Loading...

চুড়িহাট্টা ট্রাজেডি: ময়নারা এখনও কাউকে পাশে পাওয়ার অপেক্ষায়

| Updated: February 20, 2022 13:27:02


২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ভয়ঙ্কর সেই অগ্নিকাণ্ডের পরদিন চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানশন। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ভয়ঙ্কর সেই অগ্নিকাণ্ডের পরদিন চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানশন।

দুই মেয়ে আর এক ছেলেকে নিয়ে ময়না বেগমের সংসার। স্বামী মো. শাহীন আগলে রেখেছিলেন ভালোভাবেই। দোকানে চাকরির পাশাপাশি জমি কেনাবেচার ব্যবসাও করতেন। নিজেদের জমি-বাড়ি ছিল না। তবে পুরান ঢাকার ভাড়া বাসায় সংসার চলছিল ভালোই। তাদের সেই ‘ভালো দিন’ নেই হয়ে যাওয়ার তিন বছর হচ্ছে রোববার।খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

ঠিক তিন বছর আগে, এমনই এক বসন্তের রাতে হঠাৎ বিস্ফোরণের পর নরককুণ্ডে পরিণত হওয়া চকবাজরের চুড়িহাট্টা মোড়ের আগুনে এলোমেলো হয়ে গেছে ময়নার জীবন-সংসার।

চুড়িহাট্টায় রাসায়নিক থেকে সৃষ্ট আগুনের পর শাহীন নিখোঁজ হন। ১৫ দিন পর তার লাশ শনাক্ত হয়। সেই থেকেই ময়না বেগমের যে কষ্টের জীবন শুরু হয়েছিল তা এখনও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাকে।

সেই ভয়াবহ আগুন শুধু শাহিন নয়, কেড়ে নেয় ৭০ জনের প্রাণ। এই দিনটি এলে ময়নার মতো স্বজনহারারা অনুভব করেন সেই যাতনা।

পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া স্বপ্ন শেষে এখন অর্হনিশ দুঃখের দিন পার করা ময়না বেগম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘আমার স্বামী কামাই রোজগার যা করত ভালোই চলতাম, কষ্ট আছিল না। সে চলে যাওয়ার পর বুঝলাম দুনিয়া কতো কষ্টের। বাচ্চাদের খাওয়া-দাওয়ার খরচই অনেক। এখন সেই খরচ আরও বাড়ছে।ম

“বাসা ভাড়াটাও দিতে পারি না। ১৪ বছরের পোলার পড়াশুনা বন্ধ কইরা দিছি। এতো টেকা কই পামু। দুই মেয়ে মাদ্রাসায় যাওয়া আসা করে।“

জীবন সংগ্রামে সময় পার করা এই নারী জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর অনেক সংগঠন থেকেই বলা হয়েছিল তারা ক্ষতিপূরণ বা সহযোগিতা পাবেন। অনেকে আশ্বাসও দিয়েছিলেন। তারাও রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত লাশ দাফনের জন্য ২০ হাজার টাকা ছাড়া তার পরিবার তেমন কিছু পায়নি।

তাকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে (মাস্টার রোলে) পরিচ্ছন্নতা কর্মীর (ঝাড়ুদার) কাজ দেওয়া হয়েছে। নিরূপায় বাধ্য হয়েই চাকরিটি নিয়েছেন তিনি।

সামাজিক মর্যাদাবোধ ও শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে সেই কাজটিও ঠিকমতো করতে পারছেন না জানিয়ে ময়না বলেন, “আমারে একটা চাকরি দিছে। রাস্তা ঝাঁড়ু দিতে হয়। কিন্তু আমার শরীরেও কুলায় না। আর সেই কাজটা আমারে কেউ করতেও দিতে চায় না।“

কাজে না গেলে টাকা পাওয়া যায় না জানিয়ে তিনি বলেন, “কী যে বিপদে আছি। হুনছি আমাগো জইন্যে ৩০ কোটি টাকা জমা পড়ছে। কিন্তু আমাগো তো কেউ কিছু কয় না। আত্মীয়-স্বজনেরা আর কত দিব!”

ময়নার সংসারের মতোই দিশেহারা অবস্থা রানা ও রাজুর পরিবারের। করুণ দিনযাপনের গল্পটা প্রায়ই একই রকম তাদেরও।

ক্ষণিকের মধ্যে অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হওয়া চুড়িহাট্টার সেই ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচতলায় মোবাইল ফোন মেরামতের দোকান চালাতেন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর দুই ভাই মাসুদ রানা (৩৪) ও মাহাবুবুর রহমান রাজু (২৮)। রুটিরুজির ওই দোকানের ভেতর থেকেই তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়।

রানার ছেলের বয়স এখন প্রায় পাঁচ বছর। আর রাজুর মৃত্যুর পর তার সন্তান হয়েছে বলে জানান আরেক ভাই খলিলুর রহমান মেরাজ। তিনি জানান, মূলত দুই ভাইয়ের আয়েই সংসার চলত। তাদের অকাল মৃত্যুর পর পুরো পরিবারটির জলে ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

“অনেকেই নানা রকম আশ্বাস দিলেও কেউই পাশে দাঁড়ায়নি। তাদের জন্য কম দামে দোকান বরাদ্দের কথা বলে তিন লাখ টাকা নিয়েছে একটি পক্ষ। দুই বছর হতে চললেও মার্কেট তৈরিরই কোনো নামগন্ধ দেখা যাচ্ছে না।“

আগুনে নিহত রানা ও রাজুর চাচা চকবাজারকেন্দ্রিক আঞ্চলিক সংগঠন ‘সোনাইমুড়ী মানবকল্যাণ ফাউন্ডেশনের’ সংগঠক এম এ রহিমের কণ্ঠেও ক্ষোভ ক্ষতপূরণ বা পুর্নবাসন নিয়ে।

তিনি বলেন, আগুন লাগার পর আমরা সরকারকে বললাম যারা মারা গেছেন তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক, পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকসহ অন্য দাহ্য পদার্থগুলো সরিয়ে নেওয়া হোক। মোট ১১টা দাবি দিলাম। কোনটা কী আজ পর্যন্ত পূরণ হয়েছে?

তিনি বলেন, শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে ওই আগুনে নিহত বিভিন্ন পর্যায়ের ১৯ জন শ্রমিককে দুই লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ঢাকা সিটি করপোরেশন ৭-৮ জন নারীকে কাজ দিয়েছে। আর কয়েকজনকে দোকান দেওয়ার কথা বলেছে। এর বাইরে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলো কিছু পায়নি। খুব কষ্টে চলছে কয়েকটি পরিবার। তাদের স্বজনেরা হয়তো কিছুদিন চালিয়ে নিয়েছে। কিন্তু এখন তারা পথে বসার উপক্রম।

এম এ রহিম বলেন, এই যে দুই ভাই রানা আর রাজু মারা গেলেন। ওদের বাবাকে পলাশীতে দোকান দেবে বলে ১২ লাখ টাকা দাম ধরে হতাহতের পারিবার হিসেবে ছাড় দিয়ে তিন লাখ নিল করপোরেশন। অথচ এখন পর্যন্ত কোথায় মার্কেট হবে তাই কেউ জানেন না।

“এমনিতেই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, ধারদেনা করে তিন লাখ টাকা দিয়েছে। সেটারও কোনো ফল পাচ্ছে না তারা। রানার স্ত্রীকে স্বজনেরা পরে অন্যত্র বিয়ে দিয়েছেন। আর রাজুর স্ত্রীকে বিয়ে করেছেন তার (রাজুর) ছোট ভাই।“

রহিমের দাবি, দুই বছর আগে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল বলেছিলেন, চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ৪০টি বেসরকারি ব্যাংক প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ৩০ কোটি টাকা দিয়েছে।

তারাও বিভিন্ন সময় ব্যাংকগুলোর টাকা জমা দেওয়ার ছবিসহ সংবাদ গণমাধ্যমে দেখেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই টাকা দেওয়ার বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে কিছুই জানানো হয়নি।

সবার দাবি অবিলম্বে ক্ষতিগ্রস্থদের মধ্যে সেই টাকা ভাগ করে দেওয়া হোক। তাতে কিছু হলেও পরিবারগুলোর কষ্ট কমবে।

Share if you like

Filter By Topic