চীনে চলছে চালকহীন গাড়ি


এফই অনলাইন ডেস্ক | Published: November 09, 2021 12:31:52 | Updated: November 09, 2021 19:56:27


হারবিন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে চালকহীন গাড়ি থেকে খাবারের প্যাকেট সংগ্রহ করছে একজন ছাত্র

চাকার সাথে সাথেই আবর্তিত হয় সভ্যতা। এমন একটি কথা অনেক সময়ই শুনতে পাওয়া যায়। সে ধারাবাহিকতায় চাকা আবিষ্কার, ঠেলা গাড়ি, পশু-টানা গাড়ি, যন্ত্রচালিত গাড়ি, একদম হাল আমলের বিদ্যুৎ-গাড়ি পর্যন্ত বিস্তর পথযাত্রায় চালকের আসন কেউ কেড়ে নিতে পারেনি। এবারে নতুন এক যুগ এসে দাঁড়াল আমাদের মুখোমুখি। বাহন বা গাড়ি চলছে; কিন্তু নেই কোনো চালকের আসন। আসলে চালকই নেই। তার আসন থাকবে কোন যুক্তিতে! ভাবা যায়! হ্যাঁ, চালকের দিন বোধহয় এবার ফুরালো। দিনকে দিন এমন চালকহীন বাহন বা গাড়ি এখন আরো বাস্তব হয়ে উঠতে শুরু করেছে। চীনে চালকহীন বাহনের বাণিজ্যিক বাস্তবতা প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় রূপ নিয়েছে।

হেইলংজিয়াং প্রদশের হারবিন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে, শিক্ষক ছাত্রের জটলার কাছ দিয়ে চলছে মালবাহী বাহন। ছাত্রবাসের সামনে এসে থামলো। তারপর ডাকলো ২৫ ছাত্রকে। একই সময়ে খাবারের নির্দেশ দিয়েছিলো তারা। বাহন থেকে তাদের খাবার তুলে নেওয়ার জন্যেই এ আহ্বান জানানো হলো।

খাবার নিতে এসে ছাত্রদের অবাক হওয়ার পালা! হলুদ রঙ-এর চালকহীন এক বাহন তাদের সামনে। চালক নেই। নেই স্টিয়ারিং হুইল। কিংবা এক্সিলেটর বা ব্রেক চাপার পা-দানি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় চালিত বাহন তাদের বললো, খাওয়ার পর্ব মজায় কাটুক। এই হলো তাদের খাদ্যবাহক। বার্তা শেষ করে আবার চলতে শুরু করলো। এবারে পরের কেন্দ্রে খাওয়া পৌঁছাতে হবে তাকে। দাঁড়াবার সময় তো নাই।

ছাত্রদেরকে সরবরাহে সহায়তা করার প্রথম পর্ব হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় এমন খাদ্যবাহককে নামিয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বেইজিং, সাংহাই থেকে শুরু করে শানডং, জেইজিয়াং এবং জিয়ানসু প্রদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বয়ংক্রিয় সরবরাহ বাহক নামাতে শুরু করেছে। এভাবে তারা বাহকের একটি বিশাল দলকে কাজে নামাচ্ছে।

চালকহীন সরবরাহ ব্যবস্থা বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্রে যে বিশাল গতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে তাই কাজ করছে এখানে। হারবিন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন বিভাগের উপপ্রধান লি বো বলেন, জনসমাগম বা ভিড়ের বিপদ এড়াতে ছাত্রদের জন্য ৯৪টি খাদ্যকেন্দ্র খুলেছি এবং এতে রয়েছে ১৬০০ রকমের খাদ্যদ্রব্য। ছাত্ররা নিজ নিজ জায়গা থেকে ক্রয়াদেশ পাঠালেই পছন্দসই খাবার-দাবার তাদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়।

চালকহীন সরবরাহবাহকরা গড়ে দৈনিক ২ থেকে ৩ হাজার ক্রয়াদেশ গ্রহণ করতে পারে বলেও জানান তিনি। সরবরাহবাহকদের তৎপরতার কথা বলতে যেয়ে তিনি আরো জানান, প্রতিদফায় ৮০ জনকে সহায়তা করতে পারে এটি। এ ছাড়া, খাদ্য সরবরাহের জন্য পাঁচ সেকেন্ডে ১০০ কল গ্রহণ করতে পারে। মানুষ খাটিয়ে যা পাওয়া যেত তারচেয়ে দশগুণ বেশি ফল এর মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।

চালকহীন সরবরাহ যানের এ দলে ড্রোনও যোগ হয়েছে। ঝেজিয়াং প্রদেশে ফল সরবরাহে এসএফ এক্সপ্রেস ব্যবহার করছে ড্রোন। পাহাড়ের চূড়া থেকে বেবেরির চালান আনতে ব্যবহার করা হচ্ছে ড্রোন। এ ফল খুবই নাজুক এবং পাহাড়ি পথে পাঠাতে যেয়ে স্থানীয় চাষীরা সবসময়ই সমস্যায় পড়েন। পাহাড়ি পথে বহনের সময় একটু এদিকে সেদিক হলেই ফলে দাগ পড়ে যায়। এছাড়া, পাহাড় চূড়া থেকে এ ফলের সরবরাহ আসতে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। তবে ড্রোন ব্যবহার করায় ফলে দাগ লাগার আশংকা কমে প্রায় শূন্যে এসে ঠেকেছে। আর সময়? মাত্র আট মিনিটেই গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছে তরতাজা ফল। এসএফ এক্সপ্রেস দিয়েছে এ খরব।

সাংহাইতে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অটোমোবইলিটির প্রতিষ্ঠাতা বিল রুসো বলেন, চীনে ৩০-এর চেয়ে বেশি কোম্পানি স্ব-চালিত সরবরাহ ব্যবস্থার কাজে নেমেছে।

এ ধরণের ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে যেয়ে তিনি আরো বলেন, দুনিয়ার রূপান্তর প্রক্রিয়া চলছে খুবই দ্রুত গতিতে। এতে বড় বড় সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বিশ্বকে। স্ব-চালিত এবং রোবটিক প্রযুক্তিভিত্তিক গতিশীল ব্যবস্থা নানাভাবে নমনীয় এবং কম কেন্দ্রমুখী নির্মাণ তৎপরতার মতো পদক্ষপ নেওয়ার সুযোগ করে দিবে। এতে অর্থনীতি এবং ব্যবসা দ্রুত খাপ খাওয়ানোর কাজ করতে পারবে।

সাম্প্রতিক সময়ে চীনের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো চালক বা মানবহীন সরবরাহ সেবা জোরদার করছে। এতে আশা করা হচ্ছে, দ্রুত পার্সেল পৌঁছে দেওয়া, খাবার সরবরাহ করা, তাজা পণ্য এবং খুচরা ওষুধপত্র সরবরাহ করার মতো ব্যবসাগুলোর বিপুল বাণিজ্যিক মূল্য বাড়াবে।

বিনিয়োগ সংস্থা ইস্টার ক্যাপিটলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চীনের প্রান্তিক বিতরণকারী বাজার চলতি বছর ৩০০ বিলিয়ন ইউয়ান (৪৬ বিলিয়ন ডলার) টপকে যাবে। প্রান্তিক সরবরাহকারী বলতে সাদামাটাভাবে সর্বশেষ ব্যবহারকারীদের সঙ্গে পরিবহনসেবা প্রদানকারীদের লেনদেনকে বোঝানো হয়।

চীনে চালক বা মানবহীন বিতরণ ব্যবসার কার্যকর আদল (মডেল) গড়ে ওঠার শক্তি দিচ্ছে প্রযুক্তি। নানা প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা রয়েছে এমন প্রযুক্তিই এখানে প্রধান ভূমিকায় রয়েছে। গোটা শিল্পখাতটি ধীরে ধীরে ব্যাপক বাণিজ্যিক সুবিধা অর্জন করবে। পূর্বাভাস এবং প্রতিবেদনে এমন কথা শোনানো হচ্ছে।

এদিকে, চালকহীন যানের কোম্পানিগুলোকে নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভর করতে হয়। এসব কেন্দ্র স্ব-চালিত গাড়ি এবং রাস্তার পরিস্থিতির ওপর নজরদারি করছে। প্রয়োজনে, তাৎক্ষণিকভাবেই সহযোগিতা বা নির্দেশনা যুগিয়ে যায়।

[চায়না ডেইলি অবলম্বনে সৈয়দ মূসা রেজা]

Share if you like