আমাকে একটু ব্যাখ্যা করে একটু বুঝিয়ে দিনতো বিষয়টা। ধরুন, কেউ আঙিনায় ঢুকে থেকে আপনার দিকে রাইফেল তাক করেছে। সিমেন্টের দেয়ালের ফুটো দিয়েই তাক করেছে রাইফেলটি। সুতরাং অপরাধী আপনিই? এবার বলুন তো কোন দার্শনিক আইনে ফুটো দিয়ে প্রাণঘাতী অস্ত্র তাক করে আপনার জীবনকে বিপদগ্রস্ত করার অনুমতি দেওয়া আছে? অন্যদিকে ফুটো দিয়ে পিস্তল তাক করে রাইফেলধারীকে হটিয়ে দেওয়ার ওপরও একই আইনে কি বাধা-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে? এমনটা কোন আইনে আছে?
এবারে আমাকে আরো কিছু জিনিস বুঝিয়ে দিন। কিভাবে আপনার আঙিনায় হাজার হাজার অস্ত্রধারী সকাল-সন্ধ্যা ঘোরাঘুরি করছে কিন্তু অপরাধী বলা হচ্ছে আপনাকে? হাজার হাজার অস্ত্রধারী যারা আকাশে উড়তে আর সাগরে ভাসতে পারে, যারা আপনাকে জীবন ও জীবিকার তালাশে যেতে দেয় না, জীবন-যাপন করতে দেয় না, শ্বাস নিতে দেয় না, জীবনকে ভোগ করতে দেয় না, দেয় না আপনার বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতে। এখানেই আপনার শিশুরা জন্ম নিয়েছে, আঙিনার চারপাশ ঘিরে থাকা বাধাবিঘ্ন, কণ্টক এবং লাঠি ছাড়া আর কিছুই তারা জানে না। এতোকিছুর পরও আপনিই হলেন আইন ভঙ্গকারী? আচ্ছা বলতে পারেন কোন আন্তর্জাতিক আইনের বলে আপনাকে ও আপনার সন্তানদেরকে গলাটিপে ধরার অনুমতি তাদের মিলেছে এবং তারা লাথি মারা থেকে বিরত থাকলে তখন তাদের ধৈর্যের প্রশংসা করা হচ্ছে?
ইসরায়েলের সেনাবাহিনী (ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স বা আইডিএফ) এরই মধ্যে জেনে গেছে যে ইয়াহিয়া সিনওয়ার (হামাসের বর্তমান নেতা) গাজার পরিস্থিতি গরম করে তুলতে চাইছেন। কারণ তিনি সেখানে অভ্যন্তরীণ সমস্যায় জড়িয়ে পড়েছেন। একই সাথে এ কথাও কেন বলা হয় না যে বেনি গ্যান্টস (ইসরায়েলের রাজনীতিবিদ, সাবেক জেনারেল এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী। ২০২০ সাল থেকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।) এবং আভিভ কোচভিও (গাজার সাবেক সামরিক কমান্ডার এবং ইসরায়েলের জেনারেল চিফ অব স্টাফ) গাজার পরিস্থিতি তাতিয়ে তুলতে চাইছেন। ইসরায়েলী সামরিক কর্তাদের পেনশন নিয়ে যে প্রচণ্ড বাকবিতণ্ডা চলছে তুলছে তা থেকে নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। মনে হয় গাজা যেন একটি আলাদা রাষ্ট্র । অথচ সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বতন্ত্র সক্ষমতা গাজার আছে বলে সে কথা বলা হয় তা নেহাতই ধাপ্পা।
১৯৯১ সালের পর থেকে ইসরায়েল আস্তে আস্তে গাজা উপত্যকাকে দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করতে শুরু করে। এভাবে গাজাকে বাকি দেশ ও পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করার কাজ শুরু হয়। আর এ কাজটি করা হয় কাসসাম বিগ্রেড ও তার আত্মাহুতি বোমা হামলা শুরুর আগে। ১৯৬৭ সালে অধিকৃত ভূখণ্ডে সম্ভাব্য ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের তৎপরতাকে ধসিয়ে দেওয়ার নীল নকশা সামনে রেখে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ইসরায়েলের বিভ্রান্তিকর প্রচারণায় দাবি করা হয়, নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গাজাকে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। ইসরায়েলের এই বক্তব্যে মেতে ওঠে অনেকেই। এভাবেই সিমেন্টের ফুটোর পিস্তল ধীরে ধীরে ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকে এবং এটি ৯/১১-র হামলার মতোই বিশাল অবয়বের হয়ে ওঠে!
