Loading...

জেমস বন্ডকে ‘বধিবে যে নিরাপদে বাড়িছে সে!’

| Updated: January 03, 2022 19:52:19


ছবিঃ ইন্টারনেট ছবিঃ ইন্টারনেট

জেমস বন্ড কোনো দুর্দান্ত অভিযান চালাতে গিয়ে প্রাণ হারাতে পারেন। এটাই স্বাভাবিক তাই না? না, কথাটা মোটেও ঠিক নয়। বরং সত্যি কথাটি হলো জেমস বন্ডকে ‘বধিবে যে নিরাপদে বাড়িছে সে!’

‘কিস কিস ব্যাং ব্যাং’ হিসেবে পরিচিত ‘শত্রু দেখলে গুলি করো, নারী দেখলে চুমু খাও’ দর্শনের প্রবক্তা, ব্রিটেনের সবচেয়ে খ্যাতিমান কল্প-নায়ক, দুঁদে গুপ্তচর জেমস বন্ড সাহেবের মৃত্যু বহুবার ঘটতে পারতো। হয়তো শত্রুর গুলিতে নয়। কিংবা প্রায় অসম্ভব সব অভিযান পরিচালনা করতে গিয়েও নয়। বরং সাধারণ স্বাস্থ্যবিধিকে কাঁচকলা দেখিয়ে বেপরোয়া জীবনযাপন বা উদ্দামলীলায় মেতে ওঠাই তার কাল হতে পারতো। হতে পারে। এমন জীবন-আচারের ফলে সাধারণ রোগে ভুগে ভবলীলা সাঙ্গ হওয়ার মতো নানা কার্যকারণ অহরহ ঘটেছে। বন্ড এসব পরিস্থিতির হাত থেকে বেঁচে ফিরেছেন সেটা তার স্বাস্থ্যের জোরে নয়। বা অসম্ভব কোনো ওষুধের গুণে নয়। বরং প্রবাদে বর্ণিত ‘গাঁজার নাও পাহাড় বেয়ে যাওয়ার’ যুক্তির কৃপায়। জেমস বন্ড তার স্বাস্থ্য-অভ্যাস না পাল্টালে একদিন রোগে ভুগেই মারা যেতে পারে।

জেমস বন্ডের এমন মৃত্যু আশঙ্কার কথা বলছেন একদল গবেষক। ১৯৬২ সালে তৈরি ‘ড. নো’ থেকে ২০২১ সালে তৈরি ‘নো টাইম টু ডাই’ পর্যন্ত এওন প্রোডাকশনের আওতায় ২৫ চলচ্চিত্র খতিয়ে দেখে এ আশঙ্কা প্রকাশ করে গবেষক গোষ্ঠী। মেলঅনলাইনে এ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন জোনাথন চ্যাডউইক।

চলচ্চিত্রগুলোতে সব মিলিয়ে পর্যায়ক্রমে ৮৬ দফা বিদেশ ভ্রমণ করেন বাহাদুর বন্ড। সফরকালে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ উপদেশ কতোটা মেনে চলেন গোয়েন্দা মহাশয় তা গবেষক দলটি বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন। তারা বলেন, কাল্পনিক না হয়ে রক্তমাংসের মানুষ হলে বন্ডকে ভুগতে হতো সেক্সচুয়ালি ট্রান্সমিটেড ইনফেকশনস (এসটিআইএস), মদজনিত বিষক্রিয়া, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়াসহ উষ্ণমণ্ডলীয় রোগ-বালাই এবং স্বাস্থ্যজনিত অন্যান্য বিপদ-আপদে।

এওন প্রোডাকশনের সিনেমাগুলোতে বন্ড যে সব ঝুঁকিতে পরেছেন তাতে রয়েছে মদপান (‘ক্যাসিনো রয়েলে’ দেখা গেছে), অন্যের ব্যবহার করা মুখোশ দিয়ে বিনা দ্বিধায় নিজের মুখ ঢাকা, (‘ইউ অনলি লিভ টোয়াইস’) স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই এসটিআইএসের আশঙ্কা বাড়ায় এমন লীলা-খেলা (‘গোল্ড ফিঙ্গার’) আধোয়া ফল খাওয়া (‘থান্ডারবল’) উষ্ণমণ্ডলীয় রোগ এবং ধুমপানজনিত মৃত্যু (উভয়ই ঘটতে পারতো ‘ড. নো’তে)।

অভিযান চালানোর সময়ে পেশাগত হুমকির আওতায় আসে এমন সব পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছেন বন্ড। তবে কোথাও কোথাও এসব হুমকি বা ঝুঁকি সতর্ক হলেই এড়ানো যেতো। গবেষক দলটি ব্যক্ত করেছে এমন অভিমতও ।

বন্ডকে নিয়ে এ গবেষণা করেন লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন-এর উইলিয়াম স্টোনসহ নেদারল্যান্ডের রাডবউড ইউনিভার্সিটি মেডিক্যাল সেন্টার, নিজমেগেনের ওয়াউটার গ্রাউমানসা এবং তেউন বাউসমাব। গবেষণাপত্রটি ট্রাভেল মেডিসিন অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।

বন্ড চলচ্চিত্র দেখতে তিন গবেষকের ৩,১১৩ মিনিট ব্যয় করতে হয়েছে। ‘নো টাইম টু ডাই’ মুক্তি পায় গত সেপ্টেম্বরে। এটি দেখার জন্য নোটবই বগলদাবা করে এবং কলম বাগিয়ে সুবোধ বালকদের মতোই প্রেক্ষাগৃহে যান গবেষকরা। গোটা প্রেক্ষাগৃহে সম্ভবত তারাই একমাত্র দর্শক যারা ছবি দেখার জন্য নোটবই ও কলম বাগিয়ে চোখ-কানা খোলা রেখে বসে ছিলেন। ছবি দেখতে দেখতে পপকর্ন খাওয়ার ফুরসত তাদের হয়নি সে কথা বাজি ধরেই বলা যায়!

গবেষকরা দেখতে পান, চলচ্চিত্রগুলোতে বন্ডের ৫৯ দফা যৌন সংযোগ ঘটেছে। প্রতি চলচ্চিত্রে গড়ে ২.৪ দফা এমন সংযোগ ঘটেছে বন্ডের। বন্ডের লীলাবতীদের মৃত্যু হার উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি। কেউ কেউ মিলনের পরপরই যমদূতের কবলে পড়েছেন। এই লীলাবতীদের এক চতুর্থাংশেরও বেশি শেষ পর্যন্ত জানে বাঁচতে পারেননি। তবে তারা যে যৌন রোগে ভবলীলা সাঙ্গ করেছেন হালকা চালে এমন কোনো ইশারাও কোথাও করা হয়নি। উদাহরণ হিসেবে জিল মাস্টারসনকে বেছে নেওয়া যায়। ১৯৬৪’এর ‘গোল্ডফিঙ্গারের’ জিল মাস্টারসনের সঙ্গে দেখা হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার মিলন ঘটে বন্ডের সাথে। এরপরই সারা দেহে স্বর্ণ-প্রলেপ দিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে জিলকে হত্যা করা হয়। প্রলেপ দেওয়ার কাজটি করে ফাঁসুড়ে ওডজব।

নেদারল্যান্ডের ইউট্র্যাক্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর রিচার্ড জেগার্স জেমস বন্ডের প্রথম ২৪ চলচ্চিত্র নিয়ে সমীক্ষা চালান। তিনি দেখতে পান, গড়ে  ২.৩ সাক্ষাতের পর নারীকে প্রলুব্ধ করেছেন বন্ড। বন্ডের কাঙ্ক্ষিত নারীদের ২৭.৮ শতাংশেরও বেশি প্রথম পরিচয়ের পরই নিজেদেরকে সঁপে দেয়। এর মধ্যে প্রথম দেখা হওয়া থেকে এবং শয়নগৃহ পর্যন্ত যেতে বড় জোর সাত থেকে আট বাক্য ব্যবহৃত হয়।

অবশ্য ২৪ ছবিতে তুলনামূলকভাবে একটু বেশি সময় লাগে বন্ড সাহেবের। প্রতি দফায় নারী পটাতে গড়ে ৩৭ বাক্যে ব্যয়ের দরকার পড়ে তার।

