Loading...

ঘরবন্দী ঈদে ছোটদের ইচ্ছে

| Updated: July 19, 2021 11:36:32


ছবিঃ সংগৃহীত ছবিঃ সংগৃহীত

প্রায় দুই বছর হয়ে যাচ্ছে করোনা অতিমারীর আগমনের, সেইসাথে কড়া নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে বাঁধা পড়া দৈনিক জীবনের। সাধারণ জীবনযাপন অতীত হয়েছে সেই কবেই, সামাজিক নিষেধাজ্ঞায় দূরত্বই এখন নতুন সাধারণ বা কায়দা করে বললে ‘নিউ নরমাল। ২০২০ সালের করোনা পরিস্থিতিতে ঈদ কেটেছে ঘরেই, ছিল স্বাস্থ্যবিধি মেনে করোনা মোকাবেলার যুদ্ধ। কিন্তু সেই তুলনায় এবারে যেন আরো ভয়াল হয়ে উঠেছে করোনার রূপ।

কিন্তু সময় থেমে থাকেনি, আবার এসেছে মুসলমানদের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদ-উল-আযহা। সারা দেশে করোনার ভয়াবহতা মাথায় রেখে এবারও থাকছে বিধি-নিষেধ, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে সামাজিক দূরত্ব রক্ষাও হয়ে উঠেছে আবশ্যকীয়। বড়দের কাছে হয়তো এই করোনাকালীন ঈদগুলো কেটে গিয়েছে দায়-দায়িত্বের ভারে বা পরিস্থিতি মেনে নিয়ে পালন করে নিয়েছেন ঈদ। কিন্তু শিশুমন কি পারছে এত সহজেই মেনে নিতে এই ঘরবন্দী একঘেয়েমি?

ঈদ মানেই আনন্দ, খুশি। ছোট ছোট বাচ্চাদের নতুন কাপড় গায়ে দিয়ে পাড়া-মাতানো হাসি ছাড়া ঈদের আনন্দের রেশ যেন বড়দের গায়েও লাগে না। শিশুদের কলতান, তাদের হাসিমাখা মুখের ঝলকানিতেই ঈদের আনন্দ যেন প্রাণ খুঁজে পায়। নতুন কাপড় পরে বাড়ি-বাড়ি ঘুরে সমবয়সী বন্ধুদের সাথে দেখা করে হেসে-খেলে, মিষ্টিমুখ করে, ঈদ সালামির জন্য বড়দের কান ঝালাপালা করে দেওয়া- সবই চিরসজীব আজও। তবে করোনা পরিস্থিতি এসে থামিয়ে দিয়েছে এই কলতানের অনেকটাই, ঘরবন্দী বাচ্চারাও অপেক্ষার প্রহর কাটাচ্ছে মুক্ত বাতাসে আনন্দ করে বেড়ানোর। ঈদ ও ঈদের আয়োজন নিয়ে তাদের শিশুমনের আকাঙ্ক্ষা কী?

গত বছরের ঈদে হয়ত অনেকটাই বুঝে উঠতে পারেনি অনেকে, তবে এবছরের চিত্র ভিন্ন। ছোটরাও বুঝে নিয়েছে, থাকতে হবে সাবধানে, হয়তো আবার ঈদ কাটবে ঘরে থেকেই। কিন্তু তাই বলে  দায়সারাভাবে ঈদ কাটানোর পরিকল্পনা নেই বেশিরভাগেরই। মনের খাতায় এরই মাঝে কল্পনার তুলিতে আঁকা হয়ে গেছে বেশ কিছু পরিকল্পনা।

ছোট্ট নাজিহা নাহিয়া আহমেদ অহনা রাজধানীর আইডিয়াল ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজের প্রথম শ্রেণিতে পড়ছে। করোনা পরিস্থিতির জন্য ঠিকমতো স্কুলে যাওয়াও হয়ে ওঠেনি তার। অন্যান্য ঈদগুলোতেও বেশিরভাগ ঘরেই থেকেছে সে, বাইরে বের হওয়ার বছরগুলো করোনার জন্য রুদ্ধ কাটছে বাকি সবার মতো। তাই লকডাউনের ঈদ তার কাছে আলাদা কিছু লাগছে না বলে জানায় সে। অহনা ভালোবাসে দোলনায় দুলতে, অরিগ্যামি করতে ও ছবি আঁকতে। ঈদের দিনটাও ছবি এঁকে, টিভি দেখেই কাটিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা তার। তার বড় বোনের ভাষ্য, কোরবানির জন্য তাদের বাবা গরু কিনতে বের হওয়ার সময় বৃষ্টি হচ্ছিল। তাই দেখে অহনা বাবাকে বলে দেয়, “পাপা! গরুটাকে একটা রেইনকোট পরিয়ে এনো

আরেকটু বয়সে বড় যারা, তাদের কাছে ঈদের এই ঘরবন্দী আয়োজন হাঁপিয়ে ওঠার মতোই অনেকটা। আগের দুরন্তপনা ফিরে পেতে চায় তারা, ঈদের দিন সবার সান্নিধ্যে হেসেখেলে কাটাতে চায় তারা, কিন্তু জানে হয়ে উঠছে না এবারও।

সেন্ট গ্রেগরিজ হাই স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবু সায়েম পলকের মনে হয়, এই ঈদটাও কাটবে গতবারের মতোই। তবে এবার ঈদের নতুন জামা কিনতে পারায় একটু ভিন্ন মনে হচ্ছে, গতবার কঠোর লকডাউনে কেনা হয়ে ওঠেনি যা। একইসাথে পলক জানায়, এর আগের বছর ঈদে দাদা-দাদি, চাচা-চাচি অথবা সমবয়সী ভাই-বোন কারো সাথেই দেখা করতে না পারায় মন খারাপ হয়েছিল তার। তাই এই ঈদে সবার সাথে দেখা করে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে চায় সে।

চাঁদপুরের নূরপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে মোঃ মিরাজুল ইসলাম। তাদের বাড়ির এলাকায় আগে ঈদের দিন ঈদগাহের পাশে ছোট ছোট অস্থায়ী দোকানপাট বসত। থাকত খেলনা, বেলুন, বাঁশি, ফুচকা-ঝালমুড়ি-আচার ইত্যাদি নানাকিছুর সমারোহ। এখন ঈদগাহে নামাজ পড়া যেমন হচ্ছে না, বসছে না সেইসব দোকানও। তাই মিরাজুল একটু মন খারাপের সাথেই জানাল, এবারও তার বাঁশি ও বেলুন কেনা হবে না, আবারো একঘেয়েই কাটবে দিনটা। তবে বাড়ির পাশেই আত্মীয়দের বাড়ি হওয়ায় সমবয়সীদের সাথে একটু যদি ঘুরে বেড়াতে পারে এবার, সেই আশায় আছে সে।

যমজ দুই বোন- আজরা আলম ও আফরা আলম। পড়ছে চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে। একসাথে দুষ্টু-মিষ্টি খুনসুটিতে মাতিয়ে রাখে সবাইকে। তবে এই ঈদেও বাড়ি আসতে পারছে না তাদের আত্মীয়রা, তাতে দুবোনেরই মন খারাপ এমনটা জানান তাদের মা আবিদা মল্লিক। তাও ঈদের দিন স্বাস্থ্যবিধি মেনেই পাড়া-প্রতিবেশী ও দুস্থদের মাঝে কোরবানির মাংস বিতরণ করে আসা ও সন্ধ্যায় একসাথে বসে টিভিতে ঈদের বিশেষ অনুষ্ঠান দেখার পরিকলনা তাদের। ভিডিও কলে দূরে থাকা ভাই-বোনদের সাথে কথা বলে দূরত্ব কিছুটা কাটিয়ে নেওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করে দুই বোন।

করোনা কেড়ে নিয়েছে দৈনন্দিন জীবনের চেনা ছন্দ, এক কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে মানুষের  দিকে। এই বিপদের মাঝেও শিশুদের হাসিমুখ ও তাদের রঙিন স্বপ্নের গল্পগুলোই যেন আশার আলো দেখায়, নতুন দিনে মুক্ত বাতাসে আরেকবার শ্বাস নেওয়ার প্রতিশ্রুতির গান শোনায়। ঈদ যেমনই আসুক অমানিশার মাঝে, এই শিশুদের আশা ও স্বপ্নরা যেন গেয়ে উঠে আলো ও আনন্দের।

তাহসীন নাওয়ার বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।

amipurbo@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic