংড়ি হলো গিয়ে সেরা মাছ। তক্ষুনি বাঙালরা বলে উঠবে, ছিহ! চিংড়ি হইলো গিয়া জলের পোকা। পোকা আবার সেরা হয় ক্যামনে?
ঘটিরা বাঙালদের শুঁটকি খাওয়া নিয়ে খোঁটা দিলে বাঙালরা তাদের চিনি খাওয়া নিয়ে খোঁটা দেবেই। বরাবরই ঘটিরা ঝাল কম খায়। তাই বলে তরকারিতে চিনি? দইয়েও কয়েকচামচ চিনি দিয়ে খায় কেউ কেউ।
ঘটিদের দাবি বাঙালরা রান্নায় আলু-পটলের খোসা অব্দি বাদ দেয় না, তাই ওরা সর্বভুক। বাঙালরা বলে ঘটিরা কিপটে।
লড়াই গড়িয়েছে খেলার মাঠেও। ইস্টবেঙ্গল বনাম মোহনবাগান--কলকাতা ডার্বির সবচেয়ে উত্তেজনাকর ম্যাচ। বাঙালদের দল ইস্টবেঙ্গল, ঘটিদের মোহনবাগান।
তবে এখন আর সেরকম নেই। ঘটি হলেই যে মোহনবাগানের অন্ধভক্ত হতে হবে এমনটি একদমই নয়। দুই দলের খেলোয়াড় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও আর বাঙাল-ঘটির ভেদ মানা হয় না।
বাঙাল-ঘটির পার্থক্যসূচক আরেকটি বিষয় আছে- লক্ষ্মীপূজা। বাঙালরা লক্ষ্মীপূজা করে পূর্ববঙ্গীয় কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার কায়দায়। খিচুড়ি, পোলাও, নাড়ু-মোয়া ভোগ দেওয়া হয়। মান্দাসের ভেলা ও ধানের শীষ দিয়ে পূজা সারা হয়। অন্যদিকে ঘটিরা তাদের লক্ষ্মীপূজায় নিরামিষ ভোগ দেয়। পূজার দিনক্ষণ নিয়েও দুই গোষ্ঠীর ভেতর পার্থক্য দেখা যায়।
এখন কলকাতার রাস্তায় হাঁটলে শুধু মুখের কথা শুনে ঘটি-বাঙাল আলাদা করা মুশকিল। যারা শরণার্থী হয়ে গিয়েছিল তাদের অনেকেই আর বেঁচে নেই। তাদের অধস্তন পুরুষেরাই এখন বাঙালদের সংস্কৃতির ধারক। তাদের মুখের বুলি আর পূর্ববঙ্গীয় খাইমু, আইতাছি, ক্যান' নেই। তারা এখন চলনে-বলনে ওখানকার স্থানীয়তে পরিণত হয়েছে।
তবুও, কফি হাউসের আড্ডায় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অথবা সৌরভ গাঙ্গুলীর দাদাগিরিতে তাদের বাঙাল রিফিউজি, ভালো সাঁতারু, কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রমকারী - এ ধরনের টক-ঝাল-মিষ্টি আক্রমণ হজম করতে হয় মাঝে মাঝেই।
মেহেদী হাসান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
mahedi.bcpsc.2016@gmail.com