করোনা বিশ্বমারি হয়ে দেখা দেওয়ার আগে থেকেই কূটনীতিতে চীনের জেদি, একগুঁয়ে এবং কঠোর আচরণ দিনে দিনে বাড়ছিল। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ বিশ্বমারিতে রূপ নিয়ে বিশ্বকে দ্রুত গ্রাস করে। এরপর পুরোপুরি ‘নেকড়ে যোদ্ধার’ (উলফ ওয়ারিয়র) রূপ নেয় বেইজিং যা বলতে মোটাদাগে বোঝায় আগ্রাসী কূটনীতি।
চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান মার্চে এক টুইটার বার্তায় অভিযোগ করেন, ‘করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি হয়েছে আমেরিকায়। ওয়াশিংটন এটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টায় হন্যে হয়ে উঠেছে।’ টুইটার বার্তায় আরো বলা হয়, ‘করোনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথম রোগী কখন আক্রান্ত হয়েছিল? কতজন আক্রান্ত হয়েছে?...মার্কিন সামরিক বাহিনীই চীনের উহানে করোনা বিশ্বমারি নিয়ে এসেছে। আমেরিকাকে এ নিয়ে পরিষ্কার ভাষায় কথা বলতে হবে। এ সংক্রান্ত তথ্য মানুষের কাছে প্রকাশ করতে হবে। এ নিয়ে তাদেরকে ব্যাখ্যাও দিতে হবে।’
ঝাও-কে টুইটারে প্রায় ১০ লাখ ব্যক্তি অনুসরণ করেন। এ ছাড়া চীনে তাঁর লাখ লাখ অনুসারী রয়েছে। টুইটারে এ বার্তা দেওয়ার পর একটি বিরল ঘটনার মুখে পড়েন তিনি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ঝামটা দিয়ে ঝাওয়ের মুখ বন্ধ করে দেন। টুইটার ঝাওয়ের বার্তা দেওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তর্ক-বিতর্কের ঝড় ওঠে। সে সময় ঝাওয়ের বক্তব্য সোজাসুজি বাতিল করে দেন ওয়াশিংটনে চীনের রাষ্ট্রদূত কুই তিনাকাই। কুই এই টুইটার বার্তাকে বলেন, ‘যথেষ্ট ক্ষতিকর জল্পনা-কল্পনা।’

চায়না’স সিভিলিয়ান আর্মি বইয়ের প্রচ্ছদ
বিস্তৃত প্রেক্ষাপট থেকে এ ঘটনার দিকে তাকালে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন উঠে আসে। চীনের কূটনীতিবিদরা অনেককাল ধরেই ভদ্রতা ও শৃঙ্খলার জন্য বিশ্বে সুনাম কুড়িয়েছেন। হঠাৎ করে কেনো তাঁরা মারমুখো হয়ে উঠলেন এবং ওয়েস্টার্ন সিনেমার নায়কদের মতো কোমর পর্যন্ত অস্ত্র তুলেই গুলিবর্ষণে উন্মত্ত হয়ে উঠলেন? বিশ্ব ব্যবস্থার নেতা হিসেবে আমেরিকার প্রভাবকে ক্ষুণ্ণ করতে বেইজিং এবারে কী কৌশল নিয়ে ময়দানে নেমেছে? ভারতের মতো চীনের পড়শি দেশগুলোর জন্যে বেইজিংয়ের এই পররাষ্ট্র নীতি কী অর্থ বয়ে আনছে?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে পরাশক্তির প্রতিযোগিতায় আগামী দশক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। এতে সামরিক উত্তেজনা বাড়বে এবং বিশ্বের কর্ম ব্যবস্থায়ও পরোক্ষ পরিবর্তন দেখা দেবে। চীনের উত্থান বিস্তৃত বিশ্বে যে চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে, সম্প্রতি প্রকাশিত তিনটি বইয়ে অপরিহার্য দৃষ্টিকোণ থেকে তার স্বরূপ উন্মোচনের প্রয়াস চালানো হয়েছে। এবারে আমরা সে দিকেই নজর দেবো।

চায়না’স সিভিলিয়ান আর্মি বইয়ের লেখক পিটার মার্টিন
২.
পিটার মার্টিনের ‘চায়না’স সিভিলিয়ান আর্মি’ বইয়ের উপশিরোনাম হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে ‘উলফ ওয়ারিয়র’ (নেকড়ে যোদ্ধা) শব্দগুচ্ছ। চীনের অ্যাকশন বা মারদাঙ্গা ছবি থেকে তুলে আনা হয়েছে এ শব্দগুচ্ছ। এসব ছায়াছবির ভাষ্য অনুযায়ী, ‘চীনের ওপর যে কেউ আঘাত করুক না কেনো, সে যতই দূরে থাকুক তাকে হত্যা করা হবে।’ এ সব ছায়াছবির নায়ক বা মুখের ভাষায়, বাহাদুর হলো চীনা গণমুক্তি ফৌজের বিশেষ বাহিনীর যোদ্ধা বা কমান্ডো। বিদেশি ভাড়াটে সেনাদেরকে খতম করায় সিদ্ধহস্ত এ সব লড়াকু সেনা ‘নেকড়ে যোদ্ধা’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
কূটনীতির জগতে এই শব্দদ্বয় দিয়ে কঠোরভাষী কর্মকর্তাদের বোঝান হয়। এ সব কর্মকর্তা প্রয়োজনে তাঁদের বিদেশি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সভ্যভব্য বাক্যবাণের বদলে কঠোর সমালোচনা এবং আপাত অভব্য ভাষা প্রয়োগ করেন। মার্টিনের প্রশংসনীয় বইয়ে এ ধরণের বাক্য ব্যবহারের ভুরি ভুরি উদাহরণ টেনে আনা হয়েছে। আর এসব উদাহরণ দেখার পর অনেকের মনেই যে প্রশ্ন ঘুরপাক খাবে তা হলো, ‘আচ্ছা, হুমকি এবং অবমাননাকর ভাষা প্রয়োগ করে চৈনিক কূটনীতিবিদরা শেষ পর্যন্ত কী অর্জন করতে চাইছেন?’
মার্টিন যে সব উদাহরণ তুলে ধরেছে তার কয়েকটি এখানে তুলে ধরা হলো। ২০১৮ সালে ১৩ ক্ষুদ্র দ্বীপ নিয়ে গঠিত প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ ফোরামের বৈঠকে চীনা প্রতিনিধি ভাষণ দেওয়ার জন্য পূর্বনির্ধারিত নিজ সময় আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে অস্বীকার করেন। রাগে দিশেহারা হয়ে বৈঠক ছেড়ে চলে যান তিনি। কানাডায় চীনের রাষ্ট্রদূত স্বাগতিক দেশটিকে ‘পশ্চিমী অহংবোধ এবং শ্বেত আধিপত্যে’ ভরপুর বলে অভিযোগ করেন। পাশাপাশি, দক্ষিণ আফ্রিকায় চীনের প্রতিনিধি দাবি করেন, ওয়াশিংটনের নীতিমালা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে করে তুলেছে ‘বিশ্ব-শত্রু’।
আর সুইডেনে চীনের রাষ্ট্রদূত গুই কংগিউ এতো বেশি মারমুখো এবং বিতর্কিত কথাবার্তা বলেন যে তাকে দুই বছরের মধ্যে ৪০ বারের বেশি স্টকহোমের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তলব করতে হয়। এর মধ্যে স্মরণীয় হলো এক সময়ে তিনি রাগে গজগজ করতে করতে সুইডেনকে ৪৮ কেজির লাইটওয়েট এবং নিজ দেশ চীনকে ৮৬ কেজির হেভিওয়েট মুষ্টিযোদ্ধা হিসেবে তুলনা করেন। তিনি বলেন, ‘লাইটওয়েট মুষ্টিযোদ্ধা কোনো কথা শোনার ধারই ধারছে না। উল্টো হেভিওয়েট মুষ্টিযোদ্ধার সীমানায় ঢুকে ক্রমাগত উস্কানিমূলক তৎপরতায় লিপ্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় ৮৬ কেজির মুষ্টিযোদ্ধার আর করাই কিই বা আছে?’
এদিকে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারোর ছেলে করোনা বিশ্বমারির জন্য ‘চীনা স্বৈরতন্ত্র’ দায়ী বলে মন্তব্য করেন। তার জবাবে, চীনের রাষ্ট্রদূত ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের পরিবারকে ‘বিষ’ হিসেবে অভিযুক্ত করেন। কোভিড-১৯-র উৎপত্তি নিয়ে ক্যানবেরা আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বান জানানোর পর চীনের রাষ্ট্রদূত চেং জিনগাই বলেন, অস্ট্রেলিয়ার গরুর গোশত এবং সূরা খাওয়া চৈনিকরা বন্ধ করে দিতে পারে।
চীনাজাত বা চীনা ব্যান্ডের অকূটনৈতিকসুলভ কূটনীতিকে নিঃসন্দেহে আরো ধারাল করে তুলেছে বিশ্বমারি। অবশ্য মার্টিন মনে করেন, এমন কথা বলে মোটেও এ মানসিকতার ব্যাখ্যা করা যায় না। চীনা কম্যুনিস্ট পার্টির আদর্শিক বিশ্লেষণের সাথে যোগ হয়েছে বাইরের দুনিয়ার প্রতি চীনাদের স্বভাবসুলভ অবিশ্বাস। তারই পরিণামে হয়ত এমনটা ঘটছে এবং এটি মেনে নিতে হবে বলে ধারণা ব্যক্ত করেন তিনি।
মার্টিন এর আগে চীন থেকে সাংবাদিকতা করেছেন। নিজ কথার সমর্থনে তিনি চীনা কম্যুনিস্ট পার্টি বা সিসিপি তৈরির সময়ের কথা তুলে ধরেন। তিনি লিখেছেন, “গোপনীয় কিন্তু সন্দেহ ও অবিশ্বাসের ঘেরাটোপে ভরা রাজনৈতিক বিভ্রান্তি থেকে বের হতে পারেন না চীনা দূতরা। এ ছাড়া, কৃত্রিম প্রক্রিয়ায়, গোপন বিপ্লবী তৎপরতার মাধ্যমে সৃষ্ট ও শীতল যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় পরিপক্বতা অর্জনকারী রাজনৈতিক ব্যবস্থাই অনুগমন করে থাকেন তাঁরা।”
চীনা কূটনীতিকরা স্বাভাবিক ভাবেই প্রত্যাশা করেন, ক্ষোভে ফেটে পড়ার যে মনোভাব তাঁরা দেখান, তাদের প্রধান কর্তাব্যক্তি শি জিনপিং তাতে সন্তোষ ব্যক্ত করবেন। ২০০৯ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকার সময় মেক্সিকো সফর করেন শি। সে সময়ে পররাষ্ট্র বিষয়ক তাঁর কঠোর মনোভাব সবকিছু ছাপিয়ে উঠে এসেছিল। মেক্সিকোতে এক সমাবেশে তিনি বলেন, “অনেক বিদেশিই নিজেদের ভাগ পুরোপুরি আদায় করে নিয়েছে এখন আমাদের দিকে তাদের আঙ্গুল তুলে ধরা ছাড়া আর ভালো কিছু করার নেই।”
এরপর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর পরই শি প্রশাসন অভ্যন্তরীণ স্মারকলিপিতে ‘পশ্চিমা সাংবিধানিক গণতন্ত্র’, মানবাধিকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং অন্যান্য মূল্যবোধসহ যা কিছু পশ্চিমা গণতন্ত্রকে সমর্থন করে তাকেই লক্ষ্যে পরিণত করেন। কাজেই চীনা কূটনীতিবিদরা যখন নেকড়ে যোদ্ধার ব্যক্তিত্ব ধারণ করেন তারা কার্যত সিসিপি অনুমোদিত বৈরীরূপই পরিগ্রহণ করেন।
[ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলা রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]
