জলবায়ুর অভিঘাত, গতিপ্রকৃতি ও প্রভাব অনুধাবন করার জন্য এ সংক্রান্ত গবেষণায় অ্যাট্রিবিউশন সায়েন্স বা আরোপণ বিজ্ঞানের সহায়তা নেয়া হয়। প্রধানত খরা, ভয়াবহ বন্যা, সামুদ্রিক ঝড়, অতিতাপ বা ঝড়ের অপ্রচলিত গতিপথ জাতীয় চরম আবহাওয়ার কিছু ঘটনা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী হতে পারে কি না তা পরীক্ষা করার চেষ্টা হয় এর মাধ্যমে।
চীনের হেনান থেকে জার্মানির কোলন পর্যন্ত চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ-সৃষ্ট ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ অনুধাবনের অন্তহীন প্রয়াস চলছে। আর ঠিক সে সময় জলবায়ু মডেলের প্রতি আগ্রহ বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের বাইরের মানুষদের মধ্যেও বাড়ছে।
ইউএস ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অন্যতম সিনিয়র বিজ্ঞানী টলডেল ওয়ার্থ বলেন, কীভাবে জলবায়ু বা আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটতে পারে তা জানার চাহিদা বেড়েছে। নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে এ চাহিদার হার বিস্ফোরণের মতো বেড়ে চলেছে।
তিনি আরো বলেন, যেসব গোষ্ঠী এ পরিবর্তনকে খুব ভালো করে অনুধাবন করতে চাইছে তাদের মধ্যে রয়েছে গোয়েন্দা এবং সামরিক বাহিনী। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট সমস্যা যেমন পানি-সংকট কী করে সংঘাত উস্কে দিতে পারে বা নতুন ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে সে সব বিষয় পূর্বাভাস চাইছে এসব গোষ্ঠী। তবে এসব কার্যকারণ নিশ্চিত করাকে সবাই গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
২০১৫ সালে জাতিসংঘের জলবায়ু আলোচনায় স্বল্পোন্নত দেশগুলোর চেয়ারপারসন গিজা গ্যাসপার মার্টিনসের যুক্তি হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে বিশেষ কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আরো বিধ্বংসী হয়ে উঠেছে এমনটা মনে করলে মূল কাজ থেকে আমাদের মনোযোগ সরে যাবে।
তিনি বলেন, আমি আরোপণ বিজ্ঞানের মানুষ নই। যখন গ্রিনহাউজ গ্যাসের নির্গমন বন্ধ করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার তৎপরতা অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, তখন এ ধরণের কাজ কেবলমাত্র সময়নষ্ট হিসেবে বিবেচিত হবে।
উদাহরণ হিসেবে নিজ জন্মভূমি অ্যাঙ্গোলার কথা তুলে ধরেন মার্টিনস। তিনি বলেন, দেশটি ভয়াবহ খরা এবং বন্যার চক্রের মুখে পড়েছে। দেশটির সবাই দৃঢ়ভাবে মনে করেন যে এই বিধ্বংসী চক্রের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে এবং এই ভাবনাই সে দেশবাসীর জন্য যথেষ্ট।
অন্যদিকে, জাতিসংঘের আলোচনায় বুরকিনাফাসোর সাবেক প্রধান আলোচক মামাদু হোনদিয়া বলেন, সুনির্দিষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগকে জলবায়ু উষ্ণতার সঙ্গে যোগসূত্র রয়েছে বলে তুলে ধরা গেলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জলবায়ু তহবিল জোগাড় করতে সহায়তা করবে।
এই তহবিলের সংস্থান আসন্ন নভেম্বরের জলবায়ু সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই সম্মেলন সিওপি২৬ নামে পরিচিত যা যুক্তরাজ্যের গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি আরো বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণেই বন্যা হচ্ছে, এটা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বোঝান সত্যিই বেশ কঠিন কাজ।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে অনেক কোম্পানি ও সরকারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করার সংখ্যা বাড়ছে। কোনো কোনো বিজ্ঞানী বলেন, প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগকে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে তুলে ধরা গেলে এসব মামলায় সুবিধা পাওয়া যাবে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকসহ ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন ইনিশিয়েটিভ (ডব্লিউডব্লিউএ) এর আরেক উপনেতা ফ্রিডেরিক অটো বলেন, বাদীপক্ষ জলবায়ু বিজ্ঞান বিশেষ করে আরোপণ ক্ষেত্রকে আরো ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারবে। তিনি আরো বলেন, ভবিষ্যতে জলবায়ু মামলায় আসামি কোম্পানিরা ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হবে। এটি এখন আর অদূর ভবিষ্যতের কোনো বিষয় নয় এবং বৈজ্ঞানিক সঠিক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই এ কথা বলা যাচ্ছে।
বিবিধকারণ: জলবায়ুমডেল-ভিত্তিক পূর্বাভাসকে চলতি বছরের চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগগুলো ছাড়িয়ে গেছে কি না সে প্রশ্ন উদ্বেগের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।
উত্তর আমেরিকার তাপপ্রবাহ খতিয়ে দেখতে গিয়ে ডব্লিউডব্লিউএ বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা বজায় না রেখেই তাপমাত্রা চরম এবং অস্বাভাবিক পর্যায়ে গেছে। এক্ষেত্রে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সংগতি রেখে চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ দেখা দেয় না বরং হঠাৎ করে এবং প্রচণ্ডভাবে তা ঘটে।
যুক্তরাজ্য সরকারের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা স্যার ডেভিড কিং-এর নেতৃত্বাধীন ক্লাইমেট ক্রাইসিস অ্যাডভাইসরি গ্রুপ বলছে, উত্তর আমেরিকার প্রচণ্ড দাবদাহ এবং ইউরোপের বন্যাকে কেবল শিল্প-বিপ্লব পূর্ব সময়ের তুলনায় ১.২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড উষ্ণতা বৃদ্ধির ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা কষ্টকর।
এ গোষ্ঠীটি আরো বলে, আমরা যা ভাবছি তারচেয়েও দ্রুত জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে। দ্রুতহারে উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং আর্কটিকের বরফ গলে যাওয়ায় আমাদের আবহাওয়া কীভাবে কাজ করে সেক্ষেত্রে বাড়তি পরিবর্তন ডেকে আনছে।
তবে প্রচলিত কম্পিউটার মডেলগুলো কাজ চালাবার মতো পর্যাপ্ত নয় বলে সব বিজ্ঞানী উদ্বেগে ভোগেন না। এদেরই একজন ডব্লিউডব্লিউ-র সঙ্গে তৎপর কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী ফ্লাভিও লেহনার। তিনি বলেন, এগুলো হলো চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ, কিন্তু এগুলো জলবায়ুর মডেলে ঘটতে দেখেছি। আমার প্রতিবাদী অনেক সহকর্মীর চেয়ে বরং আমি কমই বিস্মিত হয়েছি। সাম্প্রতিক ধারাবাহিক ধ্বংসলীলা নেহাৎই ঘটনাক্রমে হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তিনি আরো বলেন, এসব সুনির্দিষ্ট স্থানে অনুরূপ দুর্যোগ হয়ত আর দীর্ঘদিন দেখতে পাবো না।
চলতি বছরের চরম আবহাওয়াজনিত দুর্ঘটনাগুলোতে হতভম্ব প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বসবাস নিয়ে যে সব ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে তাই এর মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। যুক্তরাজ্যের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রানথাম চেয়ারের প্রধান টেডশেফার্ড বলেন, আমি মনে করি যোগাযোগের মাধ্যমে সবকিছু ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়নি, বরং যোগাযোগের ক্ষেত্রে পরিষ্কার ধারণা দেওয়ার বদলে অনেকটা বিমূর্ত ধারণা দেওয়া হয়েছে। এতে জলবায়ু পরিবর্তনকে অনেক দূরের ব্যাপার বলেই মনে হতে পারে।
এদিকে বিশ্বের উষ্ণ হয়ে ওঠার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ ঘটতে থাকবেই। জুলাই মাসে নেচার ক্লাইমেট চেঞ্জ সাময়িকী একটি সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, বিশ্বউষ্ণায়নের ধারাবাহিকতা না থাকলে আগামী দশকগুলোতে রেকর্ড সৃষ্টিকারী দুর্যোগও দেখা দেওয়ার কোনো আশংকাই থাকত না। এ জাতীয় দুর্যোগ ঘটার আশংকা নিয়ে আরো খতিয়ে দেখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলেওে এতে মন্তব্য করা হয়েছে। সমীক্ষাটিতে আরো বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে কী ঘটতে পারে সেসব বিবেচনা না করে বরং অতীতে কী ঘটেছে তার ওপর ভিত্তি করেই সাধারণত কমিটিগুলো শোচনীয় দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবেলার পরিকল্পনা প্রস্তুত করে।
কাজেই ঝড়, দাবানল বা বন্যার ফলে সৃষ্টি ধ্বংসলীলার ময়না তদন্ত করে অসংখ্য এবং অপ্রাসঙ্গিক বিষয় উঠে আসবে কিন্তু এর মধ্য দিয়ে সঠিক উত্তরই কেবল মিলবে না। শেফার্ড বলেন, অনেকেই মনে করেন, বিবিধ কারণের দিকে দৃষ্টি দেওয়া হলে জলবায়ু পরিবর্তনের দিকে মনোযোগ রাখা যাবে না।
তারপরও বিবিধকারণ নিয়ে সমীক্ষা চালানো উচিত বলে তিনি মনে করেন। এতে বন্যারোধক বাধ দেওয়া, বন্যার পূর্বাভাস দেওয়া বা দুর্যোগ দেখা দিলে নীতি-নির্ধারকরা যেসব প্রতিক্রিয়া দেখান তার ওপর প্রভাব পড়বে। চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ কতোটা ক্ষতি ডেকে আনবে তার ওপরও প্রভাব পড়বে। শেফার্ড জানান, ব্যবস্থাপনায় অদক্ষ বলে স্থানীয় সরকারকে দায়িত্ব থেকে দূরে রাখা যায় না।
জলবায়ু সংক্রান্ত বিজ্ঞানকে এখনো পুরোপুরি সঠিক হিসেবে গণ্য করা না হলেও জলবায়ুকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের পরিবর্তন ঘটছে। কানাডার হাউস অব কমন্সের স্থায়ী কমিটির সভাপতি আইনপ্রণেতা ফ্রান্সিস স্কারপালেগজিয়া বলেন, মানুষ যখন দাবানলে তাদের ঘরবাড়ি পুড়ে যেতে বা বানের পানির তোড়ে ভেঙে পড়তে দেখছে তখন জলবায়ু পরিবর্তন প্রভাব নিয়ে তাদের সংশয় ক্রমেই কমতে থাকে।
স্কারপালেগজিয়া আরো বলেন, চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্যে যোগসূত্রের বিষয়ে তাত্ত্বিকভাবে যাই বলা হোক না কেন, এ যোগসূত্রের বিষয়টি মানুষ অধিক হারে মানছে। তিনি আরো বলেন, বিজ্ঞান নিয়ে পড়ালেখা করা এক জিনিস আর একে সঠিকভাবে বোঝার জন্য বাস্তব উদাহরণ চাক্ষুষ করা আরেক জিনিস।
তবে অনিশ্চয়তার কারণে জলবায়ু পরিবর্তনকে অস্বীকার করার আশংকা রয়েছে।
হামবুর্গের ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইন্সটিটিউট ফর মেটিওরোলজির অধ্যাপক বিজর্ন স্টিভেনস বলেন, অনেক কিছুই বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন না সে কথা যখন বলা হয় তখন অনেকেই সত্যিই বেশ ঘাবড়ে যান। তারা মনে করেন, জলবায়ু নিয়ে অজানা বিষয়গুলো হয়ত কার্বন হ্রাসের প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। একই সঙ্গে তিনি আরো বলেন, মানুষকে আমি অনেক বেশি পরিশীলিত হিসেবে গণ্য করি। তারা হয়ত সব বিষয়ে জানেন না। তারমানে এই নয় যে তারা কিছুই জানেন না।
[ফাইনান্সিয়াল টাইমেসর নিবন্ধের বাংলা রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]