চাঁদের গায়ে চাঁদ - তিলোত্তমা মজুমদারের নারীর অপ্রচলিত উপস্থাপন


আহমেদ জালাল | Published: January 20, 2022 17:14:47 | Updated: January 20, 2022 19:37:03


চাঁদের গায়ে চাঁদ - তিলোত্তমা মজুমদারের নারীর অপ্রচলিত উপস্থাপন

একবিংশ শতাব্দীতে এসে বাংলা সাহিত্যে এক নতুন মাত্রার যোগ ঘটান তিলোত্তমা মজুমদার। চাঁদের গায়ে চাঁদ নামে তিনি একটি উপন্যাস রচনা করেছেন যার সার তত্ত্ব হলো নারী সমকামিতা। বাংলা সাহিত্যে এর আগে নারী সমকামিতা নিয়ে এত বড় কাজ হয়নি।

আধুনিক কালের শক্তিমান কবি জয় গোস্বামী ৯৮ এর শেষের দিকে সমকামিতা নিয়ে লিখেছিলেন-

আমি মেয়েদের,মেয়েদেরই ভালোবাসি
প্রেমিক-প্রেমিকা বা বোঝায় প্রেম বলতে
নারী পুরুষের দেহঘনিষ্ঠ প্রেম
আমার কাছে তা নারীর দিকেই যায়
পুরুষের কোনো ভূমিকা সেখানে নেই


কাহিনী সংক্ষেপ

চাঁদের গায়ে চাঁদ একটি সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস। চরিত্রগুলোর বিশ্লেষণ ঘটালে দেখা যায় প্রধানত ৩টি চরিত্রকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে গোটা উপন্যাস- শ্রুতি,শ্রেয়সী,দেবরুপা।

অপরদিকে গৌণ চরিত্র হিসেবে আছে শ্রেয়সীর রুমমেট বনা মিশ্র, দেবরুপার ভাই দেবাংশু, শ্রুতির ভাই ওলু, যে একই সাথে অটিজমে আক্রান্ত এবং ললিতা নামের এক ট্রান্সজেন্ডার পথশিশু।

যৌনতাকে কেন্দ্র করে রচিত এই উপন্যাসকে লেখিকা পূর্বশ্রুতি ও পরশ্রুতি নামে দুটি পর্বে বিভক্ত করেছেন, যেখানে মানুষের যৌনতার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া কি হবে সে প্রশ্নটিই ঘুরে ফিরে করেছেন।

সমাজ যা স্বাভাবিক মনে করে আদৌ কি তা সব-সময় স্বাভাবিক হয়? উত্তরটিও লেখিকা উপন্যাসের চরিত্র শ্রুতির মাধ্যমে দিয়েছেন।

মফস্বলের মেয়ে শ্রুতি বসু। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পরে বাবার ইচ্ছায় আন্ডারগ্র্যাজুয়েট করতে কলকাতায় চলে আসে, যদিও এখানে তাদের দুরসম্পর্কের এক পিসির বাড়ি ছাড়া আর কোনো আশ্রয় নেই।

আবাসহীন শ্রুতির আশ্রয় হয় কলেজ হোস্টেলের তৃতীয় তলার রুম নং ২০-এ, যেখানে ছিল অপর দুজন রুমমেট শ্রেয়সী ও বনা মিশ্র। শ্রুতির হোস্টেল জীবনের দ্বিতীয় দিনে নতুন একজন রুমমেট হিসেবে তাদের রুমে আগামী তিন বছরের জন্য জায়গা করে নেয়, নাম তাঁর দেবরুপা।

এই উপন্যাসের মাধ্যমে লেখিকা একটি দর্শনকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। দর্শনকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য শ্রুতি আর দেবরুপাই ছিল লেখিকার প্রধান হাতিয়ার।

পূর্বশ্রুতির শ্রুতি বসু মফস্বলের মেয়ে। সদ্য উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় এসেছে। যার সমাজ, দর্শন, আচরণগত রীতিনীতির গড়নের আরো বাকি আছে। অথচ পরশ্রুতিতেই লেখিকা সেই শ্রুতি বসুকে পূর্বের সময়কার তুলনায় বরং যথেষ্ট উপলব্ধিসম্পন্ন করে গড়ে তোলেন।

তাই তো পূর্বশ্রুতিতে নারীসমকামীতাকে মনে প্রাণে ঘৃণা করা শ্রুতি বসুই পরশ্রুতিতে এই যৌন সম্পর্ককে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়। শ্রুতির বক্তব্যই পাঠকের জন্য তুলে ধরা যাক -

আমার শরীর জুড়ে আশ্চর্য অনুভূতি। আমার, ওইরকম,দেবরুপার মতো কাঁচুলি ভেদ করতে ইচ্ছে করছে। আমার শ্রেয়সীকে মনে পড়ছে। হে ঈশ্বর,এর নাম যৌন অনুভূতি! হে ঈশ্বর,আমি কি নিজেকে চিনতে পারছি!

এছাড়াও চাঁদের গায়ে চাঁদ অন্যান্য কারণে পাঠকের মনে দাগ কাটতে পারে। এই উপন্যাস রচনা করতে গিয়ে লেখিকা সনাতন শাস্ত্র ও পুরাণ নিয়ে যে অনেক ঘাটাঘাটি করেছেন তা পাঠক মাত্রই অনুধাবন করতে পারবেন।

বয়ঃসন্ধিকালে তরুণ-তরুণীদের মনোভাব কেমন হয় তা এই বইটিতে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। এ সম্পর্কে বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখক বলেছেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান অস্তিত্ব মানব শরীর। অর্থাৎ শারীরিক ও মানসিক শান্তিই মানুষের আনন্দের মূল উৎস। তাই শরীরকে মানুষের জীবনে মুল্যবান অস্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করাই বোধহয় বুদ্ধিমানের কাজ।

লেখিকা তিলোত্তমা মজুমদারের চাঁদের গায়ে চাঁদ উপন্যাসটি কলকাতার আনন্দবাজারের পূজা সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়।

আহমেদ জালাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।

shahjalalmd459@gmail.com

Share if you like