ঘুষের মামলায় মিজান-বাছিরের ভাগ্য নির্ধারণ বুধবার


এফই অনলাইন ডেস্ক | Published: February 23, 2022 10:24:39 | Updated: February 23, 2022 15:52:17


পুলিশের ডিআইজি মিজানুর রহমান ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির

একজন ছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বড় কর্তা, আরেকজন দুর্নীতি দমনের যোদ্ধা। পুলিশের বরখাস্ত উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমান এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরের বিরুদ্ধে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের মামলার রায় জানা যাবে বুধবার। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

ঢাকার ৪ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক শেখ নাজমুল আলম আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করবেন। দুই পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে গত ৩ ফেব্রুয়ারি তিনি রায়ের এই দিন ঠিক করে দিয়েছিলেন।

এ মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বেলা ১১টার দিকে বিচারক রায় পড়া শুরু করতে পারেন।

বাছিরের পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান। আর মিজানুরের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী।

দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী যুক্তিতর্ক শুনানিতে আইন অনুযায়ী আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করেন। তিনি বলেন, মিজানুর রহমান ও এনামুল বাছির দুজনই ঘুষ নেওয়া ও দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। এনামুল বাছির বলেছেন, আমি ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছি আর মিজানুর বলেন, আমি বাছিরের ষড়যন্তের শিকার। সুতরাং দুজনেই দোষী। দুজনেরই সবোর্চ্চ সাজা হওয়া উচিৎ।

অন্যদিকে দুদক অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে দাবি করে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, তাদের মক্কেলরা খালাস পাবেন বলে তাদের বিশ্বাস।

এ মামলার ধারা হলো ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ আইনের ৫(২); যার সর্বোচ্চ শাস্তি ৭ বছরের কারাদণ্ড, সঙ্গে জরিমানা হতে পারে।

অর্থপাচারের সর্বোচ্চ শাস্তি ১২ বছরের কারাদণ্ড, জরিমানা, পাচার করা টাকা বাজেয়াপ্ত এবং দণ্ডবিধির ১৬১ ধারায় সর্বোচ্চ সাজা ৩ বছরের দণ্ড আর দণ্ডবিধির ১৬৫ ধারায় সাজা ২ বছরের কারাদণ্ড।

মামলা বৃত্তান্ত

এক নারীকে জোর করে বিয়ের পর নির্যাতন চালানোর অভিযোগ ওঠায় ২০১৯ সালে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনারের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় মিজানকে।

এর চার মাস পর তার সম্পদের অনুসন্ধানে নামে দুদক; এক হাত ঘুরে সেই অনুসন্ধানের দায়িত্ব পান কমিশনের তৎকালীন পরিচালক এনামুল বাছির।

সেই অনুসন্ধান চলার মধ্যেই ডিআইজি মিজান দাবি করেন, তার কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন দুদক কর্মকর্তা বাছির।

এর পক্ষে তাদের কথপোকথনের কয়েকটি অডিও ক্লিপ একটি টেলিভিশনকে দেন তিনি। ওই অডিও প্রচার হওয়ার পর দেশজুড়ে শুরু হয় আলোচনা।

অভিযোগটি অস্বীকার করে বাছির দাবি তখন করেন, তার কণ্ঠ নকল করে ডিআইজি মিজান কিছু বানোয়াট রেকর্ড একটি টেলিভিশনকে সরবরাহ করেছেন।

অন্যদিকে ডিআইজি মিজান বলেন, সব জেনেশুনেই তিনি কাজটি করেছেন বাধ্য হয়ে।

এরপর ২০১৯ সালের ১৬ জুলাই দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ সংস্থার পরিচালক শেখ মো. ফানাফিল্লাহ বাদী হয়ে মামলা করেন। পরে তিনি অভিযোগপত্র দেন।

অবৈধভাবে সুযোগ প্রদানের হীন উদ্দেশ্যে এনামুল বাছির ডিআইজি মিজানের কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণ পাওয়ার কথা জানানো হয় অভিযোপত্রে।

ঘুষের অভিযোগ ওঠার পর তাদের দুজনকেই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। ২০২০ বছরের ২২ জুলাই এনামুল বাছিরকে গ্রেপ্তার করে দুদকের একটি দল। আরেক মামলায় গ্রেপ্তার ডিআইজি মিজানকেও পরে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

গত বছর ১৮ মার্চ আসামিদের অব্যাহতির আবেদন নাকচ করে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ হয়। এরপর শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ।

গত ২৩ ডিসেম্বর মামলাটিতে সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। মামলায় চার্জশিটভুক্ত ১৭ সাক্ষীর মধ্যে ১২ জনের সাক্ষ্য শোনে আদালত।

এই সাক্ষীরা হলেন, মামলার বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তা দুদক পরিচালক. শেখ মো. ফানাফিল্যা, দুদকের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল ওয়াদুদ, দুদকের প্রশিক্ষণ শাখার প্রধান সহকারী এস এম আবু জাফর বিশ্বাস, দুদক প্রধান কাযালয়ের প্রশিক্ষণ শাখার কনস্টেবল মো. অলিউজ্জামান শেখ, দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত শাখার উচ্চমান সহকারী মো. জিল্লুর রহমান, দুদকের মানব সম্পদ বিভাগের সহকারী পরিচালক আজিজুল হক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এম নাজেম আহমেদ, মেজর নাহিদ আল আমিন, কমান্ডার এম মোতাহার হোসেন, মেজর ফাহিহম আদনান সিদ্দিকী, বরগুনার বেতাগি থানার কদমতলা গ্রামের মো. নাছির উদ্দিন বাবু, বরিশাল, ডিআইজি মিজানের অর্ডারলি কনস্টেবল সাদ্দাম হোসেন, মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার রুহুল্লি গামের বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত গাড়িচালক এস এম এনামুল হক, বরিশালের মূলাদির কাজিরচরের হৃদয় হাসানি এবং মিজানের স্ত্রীর দোকানের কর্মচারী রফিকুল ইসলাম।

