ঘরই যখন বাগান


মোঃ ইমরান খান | Published: May 26, 2021 14:32:34 | Updated: May 26, 2021 20:16:53


ছবিঃ সংগৃহীত

আমাদের অনেকেরই বাগান করার শখ আছে।। কিন্তু জায়গার অভাবে এই শখটি লালন করতে পারি না। বিশেষ করে শহরের বাসাগুলোতে যেখানে আমাদের এরূপ অবস্থা যে, ঘরের পাশে খালি জায়গা পেলেই দুই রুম বিশিষ্ট একটি ফ্ল্যাট বানাতে চাই। তাই পর্যাপ্ত আলো-বাতাস আর যত্নের অভাবে গাছগুলো বাঁচিয়ে রাখা কঠিন।

এই ধারণাবশত অনেকেই গাছ লাগাতে চান না। তবে এটি আমাদের জানার কমতি। এমন অনেক গাছই আছে, যা আমরা চাইলেই আমাদের ঘরে যত্ন করতে পারি। তার জন্য বিশাল উঠোনের প্রয়োজন নেই। ঘরের কোণে এক ফুটের কম জায়গা কিংবা পড়ার টেবিলে অথবা ঘরের দেয়াল যেকোনো জায়গাতেই এটি সম্ভব। আজকের লেখাতে আমরা এমনই কিছু গাছ সম্পর্কে জানব, যা আপনার ঘরের ছোট থেকে ছোট জায়গাতে থেকে ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে পারে।

মেঝেতে রাখার উদ্ভিদ

খেয়াল করে দেখুন, আপনার টেবিলের পাশে জায়গাটি খালি কি না, কিংবা আপনার টেবিলের দুই দিকের দুই অংশ অথবা অফিসের ডেস্কের পাশের জায়গাটির কথা ভাবুন। খালি জায়গা পেয়েছেন? হয়তো হ্যাঁ।

ঘরে কিংবা অফিসে এরকম অনেক ছোটখাটো খালি জায়গা থাকে। জরুরি নয়, সেখানে আসবাবপত্র দিয়ে দখল করে ফেলতে হবে। আমরা চাইলে এসব খালি জায়গার উপযুক্ত ব্যবহার করতে পারি ছোটখাটো গাছ দিয়ে। এগুলোকে বলা হয় ফ্লোর প্ল্যান্ট; অর্থাৎ মেঝেতে রাখা যায়, এমন উদ্ভিদ।

৩-৪ ফুট উচ্চতা সম্পন্ন পাম জাতীয় উদ্ভিদ (যেমন, পার্লোর পাম) যা অল্প আলো ও পানিতে বাঁচে, এসব জায়গায় জন্য উপযুক্ত।

আবার কিছু কিছু উদ্ভিদ ৬-৭ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। ঘর কিংবা অফিসে যদি পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা থাকে, তাহলে সে উদ্ভিদগুলো দিয়ে আপনি ঘর বা অফিস সাজাতে পারেন।

অর্কিড

গাছ দিয়ে ঘর সাজাতে হলে সবুজ গাছই বেছে নিতে হবে, কথাটি ধ্রুব নয়। সব উদ্ভিদ যদি সবুজ রঙের হয়, তাহলে অনেক সময় ঘরের রঙের সাথে তা ফুটে উঠতে না-ও পারে। কেননা অনেকসময় আমাদের ঘরের দেয়ালের রং সাদা, সবুজ, গাঢ় নীল বা গোলাপিও হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে সবুজ রঙের উদ্ভিদে ঘর সাজানো হলে তা কিছুটা বেমানান দেখাবে। যদিও সবুজ উদ্ভিদের বিশেষ গুনাগুন রয়েছে, কিন্তু ঘর সাজানোর স্বার্থে আমরা কিছুটা পরিবর্তন আনতে পারি। বাজারে রংবেরঙের অর্কিড পাওয়া যায়, যার মাঝে অনেকগুলো আছে, যারা অল্প আলোতে ভালো থাকে। এক্ষেত্রে অর্কিড দিয়ে ঘর সাজানো একটি চমৎকার সিদ্ধান্ত হতে পারে।

সাক্যুলেন্ট বা ক্যাকটাস

অর্কিডের মূল্য বেশি হওয়ায় অনেকেই হয়তো সেটি কিনতে ঝামেলায় পড়বেন। সেক্ষেত্রে সাক্যুলেন্ট বা ক্যাকটাস জাতীয় উদ্ভিদ ঘরে রাখা মোটেও মন্দ নয়। এগুলো আকারে অনেক ছোট, পাঁচ থেকে ছয় ইঞ্চিও পাওয়া যায়। তাই ঘর সাজানোর জন্য এটি বেশি জায়গা দখল করবে না। আপনার বইয়ের তাকের অল্প খালি জায়গাতেও তারা আরাম করে থাকতে পারবে। সবুজ রঙের এসব উদ্ভিদে ফুল হয়। ফুল ফুটলে পুচকে উদ্ভিদ ভীষণ সুন্দর দেখায়।

এদের যত্ন নেওয়া কষ্টসাধ্য নয়। খুব অল্প চাওয়া-পাওয়া এদের। যেহেতু মরু অঞ্চলের উদ্ভিদ, তাই সপ্তাহে তিনদিন পরপর আধকাপ পানি দিলেই খুব সুখে-শান্তিতে এরা আপনার সাথে থাকবে। রোদের প্রয়োজন হয় না, তবে মাঝেমধ্যে রোদে দেওয়া যেতে পারে। ঘর সাজানোর জন্য সাক্যুলেন্ট বা ক্যাকটাস আকর্ষণীয় এবং উপযুক্ত উদ্ভিদ।

দেয়ালে টাঙানো উদ্ভিদ

গাছ দিয়ে ঘরের সৌন্দর্যবর্ধনের আরেকটি উপায় হলো গাছগুলো দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা। ছোট টবে আংটা দিয়ে দেয়ালে বা জানানোর সাথে গ্রিলে রাখা যায়। গাছের আশেপাশে গ্রিল বা দেয়াল জুড়ে ছোট ছোট বাতির ব্যবস্থা থাকলে, সন্ধ্যাবেলা যখন বাতি জ্বলবে, তখন আরো সুন্দর দেখাবে।

যেকোনো ধরনের গাছ যেমন, ক্যাকটাস, বিভিন্ন ধরনের ভেষজ উদ্ভিদ, ছোট ছোট ফুলগাছ ইত্যাদি ঘরের দেয়ালে বা জানালার গ্রিলের পাশে ঝুলিয়ে রাখা যায়। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের ফার্ন জাতীয় উদ্ভিদ ঘরের দেয়ালের সৌন্দর্য বর্ধনে ব্যবহার করা যেতে পারে।

টেবিল সাজানো গাছ

ঘরের পড়ার টেবিল কিংবা হোক অফিসের ডেস্ক, আমরা চাইলে ছোট ছোট ফুল গাছ দিয়ে সাজিয়ে রাখতে পারি। কাঠ বা বোর্ডের টেবিলে সাদা রঙের টবে সবুজ ছোটখাটো উদ্ভিদ সুন্দর দেখাবে। এসব উদ্ভিদ ঘরের সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি কাজ করার জন্য আপনাকে অনুকূল পরিবেশের যোগান দেবে।

এক্ষেত্রে অ্যাসপারাগাস, সিডাম, সাক্যুলেন্ট বা ক্যাকটাস জাতীয় উদ্ভিদ এ ধরনের স্থান অনুযায়ী উপযুক্ত। এছাড়াও পিস লিলি এক্ষেত্রে রাখা যেতে পারে। পিস লিলি দেখতে খুবই সুন্দর। এর বড় সবুজ পাতাগুলোর মাঝে সাদা সাদা ফুল আপনার পড়ার টেবিল বা অফিসের ডেস্কের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করবে।

উপকারিতা

শুধু সৌন্দর্য বর্ধনই এসব গাছের একমাত্র উপকারী দিক নয়। আত্মার প্রশান্তির জন্যও এসব কাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সুস্থ থাকা নির্ভর করে আমাদের ঘরের উপর। ঘরের পরিবেশ যত শান্ত ও নির্মল হবে, আমাদের শরীর হবে ততটাই স্বাস্থ্যকর। ঘরে সবুজের সমারোহ থাকলে কাজে মনোযোগ থাকে। মন থাকে প্রফুল্ল, সজীব ও সতেজ। তাই উদ্বেগ ও বিষণ্নতা কাটানোর জন্য ডাক্তাররা ঘরে গাছ রাখতে পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

বিষণ্ণতা দূর করার জন্যও গাছের সান্নিধ্য বেশ কার্যকর। তাইতো ম্যানচেস্টারে অবস্থিত কোরআন ব্রুক মেডিক্যালে অনেকসময় রোগীদের ওষুধের পরিবর্তে গাছ হাতে বের হতে দেখা যায়।

প্রতিনিয়ত আমাদের অনেক ঝামেলার সম্মুখীন হতে হয়। প্রাত্যহিক জীবনের এসব ঝড়-ঝাপটায় যখন আপনি ক্লান্ত, তখন আপনার দু-দণ্ড শান্তি দেবে এই সবুজ প্রকৃতি, যেমনটা দিয়েছিল বনলতা সেন, জীবনানন্দকে।

তাই উঠোনে না হলে ঘরের ভেতরেই নাহয় বাগান করা হোক। সুন্দর হোক আমাদের আবাস, শান্তি লাভ করুক মন।

মোঃ ইমরান খান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।

mohd.imranasifkhan@gmail.com

Share if you like