লু হাওয়া বইতে শুরু করেছে। প্রচন্ড গরমে জনজীবন প্রায় অতিষ্ট হয়ে পড়েছে। আর সেই সাথে এই তীব্র গরমে মানুষ নানারকম কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ে যার মধ্যে একটি মারাত্মক পরিস্থিতি হচ্ছে হিট স্ট্রোক। দ্রুত এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা সেবা না পেলে একজন আক্রান্ত ব্যক্তির ব্রেইনসহ শরীরের অন্যান্য অঙ্গসমূহ পুরোপুরি অকেজো হয়ে মৃত্যুমুখে পড়তে পারে। তাই হিট স্ট্রোক সম্পর্কে প্রত্যেকেরই কমবেশি কিছু ধারণা থাকা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত প্রচন্ড গরম থাকে। প্রতি বছর শুধু বাংলাদেশে নয় বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে হিট স্ট্রোকের কারণে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়।
সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেশনের তথ্যানুসারে, নবজাতক থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুদের এবং ৬৫ বয়সোর্ধ্ব ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
অনেকটাসময় ধরে তীব্র গরম আবহাওয়ার মধ্যে থাকলে বা এমন পরিবেশে দীর্ঘসময় ধরে কায়িক পরিশ্রম করলে শরীরের তাপমাত্রা অনেকসময় অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে দেহের তাপমাত্রা হুট করে বেড়ে যায় যা ৪০഼ সেলসিয়াস বা এর অধিক হতে পারে। শরীর থেকে ঘাম নিঃসরণ হয় না এবং শারীরবৃত্তীয় কাজের অংশ হিসেবে শরীর ঠান্ডা হওয়ার প্রক্রিয়াটিও বন্ধ হয়ে যায়। এই জটিল পরিস্থিতিকেই হিট স্ট্রোক বলা হয়।
তীব্র গরমে সান স্ট্রোক, হিট এক্সজসন বা হিট স্ট্রোক হতে পারে। তাই লক্ষণসমূহ সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা প্রয়োজন যাতে করে এই তিনের মাঝে কোনো ধন্দ সৃষ্টি না হয়।
এনএইচএস, ইউকের তথ্য অনুযায়ী,
-প্রচন্ডে গরমে অস্বস্তিবোধের পর প্রচুর পরিমাণে পানি করা এবং শীতল স্থানে বিশ্রাম নেওয়ার প্রায় ৩০ মিনিট পেরিয়ে গেলেও অবস্থা স্বাভাবিক না হওয়া।
-গরম সত্ত্বেও ঘাম না হওয়া।
-শরীরের তাপমাত্রা ৪০഼ সেলসিয়াস বা এর অধিক।
-ধোঁয়াশা অনুভূতি।
-শ্বাস - প্রশ্বাসে কষ্ট।
-শরীরে ঝাঁকুনি(মুখমন্ডল, হাত, পা বা শরীরের পুরো অংশে)।
-অজ্ঞান হয়ে পড়া।
-কোনো কিছুতে সাড়া প্রদান না করা।
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি অফ হেলথ সার্ভিসের তথ্য অনুসারে, হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে একজন রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। অন্যথা সময়ের সাথে তা কেবলই জটিল আকার ধারণ করবে আর অবেহেলায় মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি করার পর শারীরিক জটিলতা পর্যবেক্ষণের জন্য সাধারণত রোগীকে একদিন বা কয়েকদিন ভর্তি রাখা হয়।
হিট স্ট্রোকের জটিলতা থেকে পুরোপুরি সুস্থ হতে দুই মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পূর্বে তাৎক্ষণিক এবং প্রাথমিক সেবা হিসেবে যে কাজগুলো করতে হবে-
শরীরে প্রচুর পরিমাণে ঠান্ডা পানি ঢালতে হবে সাথে শীতল বাতাসের ব্যবস্থা করতে হবে; ঘাড়, কুঁচকি বা বগলের নীচে আইস ব্যাগ বা ঠান্ডা তোয়ালে দিয়ে রাখতে হবে, পুরো শরীর ভেজা কাপড়ে ঢেকে রাখতে হবে। আর আক্রান্ত ব্যক্তির যদি চেতনা (অজ্ঞান হয়ে না পড়লে) থাকে তাহলে তাকে ঠান্ডা পানি বা ইলেকট্রোলাইট সমৃদ্ধ পানীয় পান করাতে হবে।
হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি এড়াতে গরমকালে চিকিৎসকরা কিছু বিষয় মেনে চলার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
- ব্যায়ামের সময় প্রচুর পরিমাণে ঠান্ডা পানি পান করা।
- অতিরিক্ত ব্যায়াম না করা।
- ঠান্ডা পানিতে গোসল করা।
- হালকা রঙের এবং ঢিলেঢালা পোশাক পরিধান করা।
- মাঝে মাঝে মুখে পানির ঝাপটা দেওয়া।
- সকাল ১১টা থেকে দুপুর ৩টা এসময় প্রখর সূর্যালোক এড়িয়ে চলা বা সরাসরি সূর্যের নিচে একটানা অবস্থান না করা।
- মদ্যপান পরিহার করা।
শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
zabin860@gmail.com
