আপনার জন্য চব্বিশ, আবার আমেরিকার রাষ্ট্রপতির জন্যও চব্বিশ। অসম বণ্টনের উর্বর যুগে এমন সমবণ্টন নীতি কিছুটা অদ্ভুত বটে। কিন্তু, সবকিছু ছাপিয়ে ‘সময়’ আমাদের প্রত্যেককে সে সুযোগ করে দিয়েছে।
হেন ব্যক্তি নেই, যার কাছে একদিন সমান — চব্বিশ ঘণ্টার চাইতে কম অথবা বেশি হতে পারে। তবে, সমান সময় পাওয়া সত্ত্বেও সবাই নিজেকে প্রমাণ করতে পারে না। যার একমাত্র কারণ, সবাই ম্যাজিক সংখ্যা ‘চব্বিশ’কে সঠিকভাবে সাজিয়ে নিতে ব্যর্থ। নিজেকে প্রমাণের স্বার্থে তাই প্রত্যেকেরই প্রথম প্রয়োজন — স্ব স্ব সময় পঞ্জিকা। যা মানুষকে তার যাবতীয় সব কর্ম সঠিক সময়ে সম্পাদন করতে সাহায্য করে।
আজকের লেখায় চলুন জেনে নেওয়া যাক, সময় ব্যবস্থাপনা কীভাবে আমাদের সফল হতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
উজ্জীবিত হতে
ব্যক্তি যখন কোনো কাজের জন্য সময় নির্ধারণ করে রাখেন, তখন তার মধ্যে সে কাজটি সমাপ্ত করার এক বিশেষ তাড়না কাজ করে। ফলে, দিনকে দিন তিনি সামনে অগ্রসর হন এবং নিজেকে ক্রমশ উন্নত করার পাশাপাশি সফলতার দিকে নিয়ে যান। কিন্তু যাদের জীবনে সময় সংক্রান্ত ভাবনা নেই, তারা কখনোই কোনো কাজের জন্য এমন তাড়না অনুভব করেন না। যা কিনা সবসময়ই সফলতার পথে বড় অন্তরায়।
গোছালো জীবন
জীবনের যদিও কোনো ‘রকম’ হয় না, তবে সময় প্রসঙ্গে জীবন হতে পারে দু’রকমের। গোছালো এবং অগোছালো জীবন।
সফল হবার দৌড়ে গোছালো জীবনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আর এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটুকু সম্ভব হয়, সময়ের সঠিক ব্যবহারে। ব্যক্তির হাতে যখন একটি রুটিন থাকে, তখন তিনি নিজেকে তার প্রয়োজনীয় সব কাজে ব্যবহার করতে পারেন, যা ধীরে ধীরে নিজেকে গোছালো করে তোলে।
বদভ্যাসের ধারণা
খেয়ালহীন চলাফেরা কখনোই কোনো বিষয়কে গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করে না। এমন অনেকেই আছেন, যারা ইচ্ছেমতো নিজেকে পরিচালনা করতে গিয়ে অভ্যাস এবং বদভ্যাস— দু'টো ব্যাপারকে এক পাত্রে গুলিয়ে ফেলেন। তাই দিনশেষে গুনতে হয় চড়া মূল্য।
কিন্তু এক্ষেত্রে যারা সময় ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন থাকেন বা সময় প্রসঙ্গে একটি রুটিন হাতে রাখেন, তারা ঠিকই কোনটি অভ্যাস আর কোনটি বদভ্যাস, সে ব্যাপারে স্বচ্ছ ধারণা পান; এবং জীবনে সফলতার সুফল ভোগ করতে পারেন।
সম্পর্ক উন্নয়ন
জীবনে সফল হতে ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোর সুন্দর অবস্থান সবসময়ই মুখ্য অবদান পালন করে। যখন আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কগুলো ভালো থাকে, তখন আমরা ভেতর থেকে এক প্রকার সুখ অনুভব করি, যা আমাদের কর্মজীবনে বড় এক সন্ধিক্ষণ। আর গুরুত্বপূর্ণ এই ব্যাপারটিতেও সময় ব্যবস্থাপনা অন্যতম ভূমিকা রাখে।
কেননা, ব্যক্তির হাতে যদি সময় ভাবনা না থাকে, সেক্ষেত্রে কাজ এবং সম্পর্কের ফারাক বুঝতে পারাটাও মুশকিল হয়ে পড়ে। হয়তো কাছের কোনো প্রিয়জনের বিশেষ কোনো মুহূর্তে এমন ব্যক্তি হয়ে ওঠেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কর্মঠ কেউ, আর সম্পর্কে ধরতে থাকে অযাচিত চিড়। এ বিষয়টি নিতান্তই সময় ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অজ্ঞতাকে ইঙ্গিত করে।
বিরতির মানসিকতা
এমন মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়, যারা দিনরাত খাটাখাটনি করেন ঠিকই, কিন্তু ফলাফল খুব বেশি আশানুরূপ হয় না। এমনটা ঘটার অন্তরালে যে কয়টি বিশেষ কারণ থাকতে পারে, তার একটি হচ্ছে — বিরামহীনতা। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ৫২ মিনিট কাজের পরপর অন্তত ১৭ মিনিট বিরতিতে গেলে উক্ত কাজ খুব বেশি মজবুত হয়। পাশাপাশি, ব্যক্তি কাজে আরও বেশি মনোযোগী হয়ে উঠতে পারেন।
আর এই কর্মবিরতিতে যাওয়া তখনই সম্ভব, যখন ব্যক্তি তার সময়কে সঠিকভাবে ভাগ করে রাখেন। মূলত তারাই একটানা কাজ করেন, যারা অসময়ে সময়ের কাজ এবং সময়ে করেন অসময়ের কাজ।
লক্ষ্য স্থির রাখতে
মানুষ সবচেয়ে বেশি শান্তি বোধ করে স্থিরতায়। কিন্তু স্থিরতা আনয়নে সব মানুষ সমান দক্ষতা দেখাতে পারেন না। এর অন্যতম কারণ লক্ষ্যহীন পথ চলা। যখন ব্যক্তি লক্ষ্য সম্পর্কে অবগত না থেকে পথ চলতে শুরু করেন, তখন খুব সহজাতভাবে তিন ক্রমশ অস্থির হয়ে পড়েন।
এমতাবস্থায় সময় ব্যবস্থাপনাই আমাদের বাতিঘর হয়ে ওঠে। আমরা যখন সময় সম্পর্কে সচেতন থাকি, তখন আমরা আমাদের সঠিক প্রয়োজনগুলো বুঝতে পারি। আর সঠিক প্রয়োজনগুলোই লক্ষ্য নির্ধারণে অন্যতম হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
টিকে থাকার লড়াইয়ে হয়তো সবার সব যুদ্ধাস্ত্র সমান শক্তিশালী হয় না, কিংবা সবাই হয়তো সব ধরনের সহযোগিতা পায় না। আলাদা আলাদা মানুষকে তাই সফল হতে তৈরি করে নিতে হয় মৌলিক সব পন্থা। কিন্তু কৌশল মৌলিক হলেও সময় যেহেতু আমাদের সবার জন্য সমান, তাই সবার আগে সময় সম্পর্কে চৌকস হওয়াটাই জীবন যুদ্ধে তাবড় এক হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
লেখক বর্তমানে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে পড়াশোনা করছেন।
ই-মেইল: sanjoydatta0001@gmail.com
