Loading...

বড় ব্র্যান্ডগুলোর সরবরাহ কৌশলে পরিবর্তন

ছোট পোশাক কারখানাগুলোর টিকে থাকার শঙ্কা

| Updated: August 28, 2021 16:58:38


ছোট পোশাক কারখানাগুলোর টিকে থাকার শঙ্কা

সর্বশেষ দুই প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোভিড-১৯ মহামারির কারণে পোশাক শিল্পের বড় বড় ব্র্যান্ডগুলো তাদের পণ্য মজুদের কৌশলগুলো একত্র করেছে এবং বড় সরবরাহকারীদের উপর বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।

প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্যের মতো স্থানীয় শিল্প বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, অসামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য হ্রাসের প্রতিযোগিতার কারণে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিযোগী কারখানাগুলো সংকটাপন্ন অবস্থায় চলে যাবে।

নতুন প্রতিবেদন অনুযায়ী, এশিয়ার বড় এবং ভালো পুঁজিসম্পন্ন সরবরাহকারীরা এখন বড় বড় গার্মেন্টস থেকে বিশাল সব কাজের অর্ডার পেতে শুরু করেছে।

গত মাসে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) দ্বারা প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয় যে মূল্যের বিচারে মহামারিপূর্ব বছরগুলোতে যেমন এশিয়ার বাজারের প্রসার ঘটেছিল, এই খাতে বাজারের ব্যাপ্তিও ঘটেছিল অনেক। এতে বলা হয়, একীভূতকরণ এবং বাজারের ব্যাপ্তি কেবল বড় এবং প্রতিষ্ঠিত সরবরাহকারীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ, কিন্তু তারা ক্রেতা ও সরবরাহকারীদের মধ্যে পুনর্বণ্টনের কার্যক্রমও বজায় রাখে।

অধিকন্তু, আইএলও’র বক্তব্যে বলা হয়েছে, সরবরাহকারীরা প্রতিনিয়ত তাদের সরবরাহের তালিকায় ডিজাইন এবং ডেভেলপমেন্টের পণ্য, ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট, স্টক হোল্ডিং, লজিস্টিকস, কারখানা নির্বাচন এবং অনেকগুলো কারখানায় একসাথে উৎপাদনের পরিকল্পনার বিষয়গুলো আওতায় আনছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (ইউএসএফআইএ)-এর অন্য এক গবেষণা থেকে প্রকাশিত হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্যাশন কোম্পানিগুলো আগামী দুই বছর পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে অধিক পণ্য উৎপাদনের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের ফ্যাশন কোম্পানিগুলো একটি দেশের অপেক্ষাকৃত কমসংখ্যক বিক্রেতার সাথে কাজ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, ফলে, এই সদ্য মাথাচাড়া দেওয়া প্রবণতার কারণে বাংলাদেশের হাজারো পোশাক সরবরাহকারীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা জোরালো হয়ে উঠবে।

ইউএসএফআইএ-এর গবেষণা অনুযায়ী, প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা সরবরাহকারীরা যেমন অধিক অর্ডার মজুদ করার সুবিধা পাবে, তেমনি ক্ষুদ্র এবং অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিযোগী সরবরাহকারীদের জন্য পরিস্থিতি সংকটাপন্ন হয়ে উঠতে পারে।

শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, হাতেগোনা বা বেশকিছু বড় বড় সরবরাহকারী স্থানীয় সরবরাহকারীদের মধ্যে অসামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্যহ্রাসের প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে তুলবে। এর ফলে মহামারির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পক্ষে ব্যবসার এই ডামাডোলে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।

আইএলও’র বক্তব্য অনুযায়ী, শীর্ষস্থানীয় দশটি পোশাকশিল্পের ব্র্যান্ড- ইন্ডিটেক্স, ফাস্ট রিটেইলিং, এইচ অ্যান্ড এম, নাইকি, অ্যাডিডাস, গ্যাপ ইংক, পিভিএইচ, হ্যান্সব্র্যান্ডস, লেভি’স অ্যান্ড এলভিএমএইচ ধীরে ধীরে তাদের বাজারের অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি করেছে। ২০১১ সালের ৮.৮ শতাংশ থেকে তা বেড়ে ২০২০ সালে দাঁড়িয়েছে ১১.৪ শতাংশ।