কিন্তু এমআই৬’এর দুর্দান্ত গোয়েন্দা নিরাপদ যৌন জীবনে নিরাপত্তার  অনুশীলন করেছেন এমন একটি ইঙ্গিতও কোনো ছবিতেই নেই। সমালোচকরা উল্লেখ করেন যে বন্ডের সর্বশেষ সাড়া জাগানো অভিযানে, 'নো টাইম টু ডাই' এর একটি দৃশ্যে ০০৭ নারী সহকর্মীদের বিছানায় মুগ্ধ করতে ব্যর্থ হন বন্ড। সর্বশেষ চলচ্চিত্র মুক্তি পাওয়ার আগে এক সাক্ষাৎকারে অভিনেতা ড্যানিয়েল ক্রেগ স্বীকার করেন যে তার চরিত্রটি “খাপ খাইয়ে নিতে হয়েছে” এবং “আগের ছবিগুলোতে যা হয়েছে তা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে।”

অন্যদিকে শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ ঘটায় এমন ভাইরাস বা ব্যাধির বিষয়ে বন্ডের যেন জানাশোনাই নেই! কিংবা এ বিষয়টি আমলে নেওয়ার কোনো গরজ তার ছিল না। ‘ইউ অনলি লিভ টোয়াইস’এ অন্যের সদ্য ব্যবহার করা মাস্ক বা মুখোশ দিয়ে নিজের নাক-মুখ ঢাকেন বন্ড। আত্মগোপন করার জন্য এ পথে বেছে নেন বন্ড।

ভদকা মার্টিনির প্রতি রয়েছে বন্ডের প্রচণ্ড আসক্তি। বন্ড নিজ পানীয় দেওয়ার জন্য বলেন, “ঝাঁকুনি দেওয়া হোক, ঘোটা নয় (stirred not shaken)”। তবে মোদ্দা কথা হলো, ঝাঁকুনি দেওয়াই হোক আর ঘোটা, তাতে এ সুরা পান করে পানি শূন্যতার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না। এ পানীয় গলধারণ করার পর উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে তীব্র দৈহিক কসরত চালালে শরীরের পানি ঘাম হয়ে বের হয়ে আসবে। তীব্র পানিশূন্যতা থেকে বন্ড ঠিক কীভাবে রক্ষা পান তার কোনো বর্ণনা নেই কোথাও। 

ছবিগুলোতে মাত্র তিন দফা বন্ড সুরাবিহীন পানীয় গ্রহণ করেন। ‘ফ্রম রাশিয়া উইথ লাভ’এ কমলার রস, ‘ড. নো’তে কফি এবং ‘ক্যাসিনো রয়্যাল’এ নুন-পানি গ্রহণ করেন তিনি।

অবশ্য দেহে তরল পদার্থের ভারসাম্য বজায় রাখার কাজকে মোটেও সহায়তা করবে না নুন-পানি। বমি করে মারাত্মক বিষ উগড়ে দেওয়ার চেষ্টায় নুন পানি খান বন্ড।

এদিকে, মাত্রাছাড়া মদ সেবনের মধ্য দিয়ে ম্যালেরিয়া মশার কাছে বন্ডের দেহকে অধিক মাত্রায় আকর্ষণীয় করে তোলা হয়। এছাড়া, মদ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে যকৃতকেও। প্রথম দিকের ছবিগুলোতে বন্ডকে ঘন ঘন ধূমপান করতে দেখা যায়। অবশ্য ড্যানিয়েল ক্রেগের সময় থেকে এ বদ অভ্যাস বাদ দেওয়া হয়।

বিলাসী ভোজের প্রতি বন্ডের অসীম আসক্তির কথা নতুন করে বলার দরকার নেই। তবে এখানেও ওত পেতে আছে নানা ঝুঁকি। ‘থান্ডারবল’এ আঙ্গুর চুরি করেছেন বন্ড। না ধুয়েই ফল গিলছেন গোয়েন্দা সাহেব। ভুলে যাচ্ছেন ফলের খোসায় রয়েছে হরেক জীবাণুর বিচিত্র হাট। এতে হতে পারে ভাইব্রোসিস। থাকতে পারে নোরোভাইরাস। উভয় ক্ষেত্রে হতে পারে ডায়রিয়া, তলপেটে প্রচণ্ড ব্যথা, বমি বা বমি বমি ভাব, মাথা ব্যথা, শীত শীত বোধ। হতে পারে হেপাটাইটিসসহ আরো নানা ঝুঁকিপূর্ণ রোগ।

ওয়েস্টর বা ঝিনুকের প্রতি রয়েছে বন্ডের প্রচণ্ড টান। এটি উত্তেজনা শক্তি বাড়ায় বলে মনে করেন বন্ড। কিন্তু এটিও উত্তেজনা শক্তি না বাড়িয়ে বরং পেট খারাপের মতো বিব্রতকর অসুখ ডেকে আনতে পারে।

গবেষক দলটি বেশ তাজ্জব হয়ে গেছে এটা দেখে যে বিশ্ব রক্ষার অভিযানে বারবার নেমেছেন এই ২৫ ছবিতে, কিন্তু একবারও ডায়রিয়ার মতো অসুখের কবলে পড়েননি বন্ড! বন্ডের হতে পারতো হুকওয়ার্মের মতো মারাত্মক কৃমি, ম্যালেরিয়া, মশার কামড়ে যন্ত্রণাদায়ক ক্ষত, খাদ্যবিষক্রিয়া, প্রাণনাশী পানিশূন্যতা। না এ সবের কিছুই হয়নি!

জীবন মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে বন্ড অদম্য সাহস দেখিয়েছেন। এ সাহসকে নির্বোধের সাহস হিসেবেই ধরে নিয়েছে গবেষক দল। তাদের ধারণা, স্নায়ু আক্রমণকারী ‘টক্সোপ্লাজমা গন্ডি’ পরজীবীর সৃষ্ট টক্সোপ্লাজমোসিস রোগের কারণেই এমনটি হয়েছে। ইঁদুরের দেহে ‘টক্সোপ্লাজমা গন্ডি’র সংক্রমণ ঘটিয়ে দেখা গেছে তারা বিড়ালকে ভয় পাওয়া তো দূরের কথা পাত্তাই দিচ্ছে না। গবেষকদের অনুমান এমন সংক্রমণ ঘটায় হয়তো বন্ড দেখাচ্ছেন অমন বোকামিভরা দুঃসাহস!

গবেষক দলটি মনে করে, “ভ্রমণ সংক্রান্ত স্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবেলায় বন্ডের প্রস্তুতি খুবই হতাশাজনক ছিল।” বিশেষ করে সংক্রমণ রোগের বেলায় তার আচরণকে আহাম্মুকিও বলা যেতে পারে। শত্রুর হাড়ির খবর হাতিয়ে নিচ্ছে বন্ড বা এমআই৬। কিন্তু স্বাস্থ্য ঝুঁকির পরোয়া করছে না। বা এ সম্পর্কে অবহিত বলে অনুমান করার জো নেই। গবেষক দলটি মনে করে, “ভ্রমণ উপদেশ অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে, বেশি বেশি করেই পাওয়া যাচ্ছে। বন্ডের সাম্প্রতিক অভিযানগুলোতে এসব ঝুঁকির বিষয়ে বন্ড প্রস্তুতি নিয়েছেন – না তেমন কোনো আলামত চলচ্চিত্রগুলোতে পাওয়া যায়নি।” 

দুই শূন্য বা ডাবল জিরো মর্যাদার অধিকারী গোয়েন্দা প্রবর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সন্ত্রাসবিরোধী তৎপরতায় লড়ছেন তিনি। এক্ষেত্রে বন্ড যেন স্বাস্থ্যবিধি দায়িত্বের সঙ্গে পালন করেন তা দেখার দায়িত্ব এমআই৬’এর ঘাড়েই বর্তায়। তারা এ দায়িত্বের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেবেন বলেও গবেষক দলটি আশা ব্যক্ত করে।

syed.musareza@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic