Loading...

জঙ্গিদের এখনকার বোমা ‘দুর্বল’ ঠেকছে পুলিশের কাছে

| Updated: August 17, 2021 16:52:30


জঙ্গি আস্তানা থেকে বোমা ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার। ফাইল ছবি জঙ্গি আস্তানা থেকে বোমা ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার। ফাইল ছবি

১৬ বছর আগে সারাদেশে একযোগে বোমা হামলা চালিয়ে বাংলাদেশে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিয়েছিল জঙ্গিরা; তার ১১ বছর পর সামর্থ্যের সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটিয়েছিল গুলশান হামলার মধ্যদিয়ে। কিন্তু এখন জঙ্গিদের তৎপরতা আর তেমন দৃশ্যমান নয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টানা অভিযানে ‘সামর্থ্য হারানো’ জঙ্গিরা এখন বোমা তৈরিতেও দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে দাবি করেছেন অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের পুলিশ সুপার ছানোয়ার হোসেন।

দীর্ঘদিন বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটে মাঠ পর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতায় তিনি সোমবার বলেন, “আগে জঙ্গিরা যেসব বোমা তৈরি করত, তা অনেক শক্তিশালী ছিল। এমনকি ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান বেকারিতে যেসব বোমা ব্যবহার করা হয়েছে, তাও শক্তিশালী ছিল।

“কিন্তু এখন জঙ্গিরা যেসব বোমা তৈরি করছে, তা শক্তিশালী নয় এবং ত্রুটিপূর্ণ।”

বাংলাদেশে জঙ্গিরা ভেতরে ভেতরে কাজ চালালেও তাদের সংগঠিত শক্তির প্রকাশ ঘটেছিল ২০০৫ সালের ১৭ অগাস্ট। সেদিন ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলা চালিয়ে আলোচনায় আসে জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)।

মূলত আফগানফেরত জঙ্গিরাই বাংলাদেশে জঙ্গি সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু বিশ্বে পালাবদলে তালেবানকে ছাপিয়ে ইসলামিক স্টেটসের উঠে আসা বাংলাদেশের জঙ্গি তৎরতায়ও পালাবদল ঘটায়।

জেএমবির শীর্ষনেতাদের ফাঁসির পর আইএসের মতাদর্শে গড়ে ওঠে নতুন দল, যাদের ‘নব্য জেএমবি’ বলে আখ্যায়িত করছে পুলিশ।

২০১৬ সালে হলি আর্টিজান বেকারিতে নব্য জেএমবিই হামলা চালিয়েছিল, যা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে।

এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানে জঙ্গিদের ডানা ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করে আসছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা; যদিও এর মধ্যেও কয়েকটি ছোটখাট বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে জঙ্গিরা।

ছানোয়ার জানান, জেএমবির ১০ থেকে ১২ জন আর নব্য জেএমবির ১০ থেকে ১২ জন বোমা তৈরির ‘কারিগর’ ছিল।

জঙ্গিদের বোমা তৈরিতে দুর্বল হওয়ার কারণ কী- জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এখন আর পুরোনো জেএমবির কেউ নেই। আর হলি আর্টিজান ঘটনার পর অনেকই নিহত হয়েছেন, অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন।

“আবার বোমা তৈরির করার উপাদান আগে যেভাবে পাওয়া যেত, এখন আর সেই পথও বন্ধ।”

প্রশিক্ষণ এখন অনলাইনে

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরের কারণে জঙ্গিরা এখন তাদের যোগাযোগ রক্ষার পাশাপাশি এমনকি বোমা তৈরির প্রশিক্ষণও অনলাইনে নিচ্ছে বলে খবর পেয়েছেন গোয়েন্দারা।

সম্প্রতি কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট কয়েকজন জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করে বলছে, তারা অনলাইনে বোমা তৈরি শিখেছে।

গত ১ অগাস্ট যাত্রাবাড়ী থেকে সিটিটিসি শফিকুর রহমান হৃদয় ওরফে খাত্তাব ও খালিদ হাসান ভূইয়া ওরফে আফনান নামে নব্য জেএমবির দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করে।

পরে সংবাদ সম্মেলনে সিটিটিসি প্রধান মো. আসাদুজ্জামান বলেন, এ বছরের ১৬ মে সাইনবোর্ড এলাকায় পুলিশের ট্রাফিক বক্সে যে বোমাটি রেখেছিল জঙ্গিরা, তা অনলাইনে তৈরি করা শিখিয়েছিলেন নব্য জেএমবির প্রশিক্ষক জাহিদ হাসান রাজু ওরফে ফোরকান।

‘রিমোট কন্ট্রোল প্যানেলে ত্রুটির’ কারণে সেদিন বোমাটি বিস্ফোরিত হয়নি।

১১ জুলাই নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার থেকে আব্দুল্লাহ আল মামুনকে বোমা তৈরির সরঞ্জামসহ গ্রেপ্তার করে সিটিটিসি।

পরে ১০ অগাস্ট কাফরুল থেকে ফোরকানসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্য দুজন হলেন- সাইফুল ইসলাম মারুফ ওরফে বাসিরা ও রুম্মান হাসান ফাহাদ ওরফে আবদুল্লাহ।

ফোরকান সম্পর্কে সিটিটিসির প্রধান আসাদুজ্জামান বলেন, তিনি নব্য জেএমবির প্রধান প্রশিক্ষক ও বোমা প্রস্তুতকারক।

ফোরকান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে অনার্স শেষ করলেও মাস্টার্স করেননি। ২০১৬ সালে তিনি নব্য জেএমবিতে ভেড়েন বলে গোয়েন্দারা জানান।

এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, “রসায়নের ছাত্র হওয়ায় ফোরকান অল্পদিনে গ্রেনেড ও বোমা বানাতে দক্ষ হয়ে উঠে। দলের বাছাইকৃত সদস্যদের বিভিন্ন টাইম বোমা ও রিমোট কন্ট্রোলড বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিত সে অনলাইনে।”

আগে জঙ্গিরা হাতে-কলমে বোমা তৈরি শিখলেও এখন তা শিখতে না পারাও তাদের বোমার দুর্বলতার কারণ, বলেন ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, “ম্যানুয়েল আর অনলাইন যেভাবেই জঙ্গিরা কাজ করুক না কেন, সবকিছুই মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে এবং অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”

ঢাকার মামলার ৫টি এখনও অনিষ্পন্ন

দেড় দশক আগে সারাদেশে একযোগে জঙ্গিদের বোমা হামলার ঘটনায় ঢাকায় যে পাঁচটি মামলা হয়েছিল, তার পাঁচটির বিচার এখনও শেষ হয়নি।

মামলাগুলো এখনও সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকার মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু।

ওই হামলার ষোড়শ বার্ষিকীতে সোমবার খোঁজ নিতে গেলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে এই তথ্য জানান।

কী কারণে এত দেরি- প্রশ্ন করা হলে আব্দুল্লাহ আবু বলেন, “সাক্ষীদের হাজির করা সম্ভব হচ্ছে না বলে বিচার কাজে বিলম্ব হচ্ছে। এছাড়া কোভিড-১৯ এর কারণে আদালত বন্ধ থাকায় মামলার কার্যক্রমও বন্ধ ছিল।”

তবে কোন মামলা কোনে আদালতে, কতজন সাক্ষ্য দিয়েছে, কারা সাক্ষ্য দিতে আসছে না, এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি তার কাছে।

রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ মামলার পরিপূর্ণ তথ্য না থাকার বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের এই কৌঁসুলি বলেন, “সবকিছু তো আর মনে রাখা সম্ভব নয়। খোঁজ নিয়ে জানানো যাবে।”

২০০৫ সালের হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল আদালত। সরকারি, আধা-সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। হামলায় দুজন নিহত হয়। আহত হয় দুই শতাধিক মানুষ।

সেই ঘটনায় সারাদেশের বিভিন্ন থানায় ১৫৯টি মামলা দায়ের করে পুলিশ। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ৯৩ নিষ্পত্তি হয়েছে। তাতে ৩৩৪ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে।

দেশে এই পর্যন্ত ২৭ আসামিকে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার মামলায় ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে আটজনের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে।

২০০৭ সালের ২৯ মার্চ রাতে শীর্ষ জঙ্গি নেতা জেএমবির আমির শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাই, খালেদ সাইফুল্লাহ, আতাউর রহমান সানি, আবদুল আউয়াল, ইফতেখার হাসান আল মামুনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

১৫৯টি মামলার মধ্যে বাকি ৬৬টি মামলা এখনও বিচারাধীন। এসব মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৪০০। সব আসামিকে পুলিশ গ্রেপ্তারও করতে পারেনি।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৫৯টি মামলায় ১ হাজার ১৩১ জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এদের মধ্যে ১ হাজার ২৩ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। ১০৮ জন এখনও পলাতক।

আফগানিস্তানে তালেবানের পুনরুত্থানের প্রভাব পড়বে?

বাংলাদেশে জঙ্গি উত্থানের সঙ্গে যে আন্তর্জাতিক যোগ রয়েছে, তা বলছেন ঢাকার মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম।

দুই দশক পর আফগান তালেবানের রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরদিন সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “তালেবানরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নেওয়ার পরই ঘোষণা করবে, তারা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র। তারা আরও বলবে, ‘আমেরিকাকে যুদ্ধে পরাজিত করে আফগানিস্তানকে স্বাধীন করেছি’।

“এর প্রেক্ষাপটে যুবকদের ভেতর (যারা জিহাদ করতে চায়) উৎসাহ তৈরি হবে। এই ঢেউ আমাদের উপমহাদেশসহ সব দেশেই লাগবে। বাংলাদেশে জঙ্গিদের যে উত্থান হচ্ছে, তা সবসময়ই আন্তর্জাতিক কোনো ঘটনার প্রেক্ষাপটের পরে উৎসাহ পাচ্ছে।”

এক সময় আফগানিস্তান ফেরত বাংলাদেশিরাই যে হরকাতুল জিহাদ (হুজি) ও জেএমবিসহ একাধিক জঙ্গি দল তৈরি করেছিল, তাও বলেন শফিকুল।

তিনি বলেন, ২০০৫ সালে দেশব্যাপী বোমা হামলার ঘটনার পরে জঙ্গি সংগঠনগুলোকে মোটামুটি ‘প্রায় নিয়ন্ত্রণে’ নিয়ে এসেছে পুলিশ।

এখন তালেবানের পুনরুত্থানের মধ্যে কিছু বাংলাদেশি তাদের দলে ভিড়তে আফগানিস্তান গেছে বলে সম্প্রতি জানিয়েছিলেন ডিএমপি কমিশনার।

তিনি সোমবার বলেন, “এসব নিয়ে দেশে যারা কাজ করে, তারা সতর্ক রয়েছে। আফগানিস্তান ফেরতরা যদি বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করে, তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে।”

Share if you like

Filter By Topic