যুক্তিতর্ক শুনানির আগে ৩ জানুয়ারি আত্মপক্ষ শুনানিতে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন মিজানুর রহমান ও এনামুল বাছির। পরে ১২ জানুয়ারি মিজান ৬ পৃষ্ঠার এবং এনামুল বাছির ১২ পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্য আদালতে জমা দেন।

কী বলেছেন সাক্ষীরা?

গতবছর ২৬ সেপ্টেম্বরে আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে কনস্টেবল সাদ্দাম হোসেন বলেছিলেন, ২০১৯ সালের ১৫ জানুয়ারি ডিআইজি মিজানের উত্তরার বাসা থেকে তিনি দুটি ব্যাগ (একটি বাজারের ব্যাগ) গাড়িতে তুলে দেন। ব্যাগে ২৫ লাখ টাকা এবং কিছু বই ছিল।

ডিআইজি মিজান পরে সাদ্দাম হোসেনকে রাজারবাগে নামিয়ে দেওয়ার কথা বলে গাড়িতে তোলেন। কিন্তু সাদ্দামকে তিনি রমনা পার্কের সামনে নিয়ে যান এবং বলেন তার সাথে কথা বলার জন্য একজন লোক আসবে।

সাদ্দাম আদালতকে বলেছেন, কিছুক্ষণ পরে এক লোক রমনা পার্কে আসেন এবং মিজানের সঙ্গে পার্কের ভেতরে গিয়ে কথা বলেন। পরে তারা গাড়িতে ওঠেন। ডিআইজি মিজান গাড়ির চালককে বলেন, কথা বলতে আসা সেই লোককে যেন রাজারবাগ মোড়ের সামনে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের গলিতে নামিয়ে দেওয়া হয়।

যাতায়াতের মধ্যবর্তী সময়ে তারা অনেক কথা বলেন। মিজান স্যার ওই লোককে বলেন, ব্যাগে ২৫ লাখ ঠিক আছে। তখন ওই লোক প্রশ্ন করেন যে সব ঠিক আছে ভাই? মিজান স্যার বলেন, সব ঠিক আছে। পরে ওই লোকটাকে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের গলিতে নামিয়ে দেওয়া হয়।

সাদ্দাম বলেছেন, লোকটি নেমে যাওয়ার পর ডিআইজি মিজানের কাছে তার পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন তিনি। তখন ডিআইজি মিজান তাকে বলেছিলেন, লোকটি দুদক কর্মকর্তা এনামুল বাছির।

এরপর ২৫ ফেব্রুয়ারি মিজানের বাসা থেকে একটি শপিং ব্যাগ এবং একটি হ্যান্ড বল গাড়িতে তুলে দেওয়ার কথাও আদালতে বলেছেন সাদ্দাম। তার দাবি অনুযায়ী সেদিন ব্যাগে ছিল ১৫ লাখ টাকা।

সাক্ষ্যে বলা হয়, তারা সেদিনও রমনা পার্কের সামনে যান। এনামুল বাছির পার্কের সামনে এলে তার সঙ্গে মিজান ভেতরে যান। কথা শেষে তারা আবার গাড়িতে ওঠেন। এনামুল বাছিরকে শান্তিনগর মোড়ে নামিয়ে দিতে বলেন ডিআইজি মিজান। সেদিনও গাড়িতে তারা কথা বলেন।

সাদ্দামের ভাষ্য অনুযায়ী, এনামুল বাছির সেদিন ডিআইজি মিজানকে বলেন, তার বিরুদ্ধে হওয়া মামলায় কিছু নেই। তার কিছু হবে না। গাড়ি থেকে নেমে যাওয়ার সময় এনামুল বাছির টাকাসহ ব্যাগটি নিয়ে যান।

ডিআইজি মিজান ২০১৯ সালের ৩০ মে গুলশান পুলিশ প্লাজায় যান এবং এনামুল বাছির সেখানে আসেন। তারা সেখানেও কথা বলেন।

সাদ্দাম সাক্ষ্যে বলেছেন, এনামুল বাছির সেদিনও ডিআইজি মিজানকে বলেন, ওই মামলায় কোনো কাগজপত্র নেই। তার কিছু হবে না।

মিজানের স্ত্রীর দোকানের কর্মচারী রফিকুল ইসলাম প্রতক্ষ্যদর্শী হিসেবে এ মামলায় সাক্ষ্য দেন।

গুলশান পুলিশ প্লাজায় এনামুল বাছিরের সঙ্গে মিজানের এক সাক্ষাতের ঘটনা তুলে ধরে রফিকুল আদালতে বলেন, মিজান স্যার উনাকে বলেন, টাকা দিলাম, তারপরও আমার নামে কেস হল। এই কথোপকথনের পর তারা বের হয়ে যান।

Share if you like