ঘর্মাক্ত শরীর ভালো লাগে না কারও। তবে ঘাম হওয়ার আছে উপকারী দিক।
বার্মিংহাময়ের স্কিন ওয়েলনেস ডার্মাটোলজির প্রতিষ্ঠাতা ও মেডিকাল ডিরেক্টর এবং ইউনিভার্সিটি অফ আলাবামা স্কুল অফ মেডিসিনয়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্লিনিকাল ডিরেক্টর অফ ডার্মাটোলজি ডা. কোরে এল. হার্টম্যান বলেন, ঘাম একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত হয়। ডাক্তারি ভাষায় ঘামকে বলা হয় এক্রিন। নোনতা এই জৈবি তরল তৈরি হয় রক্তের তরল অংশ থেকে এবং নিঃসৃত হয় এক্রিন গ্রন্থি থেকে। ভিন্ন ধরনের গ্রন্থি থাকে বগলের নিচে আর তা সক্রিয় হয় বয়ঃসন্ধিকালে পা দেওয়ার পর।
ত্বক ভালো রাখে
রিয়েলসিম্পল ডটকময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ডা. হার্টম্যান বলেন, ঘাম ত্বককে শীতল করে, কিছু নির্দিষ্ট বর্জ্য উপাদান অপসারণ করে এবং ত্বকে উজ্জ্বলতা আনে।
ত্বকের উজ্জ্বলতা আসার নেপথ্যের বিষয়টা হল ঘাম ত্বকে আর্দ্রতা যোগায়।
জাপানের কিয়োরিন ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ মেডিসনয়ের ডার্মাটোলজি বিভাগের করা গবেষণায় দেখা গেছে, ত্বকের যদি কোনো প্রদাহ দেখা দেয়, তবে সেই প্রদাহ কমাতেও উপকারী ভূমিকা রাখে ঘামের এই আর্দ্রতা বজায় রাখার গুন। আবার ঘামের থাকে ইউরিয়া, যা আর্দ্রতা সরবরাহের জন্য সুপরিচিত।
তবে মনে রাখতে হবে, ঘাম উপকারী হলেও লম্বা সময় ত্বক ঘামে ভেজা থাকলে এর অপকারিতা আছে।খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এর।
ডা. হার্টম্যান বলেন, ঘাম কিংবা ঘামে ভেজা পোশাক লম্বা সময় পরে থাকলে লোপকুপ আটকে যায়। সেখান থেকে দেখা দেয় ব্রণ, সংক্রামক রোগ ও প্রদাহ।
ত্বকে থাকা ব্যাক্টেরিয়াগুলো উষ্ণ, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ পছন্দ করে। ত্বক সবসময়ই উষ্ণ। আর ঘামে ভেজা থাকলে দুয়ে মিলে ব্যাক্টেরিয়ার বংশবিস্তারের আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়ে যায়। আর তখনই লোপকূপ ও চুলের গোড়ায় ব্রণ, চুলকানি, প্রদাহ সৃষ্টি হয়।
ঘাম থেকে সুখের অনুভূতি
যখন আপনার গরম লাগে তখন হৃদস্পন্দনও বেড়ে যায়।
হার্টম্যান ব্যাখ্যা করেন, হৃদযন্ত্র এসময়ে তার গতি বাড়ানোর কারণ হল উষ্ণ রক্ত যাতে ত্বকের কাছাকাছি থাকা রক্তনালী দিয়ে দ্রুত প্রবাহিত হয়ে শীতল হতে পারে। আর সেই শীতলতা যোগায় ওই ঘাম। হৃদযন্ত্রের এই গতি বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে ওপর দিকে নিঃসৃত হয় এন্ডোরফিন হরমোন যা মনে প্রফুল্লতা আনে।
একজনের ঘামের গন্ধ তার আশপাশের মানুষের মাঝেও খুশি বয়ে আনতে পারে বলে দাবি করে ২০১৫ সালের এক গবেষণা, বলেন হার্টম্যান।
ওই গবেষণায় অংশগ্রহণকারী পুরুষদের তিন ধরনে রভিডিও দেখানো হয়, যেগুলো দর্শকের মনে ভয়, আবেগ ও আনন্দের অনুভূতি সৃষ্টি করে। পরে তাদের ঘামের নমুনা সংগ্রহ করেন গবেষকরা।
সেই ঘামের নমুনার সংস্পর্শে আনা হয় নারীদের। দেখা যায়, ভিডিও দেখে আনন্দের অনুভূতি সৃষ্টি হয়েছে এমন পুরুষের ঘামের নমুনার সংস্পর্শে আসা নারীদের মাঝেও আনন্দিত হওয়া ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
সেই ইঙ্গিত পরিমাপ করা হয়েছে ঠোঁটের দুই কোন ওপরে ওঠা, গাল ওপরে ওঠা এবং চোখের কোণের ত্বক কুঁচকে যাওয়া এই বিষয়গুলো সুক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে।
ঘাম হৃদযন্ত্রের জন্যও উপকারী
সওনা পদ্ধতিতে স্নান করার ক্ষেত্রে ১৫০ থেকে ১৯৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা বসে থেকে শরীরে ঘাম হবেই হবে। এসময় শরীর নিজেকে শীতল করার জন্য বাড়তি চাপ নিতে শুরু করে, প্রচুর ঘাম দেয় শরীর শীতল করার জন্য।
প্রায় আধা লিটার মতো ঘাম বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব একটি সওনা সেশনয়ে। আর তার উপকারিতাও আছে।
জামা ইন্টারনাল মেডিসিনয়ে প্রকাশিত ফিনল্যান্ডের এক গবেষণা অনুযায়ী, যারা সপ্তাহের চারবার প্রচুর ঘেমেছেন, তা সওনাতে হোক কিংবা কাজে, তাদের আকস্মিক হার্ট অ্যাটাকয়ে মৃত্যুবরণ করার আশঙ্কা কমেছে।
প্রচুর ঘাম হওয়া মানে আপনি ফিট
যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন এবং অনেক ঘাম হয় তাদের জন্য সুখবর হল এটা আপনার শারীরিকভাবে সুস্থ হওয়ার একটা লক্ষণ।
হার্টম্যান বলেন, যারা শারীরিকভাবে প্রচুর পরিশ্রম করেন, তারা অলস জীবনযাপন করা ব্যক্তিদের তুলনায় দ্রুত ঘামেন এবং ঘামের মাত্রাও বেশি হয়। কারণ তাদের শরীর জানে যে যখন তাকে পরিশ্রম করতে হবে তখন বেশ ভালোমতোই করতে হবে। আর তাই শরীর নিজেকে শীতল রাখার প্রক্রিয়া আগেভাগেই শুরু করে দেয়।
এই বিষয়টি প্রমাণ হয় প্লস ওয়ানয়ে প্রকাশিত এক গবেষণাতে। অনেকটা পথ নিয়মিত দৌড়ান এমন একদল মানুষের সঙ্গে তুলনা করা হয় অলস জীবনযাপন করা একদল মানুষের সঙ্গে।
দুই দলকেই সাইকেল চালাতে বলা হয়। দেখা যায় যারা দৌড়ান তারা অনেক আগেই ঘেমে নেয়ে উঠেছেন অন্যান্যদের তুলনায়।
শুধু তাই নয়, অলস জীবনযাপন করা ব্যক্তিদের তুলনায় ওই দৌড়বিদদের বেশি পরিমাণ ঘামগ্রন্থি সক্রিয়, আর তাই ঘামের পরিমাণও বেশি।