Loading...
The Financial Express

ঘুরে আসি লালন মেলা

| Updated: October 18, 2021 18:01:58


ছবি -  সংগৃহীত ছবি - সংগৃহীত

আজ প্রায় দুশো বছর ধরে বিভেদহীন সমাজের কামনায় মানুষের মুখে মুখে শান্তির সুর হিসেবে লালন সাঁইজির গান সমানভাবে প্রাঞ্জল। ফকির লালন সাঁইয়ের গানের বার্তায় ছিল শ্রেণিবিদ্বেষ ও জাতপাতের মেকি খোলস ভেঙ্গে সরল মানবধর্মকে জাগিয়ে তোলা।

সাঁইজির মৃত্যুর দিনক্ষণ নিয়ে মতভেদ আর সংশয় আছে। ১২৯৭ বঙ্গাব্দের ১ কার্তিক (১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ অক্টোবর) প্রতি বছর ফকির লালন সাঁইয়ের সমাধি প্রাঙ্গন কুষ্টিয়া জেলার ছেউড়িয়া গ্রামের আখড়াবাড়ি্তে শুরু হয় তাঁর ভক্ত সাধুদের মিলনমের; যার নাম ‘সাধুসঙ্গ।’

সাঁইজির তিরোধানের পরের বছর থেকেই এখানে শুরু হয়েছিলো এই সাধুসঙ্গ। তবে কালের বিবর্তনে সর্বসাধারণের অংশগ্রহনে এই সাধুসঙ্গের নাম রূপান্তরিত হয়েছে লালন মেলায়।

প্রতি বছর ১৬ অক্টোবর থেকেই ছেউড়িয়ায় আনাগোনা শুরু হয় সাধুদের। সেইসাথে পুরো দেশ, এমনকি বিদেশ থেকেও মরমী বাউল ফকিররা লালন সাঁইকে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন। 

লালন মেলার আকর্ষণ

লালন মেলার মূল আকর্ষণ থাকে সাঁইজির সমাধিদর্শনে। তবে এই সময়ে সমাধি প্রাঙ্গনে ভক্তদের আনাগোনা আর মেলার মাঠ প্রতিটি মানুষকেই নিয়ে যায় তার শেকড়ের কাছে, যে শেকড় থেকে ওস্তাদজির বাঁশির সুর, ঢুলি আর দোতারাবাদকের হাত ঘুরে সুর ধরা দেয় প্রাণের কোণে।

এই জনসমাগমে নতুন করে চোখে পড়ে লালনের জীবনলীলাকে স্মরণ করে লালনপন্থী সাধক সম্মেলন। সাঁইজির জীবন, গান, গানের পটভূমি, গানের দর্শন- এই সম্মেলনের মূল আলোচ্য বিষয়।

ঝিনাইদহ জেলার চাঁদপুর গ্রামের একজন লালনভক্ত শুকুর আলী জোয়ার্দ্দার জানান, প্রতি বছর এই সময় এলে সাঁইজির স্মরণে মন উতলা হয়, তল্পিতল্পাসহ এলাকার ভক্তরা মিলে যান ছেউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে। গত বছর উৎসব না হওয়ায় যেতে পারেননি তারা। তবে এবার যাবার প্রস্তুতি শুরু করেছেন।

সেই সাথে মেলায় বিকোয় নানা রকম মৃৎশিল্প, দেশীয় বাদ্যযন্ত্র, দেশীয় কাপড়, মুড়ি-মুড়কি, ইত্যাদি। সারারাত ধরে পরিবেশন করা হয় সাঁইজির গান। সবাই মিলে দোহার হয়ে ধুয়া ধরে গানের; যে গানের সুর-তালের ভুল ধরার কেউ নেই। তন্ময় মনে সাঁইজির গানের প্রতিটি শব্দের উচ্চারণে যে কেউ যেন হয়ে ওঠে সাধক।

এর সাথে আরো থাকে সমাধিপ্রাঙ্গনের পাশেই গড়ে তোলা লালন গবেষণা কেন্দ্র দর্শনের সুযোগ। এক্ষেত্রে অবশ্যই যেতে হবে দিনের বেলায়।

কীভাবে যাবেন লালন মেলায়

ঢাকা থেকে রেল এবং সড়কপথ- দুভাবেই যাওয়ার সুযোগ রয়েছে লালন সাঁইয়ের আখড়া ছেউড়িয়ায়। সড়ক পথে রাজধানীর কল্যাণপুর এবং গাবতলী বাসস্ট্যান্ড থেকে বেশ কিছু বাস কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। কুষ্টিয়ার মজমপুর গেটে সরাসরি বাস নামিয়ে দেয়। সেখান থেকে আখড়াবাড়ি পর্যন্ত তিন কিলোমিটার রাস্তা পেরোলেই লালন সাঁইয়ের আখড়াবাড়ি।

ট্রেনে যাতায়তের ক্ষেত্রে কমলাপুর স্টেশন থেকে চিত্রা এবং সুন্দরবন এক্সপ্রেসে যাওয়া যায় কুষ্টিয়া; নেমে পড়তে হয় শহরের অদূরে পোড়াদহ জংশনে। সেখান থেকে অটোরিকশা করে ২০ থেকে ৫০ টাকায় গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়া যাবে।

সতর্কতা

যদিও মেলা উপলক্ষে কতৃপক্ষ আলাদা করে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে, তবুও সাধুসংসঘে কিছু অসাধু মানুষের মাদক গ্রহনের তথ্য পাওয়া যায় বিচ্ছিন্নভাবে। একই সাথে অসংখ্য মানুষের আনাগোনা থাকায় নিজেদের সাথে থাকা মালপত্র সতর্কতার সাথে রাখাও জরুরি।

শ্রেণী পরিচয় ছাপিয়ে সংস্কৃতিমনা এবং সুন্দর কিছু সময়ের প্রত্যাশায় এই মেলায় আসেন দূর-দূরান্তের মানুষ। বছর জুড়ে লালনের বিখ্যাত গানগুলো যেমন উদাস মনে গুনগুন করে ওঠে শহরের ইট-কাঠের দালানের ছাদে কেউ একজন- সেও এসে দেখে যেতে চায় অন্তত একটা বার। এক মরমী সাধকের হৃদয়স্পর্শী গানের মায়া এভাবেই ছড়িয়ে পড়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

মোজাক্কির রিফাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নরত

anmrifat14@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic