সম্প্রতি নাসা মহাকাশের নতুন একটি ছবি প্রকাশ করেছে। এটি জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের সাহায্যে তোলা একটি পরীক্ষামূলক ছবি। ছবিটির মূল ফোকাস একটি নক্ষত্রের দিকে থাকলেও তার পেছনের ছায়াপথগুলো পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। নতুন টেলিস্কোপের তোলা এই বিশেষ ছবিটি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
রাতের আকাশে যে কোটি কোটি তারার দেখা মেলে তা মহাকাশের ক্ষুদ্র একটি অংশ। মহাকাশের বৃহত্তর অংশ দৃষ্টির অগোচরেই রয়ে যায়। মহাকাশের এই দৃষ্টির অগোচরে থাকা নক্ষত্র দেখতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা টেলিস্কোপ ব্যবহার করেন। টেলিস্কোপের সাহায্যে আকাশের দূর - দুরান্তের অজানা সব গ্রহ - নক্ষত্র, ছায়াপথ, নীহারিকা, ধুমকেতু ইত্যাদি সহজেই দেখা যায়।
ধরা হয়, পৃথিবীর প্রথম টেলিস্কোপ আবিষ্কার হয়েছিল নেদারল্যান্ডে, ১৬০৮ সালে। এরপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মানের টেলিস্কোপ আবিষ্কার হয়েছে। কিছুদিন পূর্বেও হাবল টেলিস্কোপকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপ হিসেবে ধরা হতো। তবে বর্তমানে হাবল টেলিস্কোপের স্থান দখল করতে চলেছে নাসার নতুন ‘জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ’।

জেমস এডউইন ওয়েব- ছবি: নেচার ডট কম
জেমস এডউইন ওয়েব ছিলেন একজন আমেরিকান সরকারী কর্মকর্তা যিনি ১৯৬১ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত নাসার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার নামানুসারেই টেলিস্কোপটির নাম রাখা হয়। শক্তিশালী এই টেলিস্কোপ ইতোমধ্যে পৃথিবীর নিকটবর্তী মহাকাশে পৌঁছে গিয়েছে। ২০২১ সালের ২৫ ডিসেম্বর দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ফ্রেঞ্চ গায়ানা থেকে আরিয়ান–৫ রকেটে করে টেলিস্কোপটি মহাকাশের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। গবেষকদের মতে, টেলিস্কোপটি সম্পূর্ণভাবে কার্যকরী হওয়ার জন্য সময় লাগবে প্রায় ৬ মাস।
এখন প্রশ্ন হলো টেলিস্কোপ কেন রকেটে করে মহাকাশে পাঠানো হয়? পৃথিবীতে রাখলেই তো এর খরচ অনেকটা কমে যেত।
এর কারণ হলো, পৃথিবীর বায়ুমুন্ডল। পৃথিবী চতুর্দিক দিয়ে বিভিন্ন গ্যাসীয় পদার্থ দ্বারা আবৃত, যাকে বায়ুমন্ডল বলা হয়। বায়ুমন্ডল মহাকাশের ক্ষতিকর আলো, গ্যাস, পদার্থ, তরঙ্গ ইত্যাদি পৃথিবীতে প্রবেশ করতে বাধা দেয়, অনেকটা সুরক্ষিত চাদরের মতো কাজ করে। কিন্তু এই বায়ুমন্ডলের কারণে সাধারণ দৃষ্টি বাধাপ্রাপ্ত হয়। তাই টেলিস্কোপগুলোকে রকেটের সাহায্যে বায়ুমন্ডল ভেদ করে মহাকাশে পৌঁছে দেয়া হয়। এরপর সেগুলো স্যাটেলাইটের মত পৃথিবীর চারপাশে আবর্তন করতে থাকে।
নাসার দাবী, এই টেলিস্কোপ তাদের সবচেয়ে ব্যায়বহুল প্রকল্পগুলোর একটি। এর কাজ ১৯৯৬ সালে শুরু হয়ে ২০০৭ সালেই শেষ করার কথা ছিল। এরপর নানা জটিলতার কারণে শেষ পর্যন্ত ২০১৬ সালে গিয়ে কাজের সমাপ্তি ঘটে। পরবর্তীতে বিভিন্ন পরীক্ষা - নিরীক্ষা শেষে ২০২১ সালে টেলিস্কোপটি মহাকাশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। সম্পূর্ণ প্রকল্পটির খরচ গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা। অবশ্য নাসার একার পক্ষে এই খরচ বহন করা সম্ভব হয়নি। ইউরোপিয়ান মহাকাশ সংস্থা এবং কানাডিয়ান মহাকাশ সংস্থা নাসার পাশাপাশি কাজ করেছে।
এতদিন পর্যন্ত মহাকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপ ছিল নাসার হাবল টেলিস্কোপ। এতদিন যত ছায়াপথ, ব্ল্যাক হোল আর রহস্যময় গ্রহ-নক্ষত্রের সাথে পরিচিত হয়েছি তার বেশিরভাগই হাবল টেলিস্কোপের সাহায্যে ধারণ করা।
হাবল টেলিস্কোপের মাধ্যমে প্রায় ১০ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের নক্ষত্র ও ছায়াপথের দেখা মিলতো। কিন্তু নাসা দাবী করছে, এই জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ তার চেয়েও দূরের তারাদের সাথেও আমাদের পরিচয় করিয়ে দিবে। শুধু তাই নয়, হাবল টেলিস্কোপের তুলনায় আরো স্বচ্ছ ও উন্নত ছবি ধারণ করবে এই জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ, কারণ এই টেলিস্কোপ দেখে ইনফ্রারেড তরঙ্গের সাহায্যে।

হাবল টেলিস্কোপে ধারণকৃত ‘ঈগল নেবুলা’র ‘পিলারস অব ক্রিয়েশনে’র দুটি ছবি। বায়ের ছবিটি দৃশমান আলোতে ধারণকৃত এবং ডানের ছবিটি ইনফ্রারেড আলোতে - ছবি: নাসা, ইএসএ/হাবল আন্ড দ্য হাবল হেরিটেজ টিম
ইনফ্রারেড এমন একটি আলো বা তরঙ্গ যা খালি চোখে দেখা যায় না। উত্তপ্ত বস্তু থেকে এই ইনফ্রারেড আলো নির্গত হয় (নাইটভিশন গগলস দিয়েও ইনফ্রারেড আলো দেখা যায়)। এই জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের সাহায্যে দূরের তারাদের থেকে নির্গত ইনফ্রারেড আলো শনাক্ত করা যাবে, ফলে মহাকাশের বস্তুগুলো আরো স্পষ্ট ও পরিষ্কারভাবে দেখা সম্ভব হবে।
নাসার এই ব্যায়বহুল প্রকল্পের পেছনে অবশ্য বেশ কিছু উদ্দেশ্য রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই টেলিস্কোপের সাহায্যে বিগ ব্যাং বা মহাবিশ্বের শুরুতে কিভাবে নক্ষত্রের জন্ম হয়েছিল, কিভাবে অনেকগুলো নক্ষত্র মিলে ছায়াপথ তৈরি করেছিল তা বোঝা যাবে। অর্থাৎ এই টেলিস্কোপ সুদূর অতীতে দেখতে পারবে।
বিষয়টি একটু জটিল। আমরা যা দেখি তাই হচ্ছে আলো। যখন সুর্যের দিকে তাকাই তখন কিন্তু ৮ মিনিট আগের সূর্যটা দেখি কারণ সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো পৌঁছাতে প্রায় ৮ মিনিট সময় লাগে। হঠাৎ কোনো অজানা কারণে সুর্য নিভে গেলে সেটা বুঝতে ৮ মিনিট সময় লাগবে।
তেমনিভাবে মহাকাশে অনেক নক্ষত্র রয়েছে যা সূর্য থেকেও লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। সেই নক্ষত্রগুলো ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেলেও তার আলো এখনো পৃথিবীতে পৌঁছায়নি। গবেষকদের দাবী, এই জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ সেই দুরের নক্ষত্রদের আলো ধারণ করতে পারবে এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়া তারাদের অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারবে।
এই টেলিস্কোপ দূরের সৌরজগতের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিবে। মহাবিশ্বের এমন হাজারো সৌর জগতের কথা যেখানে পৃথবী, চাঁদ, মঙ্গল ও বৃহস্পতির মত গ্রহ-উপগ্রহ আছে। ইংরেজিতে এই গ্রহগুলোকে বলে এক্সোপ্ল্যানেট। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই টেলিস্কোপের সাহায্যে পৃথিবীর মতই বসবাসযোগ্য আরো অনেক এক্সোপ্ল্যানেট বের করা সম্ভব হবে, হয়তো খুজে পাওয়া যাবে নতুন কোনো প্রাণের অস্তিত্ব।
সাজিদ আল মাহমুদ বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।
shajidmahmud11@gmail.com