এতে আরো বলা হয়েছে, পোশাকশিল্পের দু’টি বড় বড় খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন এবং ওয়ালমার্ট কেবলমাত্র সোর্সিং এবং সেলস মার্কেটের ক্ষেত্রে তাদের বৃদ্ধি ও প্রভাব বিস্তার করেছে।

আইএলও বলেছে, চলমান মহামারির কারণে কর্পোরেট স্থিতিশীলতা পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছে এবং বড় বড় ও অধিক মূলধনবিশিষ্ট কোম্পানিগুলো সুবিধা পাচ্ছে। একত্রীকরণের কারণে হয়তো পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরে আসার প্রভাবের উপর খুব একটা পরিবর্তন দেখা যাবে না।

উদাহরণস্বরূপ, নাইকি বিশ্ব জুড়ে যে সকল ফুটওয়্যার এবং গার্মেন্টস কারখানা থেকে পণ্য মজুদ করে থাকে, তার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছে। নাইকি গার্মেন্টস কারখানার সংখ্যা কমিয়ে ২০১৯ সালে ৬৩১ থেকে ২০২০ সালে ৩৩৪ (৪৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে)-এ নামিয়ে এনেছে।

শিল্প বিশ্লেষকগণ আশা করছেন যে কোভিড-১৯ পরিস্থিতি চলতে থাকলে এ সংখ্যা আরো কমে যাবে।

গ্যাপ ২০১০-১১ সালের দিকে ১,০২০টি কারখানা থেকে পণ্য মজুদ করলেও ২০২০ সালে তা নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮০০টিতে।

এতে আরো বলা হয়, পোশাক শিল্পের ক্রেতারা যেসব সরবরাহকারীদের কাছ থেকে পণ্য নিয়ে থাকেন, তাদের একত্রীকরণের সাথে মার্কেটের ব্যাপ্তি অনেকটা সম্পর্কযুক্ত।

২০০৫ সালে গ্লোবাল মাল্টি-ফাইবার অ্যারেঞ্জমেন্ট (এমএফএ)-এর মেয়াদ শেষে এই প্রক্রিয়ার গতি ত্বরান্বিত হয় এবং ২০০৮ সালে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পরে তা আরো একবার গতিপ্রাপ্ত হয়।

বড় বস্ত্র কারখানাগুলোর উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার নিয়ে এবং ব্র্যান্ডগুলোর উপাত্ত সংগ্রহ করে আইএলও নিশ্চিত করে যে, সরবরাহকারীদের একত্রীকরণ একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশল হিসেবে থাকবে এবং পরিচিত উৎপাদনকারীদের সাথে নতুন কারখানা বিনিয়োগকে সমন্বয় করে এটিকে আরো বিস্তৃত করা হবে।

আইএলও পর্যবেক্ষকদের কাছ থেকে এও জেনেছে যে, তারা প্রত্যাশা করছেন করোনা-পরবর্তীকালে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ যেগুলো অল্প পরিমাণে উৎপাদন করে থাকে তাদের প্রবৃদ্ধি বাড়বে।

কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, স্বয়ংচালিত রিসোর্সিং, খরচ পরিকল্পনা ও রসদের মাধ্যমে বাজার অংশে পোশাক কারখানাগুলোর লিড সময় ও কাঁচামাল কমানো যাবে।

এদিকে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর কর্মকাণ্ডের গতিপথ চিহ্নিতকারক ডিজিটাল ম্যাপিং প্রযুক্তি ‘ম্যাপড ইন বাংলাদেশ’ (এমআইবি)-এর উপাত্ত থেকে দেশের সরবরাহ ঘাঁটিতে মিশ্র প্রবণতা দেখা যায়।

