১৮৭০ সালের ৯ জুন প্রয়াত হন বিশ্ববিখ্যাত ব্রিটিশ কথাসাহিত্যিক চার্লস ডিকেন্স। তার সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে তৎকালীন ইউরোপীয় সমাজকে যেমন তিনি তুলে ধরেছিলেন, তেমনি তুলে ধরেছিলেন সমাজে বিদ্যমান শ্রেণি বৈষম্য, খুলে দিয়েছিলেন অভিজাততন্ত্রের মুখোশ। আর তাই মৃত্যুর ১৫২ বছর পরও সাহিত্য জগতে তার রচনা তুমুল জনপ্রিয়।
ব্লেক হাউস (১৮৫৩)
১৮৫২ সালের মার্চ থেকে ১৮৫৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিশ পর্বে ডিকেন্স এই উপন্যাসটি লেখেন। পরে ১৮৫৩ সালেই বই হিসেবে বের হয়। তার সবচেয়ে জনপ্রিয় বই হয়তো নয় এটি, কিন্তু অনেক সমালোচকের বিচারেই ব্লেক হাউস তার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম। সমালোচক উইলিয়াম হোল্ডসওর্থের মতে এর কাহিনী ১৮২০ দশকের শেষভাগে (১৮২৭) আবর্তিত। আবার, বেশিরভাগের মতে এটি ১৮৩০ দশকের প্রেক্ষাপটে রচিত।
উপন্যাসটির কাহিনী আবর্তিত হয়েছে দীর্ঘসময় ধরে চলা একটি মামলাকে উপজীব্য করে। 'জানডিস অ্যান্ড জানডিস' (ভার্সেস শব্দটা ইংল্যান্ডে অ্যান্ড হিসেবেই প্রচলিত ছিলো) নামের একটি মামলা কয়েক প্রজন্ম ধরে চলতে থাকে। উপন্যাসটি মূলত বর্ণিত হয় এসথার নামে একটি মেয়ের জবানিতে। উঠে আসে ইংল্যান্ডের বিচারিক দীর্ঘসূত্রিতার নির্মম চিত্র। মামলা চালাতে গিয়ে ধ্বংস হয় পরিবার, মামলা মাথায় নিয়ে জন্মায় শিশুরা। এভাবে একটি মামলা চলে বছরের পর বছর।
সমকালে কেউ কেউ এটিকে অতিরঞ্জিত আখ্যা দেন, তবে ডিকেন্স নিজেই বলেছিলেন এমন মামলাও আছে যা ৫৬ বছর ধরে চলছে! (ডিকেন্সের মৃত্যুর পর সেটি শেষ হয়)
এই উপন্যাসটি ১৮৭০ পরবর্তী বিচারিক আইন সংশোধন আন্দোলনের মূল অণুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল।
ডেভিড কপারফিল্ড (১৮৫০)
ডিকেন্সের সবচেয়ে আলোচিত ও বহুলপঠিত উপন্যাস এটি। এই উপন্যাসটি 'ডেভিড কপারফিল্ড' নামে এক কিশোরের জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত সময়ের গল্প।
আত্মজৈবনিক এই উপন্যাসটি অনেকের মতে ডিকেন্সের নিজের জীবনের ছায়া অবলম্বনে রচিত। এই উপন্যাসটি ডেভিডের জবানিতে উত্তম পুরুষে বর্ণিত। ডেভিড জন্মের ছ'মাস আগেই তার বাবাকে হারায়। তার সাত বছর বয়সে মা আবার বিয়ে করেন। এরপর নতুন বাবার আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে ডেভিডকে যেতে হয় আরেক ঠিকানায়।
এরপর অনেক সংগ্রাম, ডেভিডের চমকপ্রদ নিজস্ব পরিচয় খুঁজে পাওয়া।
ডিকেন্স এই উপন্যাসে এমনভাবে শুরু থেকে শেষপর্যন্ত কাহিনীটি গেঁথেছেন, যাতে করে একটি চারা গাছের মহীরুহ হয়ে ওঠার মত করে একটি শিশুরও পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার গল্প আমরা দেখি। অথবা বৃক্ষ নয়, হতে পারে ডেভিডের জীবনটি কোন পাখির। অনেক জায়গা ঘুরে, বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জন করে একসময় সে থিতু হতে পারে। ডিকেন্সের নিজের কাজগুলোর ভেতর এটিই ছিলো তার সবচেয়ে প্রিয়।
আ টেল অব টু সিটিজ (১৮৫৯)
চার্লস ডিকেন্সের মৃত্যুর পর মুক্তি পায় এই ইতিহাস-আশ্রিত এডেভেঞ্চারটি৷ সর্বকালের সর্বাধিক বিক্রিত বইগুলোর একটি এটি৷
ফরাসি বিপ্লবের পটভূমিকায় লেখা এই উপন্যাসের মূল চরিত্র ডাক্তার ম্যানেট। তিনি ফ্রান্সের বাস্তিলে আটকা পড়েন। এদিকে তার পরিবার ছিলো লন্ডনে। ১৮ বছর পর মেয়ে লুসির সাথে দেখা হয় তার। দুটো ভিন্ন শহরে আটকে পড়া অসংখ্য মানুষ এমন ছিলেন যারা এভাবে প্রিয়জনদের চিরতরে হারিয়েছেন৷ ডিকেন্স মূলত যুদ্ধের চেয়েও এখানে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখাতে চেয়েছেন মানবিক সম্পর্কগুলোকে। সবার উপরে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসাকে স্থান দিয়েছেন।
ডন ডি'আমোসার মতে এই বইটি একটি সার্থক এডভেঞ্চারও বটে, কারণ প্রতি মুহূর্তে মূল চরিত্র ডাক্তারকে থাকতে হয় প্রাণের ঝুঁকিতে, মোকাবেলা করতে হয় শত্রুর।
ডিকেন্সের সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহী উপন্যাসের একটি এটি যেখানে ইতিহাস, রাজনীতি, রোমাঞ্চ, ভালোবাসা সব এসে মিলেছে একবিন্দুতে।
অলিভার টুইস্ট (১৮৩৮)
চার্লস ডিকেন্সের দ্বিতীয় উপন্যাস এটি। প্রকাশিত হয় ১৮৩৮ সালে। মাত্র ২৮-২৯ বছর বয়সের তরুণ লেখক ডিকেন্স জীবন্ত করে তোলেন তৎকালীন ইংল্যান্ডের শিশুশ্রম, পথশিশু তৈরি করে ভিক্ষাবৃত্তি ও শিশুদের অপরাধী হিসেবে কাজে লাগানোর বিষয়গুলো।
উপন্যাসের প্রধান চরিত্র অলিভার টুইস্টের জবানিতেই উঠে আসে এসব ঘটনা। মাত্র নয় বছর বয়সেই অলিভারকে নামিয়ে দেয়া হয় এই কাজে। এরপর নানান ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে অলিভার সুস্থ জীবনে ফিরতে পারে কিনা তা নিয়েই এই কাহিনী।
তবে এই উপন্যাসের বিরুদ্ধে উঠেছিলো ইহুদি বিদ্বেষের অভিযোগ। ফাগিন নামের চরিত্রটিকে ডিকেন্স এমনভাবে তুলে ধরেছিলেন যাতে করে অনেকে বলতে শুরু করেছিলেন ডিকেন্স ইহুদিদেরই সার্বিকভাবে খারাপ মনে করেন।
তবে সার্বিকভাবে উপন্যাসটি ডিকেন্সের সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করে। পাশাপাশি শিশুশ্রম ও তাদের ব্যবহার করে অপরাধচক্র গড়ে তোলার বিরুদ্ধে তুমুল আলোচনা তৈরি করে।
পিকউইক পেপারস (১৮৩৭)
চার্লস ডিকেন্সের প্রথম উপন্যাস ছিলো এটি। প্রথম উপন্যাসেই বাজিমাত করেছিলেন তিনি। দম ফাটানো হাসির ভেতর দিয়ে তুলে এনেছেন ইংল্যান্ডের অভিজাততন্ত্রের চিত্র।
'দি আটলান্টিক' এর নিকোলাস ডেমস বলেছিলেন যে, শুধু সাহিত্য কথাটা এই বইয়ের জন্য যথেষ্ট নয়। এটি একেবারে উৎকৃষ্ট বিনোদনও বটে।
অঙ্কনচিত্রী রবার্ট সিমোরের স্ত্রী অবশ্য দাবি করেছিলেন এই চরিত্রটির মূল আইডিয়া তার স্বামীর দেয়া। তবে ডিকেন্স বলেছিলেন রবার্ট এখানে একটি শব্দও বলেননি বা লেখেননি।
বইটির মূল কাহিনী আবর্তিত হয়েছে স্যামুয়েল পিকউইক নামে একজন হৃদয়বান ও অভিজাত জমিদারের ওপর ভিত্তি করে।
এই হৃদয়বান জমিদার পিকউইক ক্লাবের সভাপতি। তিনি আরো তিনজন ক্লাব সদস্যকে নিয়ে ইংল্যান্ডের চেনা গণ্ডি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। এই ভ্রমণ পথের নানা মজার ঘটনা ও ভুল বোঝাবুঝিতে হওয়া একটি মামলা - এসব নিয়েই কাহিনী।
একটি রম্য, বিদ্রুপাত্মক উপন্যাস হিসেবে তুমুল জনপ্রিয়তা ও সমালোচক আনুকূল্য পায়। ডিকেন্সের সাহিত্যে চলার পথও অনেকটাই সহজ হয়ে যায়।
লেখক বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত।