দেড় বছর আগে আবির্ভূত হওয়া করোনাভাইরাস এখনও বিশ্ব শাসন করছে, মানুষ এখনও হাতড়ে ফিরছে টিকে থাকার কৌশল সন্ধানে; মহামারীর এই নজিরবিহীন অনিশ্চিয়তায় দাঁড়িয়েই আরও একটি নতুন অর্থবছরের জন্য বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী।
মহামারীর প্রথম ধাক্কার পর ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে উন্নয়ন দর্শনে মনোযোগ কমিয়ে অর্থনীতির ক্ষত সরানোর কাজে হাত দিতে হয়েছিল সরকারকে। সেই ধাক্কা সামলে চলতি বছরের প্রথম দিকে অর্থনীতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক আবার মাথা তুলতে শুরু করেছিল, তখনই সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ বাংলাদেশকে ফের টলিয়ে দিয়ে গেছে। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
শেষ হতে চলা অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জাতিকে অর্থনৈতিক উত্তরণ আর ভবিষ্যতের পথের দিশা দেখাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই পথে এখনও বাধা হয়ে আছে করোনাভাইরাস। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট দিতে গিয়ে তাকে খুঁজতে হচ্ছে একইসঙ্গে জীবন ও জীবিকা বাঁচানোর কৌশল।
কীভাবে তা সম্ভব? বাজেটকে কৃচ্ছ্বের পথে নিয়ে আপাতত টিকে থাকার চেষ্টা হতে পারে একটি পথ। আরেকটি পথ হতে পারে ব্যয় বাড়িয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা।
মুস্তফা কামাল এর মাঝামাঝি একটি পথ বেছে নিচ্ছেন; সব দিক সামলে আগামী এক বছরে সরকারের ব্যয় নির্বাহের জন্য মোটামুটি ৬ লাখ কোটি টাকার একটি বাজেট তিনি বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের সামনে উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন।
ব্যয়ের এই ফর্দ সাজাতে গিয়ে অতি উচ্চাভিলাষী হওয়ার সুযোগ অর্থমন্ত্রীর সামনে ছিল না। আবার সংকোচনের পথেও তিনি হাঁটেননি।
কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে গতিশীলতা সৃষ্টির পাশাপাশি জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে তাকে ব্যয় বাড়ানোর কথা ভাবতে হয়েছে। বড় পরিসরে টিকা দিয়ে মানুষের জীবন সুরক্ষিত করার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর পরিকল্পনা সাজাতে হয়েছে। এ যেন অনেকটা ঝড়ের মধ্যে এক টুকরো নিরাপদ আশ্রয়ের সংস্থান করা।
বিশাল বাজেটের আয় ও ব্যয় নিয়ে টানাপড়েনের মধ্যেও জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে মানুষ ও ব্যবসায়ীদের বাঁচাতে আশার কথা শোনাতে চায় সরকার। সেজন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জোরের সঙ্গেই বলছেন অর্থমন্ত্রী। সরকারের অন্য নীতি নির্ধারকদের সুরও প্রায় একইরকম।
উৎপাদনমুখী শিল্পে জোর দিয়ে কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকারের অনেক বেশি কর আহরণের ইচ্ছা সংবরণের ইংগিতও ইতোমধ্যে মিলেছে।
দেশি-বিদেশি নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির চেষ্টার কথা দীর্ঘদিন ধরেই বলছে সরকার। চলতি অর্থবছরের বাজেটের ধারাবাহিকতায় আগামী অর্থবছরেও এ বিষয়ে বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে।
নতুন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের জন্য কর ছাড়, নতুন বিনিয়োগে কিছু সুবিধা, কর ও ভ্যাটে কিছু অব্যাহতি এবং স্থানীয় শিল্পে সুরক্ষা দিতে কর ছাড়ের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানোর কিছু উদ্যোগের কথা এসেছে বাজেট প্রসঙ্গে।
এমন সব পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে মহামারীকালের দ্বিতীয় বাজেটে অর্থমন্ত্রী অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি পুষিয়ে পুনরুদ্ধারের পথে হাঁটতে চান।
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়া বাংলাদেশের বাজেটের আকার প্রতিবছরই বাড়ে, এবারও বাড়ছে। মুস্তফা কামালের আগামী বাজেটের আকার বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ১২ শতাংশের মত বড় হতে যাচ্ছে।
ওই টাকা ব্যয় করতে হলে সরকারকে সে অনুযায়ী আয়ও করতে হবে। কিন্তু গতি হারানো বাজার থেকে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা সেই মাত্রায় বাড়াতে পারছেন না অর্থমন্ত্রী। ফলে তাকে বাজেট সাজাতে হয়েছে রেকর্ড অংকের ঘাটতি রেখে।
চলতি বছরের মূল বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির বড় লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও নতুন অর্থবছরে তা কমিয়ে আনা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে কর হারেও পরিবর্তন আসছে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
গতবারের মত মহামারীর দ্বিতীয় বছরের বাজেটেও সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় বাড়তে পারে বলে আভাস দিয়ে রেখেছেন অর্থমন্ত্রী।
তবে করোনাভাইরাস নির্মূল ও মহামারী মোকাবেলায় নতুন বাজেটে কী থাকছে, তা নিয়েই এখন সবার আগ্রহ বেশি।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, “আমরা সবাই জানি, যতদিন করোনাভাইরাস বাংলাদেশে থাকবে, ওয়েভের পর ওয়েভ যতদিন পর্যন্ত আসতে থাকবে, এ দেশে বিনিয়োগ সেভাবে হবে না। বিনিয়োগ না হলে প্রবৃদ্ধি হবে না, কর্মসংস্থান হবে না।
“আমাদেরকে করোনাভাইরাস নির্মূল করতেই হবে। তাই করোনাভাইরাসকে নির্মূল করাই হচ্ছে নাম্বার ওয়ান চ্যালেঞ্জ। এটা অবশ্যই তাদের করতে হবে টাকা দিয়ে।”
বড় ঘাটতি
বাজেট মনিটরিং ও সম্পদ কমিটির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবেলায় সরকার চারটি নীতি কৌশল গ্রহণ করেছে।
এগুলো হল: সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি, প্রণোদনা দিয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি বাড়ানো, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি করা।
বিদায়ী অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিল পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধিত বাজেটে পাঁচ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় নেমে আসছে।
নতুন বাজেটের জন্য যে পরিকল্পনা অর্থমন্ত্রী সাজিয়েছেন, তাতে ৬ লাখ টাকার কিছু বেশি অর্থ বরাদ্দের কথা থাকছে, যা হবে দেশের মোট জিডিপির ১৭.৩ শতাংশের মত।
এই ব্যয় মেটাতে অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে যোগান ধরা হচ্ছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকার মত, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১১ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।
এর মধ্যে এনবিআরের মাধ্যমে সংগ্রহের লক্ষ্য ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এই অংক সাড়ে ৯ শতাংশ বেশি।
বাকি প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা এনবিআর বহির্ভূত আয় থেকে পাওয়ার আশা করা হচ্ছে বাজেট পরিকল্পনায়।
শেষ হতে চলা অর্থবছরের বাজেটে এনবিআরকে যে রাজস্ব সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, মার্চ পর্যন্ত সময়ে সংগ্রহ হয়েছে তার ৫৩.৬ শতাংশ।
ফলে মহামারীর এই সঙ্কটে এনবিআরের জন্য আরও বড় লক্ষ্য পূরণ কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়েই দেখা দেবে।
আগামী বাজেটের মোট ঘাটতি ধরা হচ্ছে ২ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকার মত, যা জিডিপির প্রায় ৬.২ শতাংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এত বড় ঘাটতি রেখে আর কোনো বাজেট দেখা যায়নি।
সম্পদ কমিটির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, মহামারীর ধাক্কা সামলাতে সোয়া লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বাজেট ঘাটতি বেড়েছে।
এই ঘাটতি পূরণের জন্য স্থানীয় আর্থিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা থেকে প্রায় এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশ থেকে রেকর্ড ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার মত ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, “বাজটের ঘাটতি আমি মনে করি কোনো সমস্যা না। কর থেকে সরকারের আয় কমবে। সেক্ষেত্রে বাজেটের ঘাটতি এমনিতেই বেড়ে যাবে। বর্তমান অবস্থায় সরকারকে বেশি ব্যয় করতেই হবে।”
তবে তার পরামর্শ হল, আগে বিদেশি উৎস থেকে ঋণ দিয়ে ঘাটতির বড় অংশ পূরণের চেষ্টা করা এবং পরে প্রয়োজন বুঝে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়া।
কারণ সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নিতে গেলে সরকারের সুদের বোঝা বাড়বে, আবার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে তারল্যে টান পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
প্রবৃদ্ধির সিঁড়ি
চলতি অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ। শেষ পর্যন্ত তা দুই দফা সংশোধন করে ৬ দশমিক ১ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়।
আগামী অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ২ শতাংশ নেওয়া হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলছে।
সম্পদ কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পরও প্রবাসী আয়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। রপ্তানি বাণিজ্যের গতি প্রকৃতিও ‘আশানুরূপ’। ফলে সামনে ভোগ বৃদ্ধি পাবে এবং সেবা খাতে চাঙ্গাভাব সৃষ্টির পরিবেশ তৈরি হবে। তাতে প্রবৃদ্ধিও বাড়বে।
আগামী অর্থবছরের মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ধরা হতে পারে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
২০২১-২০২২ অর্থবছরের জন্য কর ও জিডিপির অনুপাত ধরা হচ্ছে ১১ দশমিক ২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ দশমিক ৩ শতাংশ।
কর জিডিপি অনুপাত উন্নত দেশগুলোতে গড়ে ৩৬ দশমিক ২ শতাংশ। উদীয়মান উন্নয়নশীল এশিয়ার দেশগুলোতে গড়ে ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ। আসিয়ান দেশগুলোতে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং আফ্রিকার সাব-সাহারান দেশগুলোতে এ অনুপাত ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, “অর্থমন্ত্রী (মুস্তফা কামাল) বলেছিলেন, আমাদের দেশে ট্যাক্স জিডিপি রেশিও কম মানে দেশে কর আহরণ কম। এই কর আহরণ বাড়াতে আমাদের অর্থমন্ত্রী কী উদ্যোগ নিলেন? কর আহরণ বাড়াতে হবে।”
ভাইরাস থেকে সুরক্ষায় কী?
চলতি অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা বিভাগের উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। আগামী অর্থবছরে এ বরাদ্দ বাড়িয়ে ইতোমধ্যে ১৭ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ দুই বিভাগের পরিচালন ব্যয়ও কিছুটা বাড়ানোর প্রস্তাব থাকছে বাজেটে।
সরকার আগামী অর্থবছরে প্রায় ১০ কোটি মানুষকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে; সেজন্য ২০ কোটি ডোজ টিকা প্রয়োজন হবে। বাজেটে বড় অংকের থোক বরাদ্দের ঘোষণা আসতে পারে। থাকতে পারে টিকার জন্য আলাদা তহবিল গঠনের ঘোষণা।
ভাইরাস থেকে সুরক্ষার পাশাপাশি দুর্নীতি থেকে সুরক্ষা আর বাজেট বাস্তবায়নে দক্ষতা দেখার প্রত্যাশার কথাও বলছেন আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা।
মহামারী মোকাবেলায় চলতি বছরের বাজেটে সরকার দু’রকম পদ্ধতিতে বরাদ্দ দিয়েছে। একদিকে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য ব্যয়ের জন্য স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজের মাধ্যমে ব্যয় করা হচ্ছে বিপুল অংকের অর্থ।
চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ দেয়া হয় ১৩ হাজার ৩২ কোটি টাকা। পরে মার্চে তা বাড়িয়ে করা হয় ১৪ হাজার ৯২১ কোটি টাকা। কিন্তু মহামারীর মধ্যে ১০ মাসে এই বরাদ্দের মাত্র ৩১ শতাংশ অর্থ খরচ হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, “২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে আমরা একাগ্র চিত্তে মনোযোগ দেব করোনাভাইরাস দমন করার জন্য, নিরাময় করার জন্য। কিন্তু এর জন্য এখন পর্যন্ত সরকারের কাছ থেকে কোনো দীর্ঘমেয়াদী কৌশল দেখছি না। যখন যেমন দরকার, তেমন অ্যাডহক বেসিসে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।”
অতীতে সরকারের নীতি প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত ফরাসউদ্দিনের প্রশ্ন, “বিভিন্ন খাতে বাজেটে যে টাকা ধরা থাকে, সেটা ঠিকমত খরচ হয় না। খরচ করতে গেলে তো ব্যাপক ধরনের চুরিদারি হয়। সেই চুরিদারি কমানোর কৌশলটা কোথায়?”
সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক দুর্নীতির প্রসঙ্গ ধরে তিনি বলেন, “সব দুর্নীতি যদি সত্যি হয়, তাহলে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী কর্মকৌশল তৈরি না করলে আমরা করোনাভাইরাস থেকে মুক্তির কোনো পথ দেখছি না।”
সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মসৃজন
অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে গেলে কৃষি ও ছোট-বড় শিল্প খাতকে যেমন সহযোগিতা দিতে হবে, তেমনি দারিদ্র্য ঠেকাতে বাড়াতে হবে সামাজিক সুরক্ষার আওতা।
সেজন্য করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সরকারের নেওয়া প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখা হবে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বাজারে অর্থ সরবরাহ বাড়ানোর মতো কর্মকাণ্ডে সহায়তা করাও হবে অর্থমন্ত্রীর এবারের বাজেটের লক্ষ্য।
গতবছর সরকারের ঘোষিত ২৩টি প্রণোদনা প্যাকেজে বরাদ্দ ধরা হয়েছিল ১ লাখ ২৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৬টি প্যাকেজের ৪০ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা সরাসরি বাজেট থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে বাস্তবায়ন হয়েছে এর ৭০ শতাংশের কাছাকাছি।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক সুরক্ষায় প্রায় ১১ শতাংশ বরাদ্দ রয়েছে। গ্রামীণ প্রান্তিক, দরিদ্রদের জন্য এই খাতে বরাদ্দ আরও বাড়বে বলে অর্থমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তবে আগের ব্যবস্থা পাল্টে নতুন নতুন সুবিধাভোগীদের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার সুপারিশ করেছেন আইসান এইচ মনসুর।
তিনি বলেন, “আমরা আগের বাজেটগুলোতে যে ধরনের সামাজিক নিরাপত্তায় খরচ দেখেছি, সেগুলো দিয়ে হবে না। মহামারীর কারণে এবার নতুন করে যারা গরিব হয়েছেন, তাদের জন্য টাকা দিতে হবে।
“করোনাভাইরাসের কারণে অনেক পরিবার গরিব হয়ে গেছে। অনেক পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। অনেক পরিবার এতিম হয়ে গেছে।”
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, মহামারীর ধাক্কায় দেশে দারিদ্র্যের হার ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪২ শতাংশে পৌঁছে গেছে বলে বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে।
“দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য দুটি কৌশল নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। একটা হচ্ছে ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘিরে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কৌশল, কারণ যারা নতুন করে দরিদ্র হয়েছে তাদের অধিকাংশই অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তারাই এখন বেশি ভুগছেন। সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ থেকেও তারা বেশি সুবিধা পাননি।
“দ্বিতীয় কৌশল হতে হবে ব্যাপক এবং শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি। এখন যেটা আছে, চলতি অর্থবছরে সরকার সেটার টার্গেটও পূরণ করতে পারেনি।”
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপে দেখানো হয়েছে, কোভিড-১৯ মহামারীর প্রভাবে গত এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে বেকারত্বের হার ২২ শতাংশের উপরে চলে গেলেও সেপ্টেম্বরে তা ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমে আসে।
তবে একাধিক গবেষণার বরাত দিয়ে সানেম দাবি করছে, বেকারেত্বের হার এখনও ১০ শতাংশের কাছাকাছি।
অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, “দারিদ্র দূরীকরণের কৌশলগুলোই বেকারত্ব দূর করতে ভূমিকা রাখবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোকে শ্রমবাজারভিত্তিক করা গেলেও বেকার সমস্যার কিছুটা সমাধান হবে।”
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, কৃষিখাতে প্রণোদনা, কৃষি উপকরণে ভর্তুকি, কৃষি যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রে স্বল্প সুদে ঋণ, ভর্তুকি অব্যাহত রাখা হচ্ছে আগামী বাজেটেও।
বৈধ পথে রেমিটেন্স আসায় প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অব্যাহত আছে। অর্থবছরের ১১ মাসে ২২.৪ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড রেমিটেন্স দেশে এসেছে, বহু দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা পরিবারের টিকে থাকার সহায়।
যদিও মহামারীর সময় বিদেশ থেকে যে পরিমাণ শ্রমিক দেশে ফিরেছেন তার এক চতুর্থাংশ মাত্র বিদেশে গেছেন বলে সরকারি-বেসরকারি একাধিক হিসাবে পাওয়া গেছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় প্রতিবছর গড়ে সাত লাখ মানুষ প্রবাসে কাজ করতে যেতেন। কিন্তু করোনাভাইরাসের এই সময়ে সে প্রক্রিয়া প্রায় থেমে আছে। এটাও শ্রমবাজারের ওপরে চাপ ফেলেছে।”
বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার জরিপে মহামারীর মধ্যে দেশের অর্থনীতি আর দারিদ্র্যের যে চিত্র আসছে, তার সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই একমত নন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তবে সব দিক মাথায় রেখেই বাজেট ঘোষণার প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়ে রেখেছেন।
২৭ মে সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্যই থাকবে দেশের মানুষকে বাঁচানো, ব্যবসায়ীদেরকে বাঁচানো। আমাদের সব পিছিয়ে পড়া মানুষ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আমাদের সাথে রাখতে হবে। তাদেরকে সাথে রেখেই এগিয়ে যেতে চাই।”