৪০০ এমআইবি কারখানার উপাত্ত থেকে দেখা যায় যে ৩৫টি স্থানীয় পোশাক রপ্তানিকারক কারখানা ২০১৯ সালে নাইকির জন্য কাজ করেছিল, যার মধ্য থেকে ২০২১ সালে নাইকি ১০টি কারখানার সাথে কাজ করা বন্ধ করে দেয়। এ বছর এই দশজনের পরিবর্তে ব্র্যান্ডটি নতুন ৫টি স্থানীয় কারখানার সাথে কাজ করছে।

একইভাবে অ্যাডিডাস বাংলাদেশের সাথে তাদের সরবরাহকরণ ব্যবস্থা পুনর্গঠন করেছে। এমআইবির উপাত্ত থেকে জানা যায়, ২০১৯ সালে অ্যাডিডাসের জন্য কাজ করা ৪১টি কারখানার ১৬টি বাদ পড়ে এবং ২০২১ সালে নতুন ৫টি কারখানা যুক্ত হয়।

এইচঅ্যান্ডএম ৮টি নতুন কারখানা প্রতিস্থাপন করেছে, যেখানে চলতি বছরে ইন্ডিটেক্স এবং গ্যাপের তালিকা থেকে যথাক্রমে ৩টি ও ৬টি কারখানার নাম বাদ পড়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ বস্ত্র উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পরিচালক ফজলে শামীম এহসান বলেন যে, সরবরাহকারী কারখানার সংখ্যা কমানোর এই প্রবণতা আতঙ্কজনক অবস্থায় পৌঁছে গেছে কেননা এটি সরবরাহকারীদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করতে পারে।

তিনি বলেন, ২০১৩ সালের পর থেকে উদ্যোক্তারা ব্যবসায়ের নীতি অনুসরণ নিশ্চিত করতে অনেক বিনিয়োগ করেছেন এবং ক্রেতার সরবরাহকরণ ব্যবস্থার তালিকা থেকে সরবরাহকারীদের ছেঁটে ফেলা অনৈতিক কাজ হবে। তিনি আরো বলেন যে, আমরা ক্রেতাদের কাছে অনুরোধ করেছি, যদি তারা নতুন সরবরাহকারীদের সাথে কাজ করতে না চান, তাহলে যেন পুরনোদের সাথে কাজ করা বন্ধ না করেন।

পলিসি ডায়লগ কেন্দ্রের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ডক্টর খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন যে, সাম্প্রতিক এক পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায়, ক্রেতারা তাদের সরবরাহকারীদের একত্রীকরণ করে সেইসব কারখানা ও দেশে স্থানান্তর করছেন, যাদের খরচ ও কোভিড-১৯ সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা কম এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ করে।

তিনি আরো বলেন, এসব সূচক থেকে এটা অনুমেয় যে, যে বড় বড় সরবরাহকারী কারখানাগুলোর ভালো নগদ প্রবাহ ছিল, তারা সময়মতো পণ্য সরবরাহ করার মতো অবস্থায় ছিল বিধায় আরো বেশি কাজের ফরমায়েশ পেয়েছিল; বিশেষ করে অতিমারীর সময়ে।

বাংলাদেশ পোশাক উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) হিসেব অনুযায়ী, সংগঠনটির প্রায় ৩৫১ বৃহৎ সরবরাহকারী কারখানা- যেগুলোর প্রতিটিতে দুই হাজারেরও বেশি শ্রমিক কাজ করে, তাদের একত্রে অর্জিত আয় হলো বারোশো উনত্রিশ কোটি মার্কিন ডলার, যা ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিজিএমইএ-র সদস্যদের মোট আয়ের ৬৩ শতাংশ।

প্রায় ১,৩৩৪টি কারখানা বিজিএমইএ-র সক্রিয় ও নিবন্ধিত সদস্য। ২০১৯-২০ অর্থবছরের মোট ২,৭৯৪ কোটি আমেরিকান ডলার রপ্তানি আয়ের ১,৯৩২ কোটি মার্কিন ডলার এসেছে এই কারখানাগুলো থেকে।

Share if you like

Filter By Topic