পিস্তল বনাম রাইফেলে নলের ছবি বাইবেলে বর্ণিত ডেভিড বনাম গোলিয়াথের প্রতীকী চিত্র হয়ে ওঠে। গাজার পিস্তলের গুলিতে মারাত্মক ভাবে আহত হন ইসরায়েলের সীমান্ত পুলিশ কর্তা। গাজার কেউ কেউ উল্লাসে ফেটে পড়েন, যেন এই গুলি ফিলিস্তিনের নিদেন পক্ষে গাজার স্বাধীনতার ইংগিত বয়ে এনেছে। প্রথমে আগুনবর্ষী বেলুন দিয়ে উদযাপন করা হলো। আর মাঝে মাঝেই রকেট ছোঁড়ার পর আসন্ন বিজয় ও স্বাধীনতার কথা টগবগিয়ে ওঠে। এগুলো হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় নির্যাতন শিবিরে আটক মানুষগুলোর বিভ্রম। আর এ সবই হলো মানবিক মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনে ইচ্ছুক কিন্তু অবরুদ্ধ ও ক্ষুধা কাতর জনগোষ্ঠীর দুঃখ এবং বেদনাদায়ক হুল্লোড়। অবরুদ্ধ এসব মানুষ মানুষের মতো বাঁচতে চায়, চায় তাদের সম্ভাবনাকে বিকশিত করতে ও জীবনের লক্ষ্য স্পর্শ করতে।
অপর দিকে এটি ইসরায়েলের সেনাবাহিনী, শিন বেত ( ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা) এবং প্রধানমন্ত্রীদেরও বিভ্রম। তারা একে রণহুংকার হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। ইসরায়েল ২০ লাখ মানুষকে বন্দি করে রেখেছে এবং তাদেরকে পথের ভিখিরিতে পরিণত করেছে। এই সত্য থেকে মানুষের নজর ফেরানোর পন্থাই হলো এটি। বিশ্বের একমাত্র ইহুদি সামরিক শক্তির সুপরিকল্পিত সুসংঘবন্ধ অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও দুনিয়া এ প্রচারণার ফাঁদে পা দিয়েছে। বিশ্ব কেবল মাঝে মাঝে গাজায় ছিটেফোঁটা ত্রাণ বিলায় বা দাতব্য তৎপরতা চালায়।
টিভিতে যে ফুর্তি বা হুল্লোড়ের দৃশ্য প্রচার করা হয় তার থেকে অনেক দূরে যারা রয়েছে, যাদেরকে গায়ের জোরে বেকারের জিন্দেগি বেছে নিতে বাধ্য করা হয়েছে, তারা ভালো ভাবেই জানেন, হামাসের কোনো রকেট হামলা বা ইসরায়েল ও গাজার যুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের বিজয় এনে দেবে না। এসব মানুষ ভালো করেই জানেন, হামাসের সামরিক হুমকিকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানোর মধ্যে হামাস ও আইডিএফ উভয়েই অভিন্ন প্রচারণা স্বার্থ নিহিত রয়েছে। এ ক্ষেত্রে এটি করা হচ্ছে, পরিস্থিতির যথার্থ রাজনৈতিক কারণ আড়াল এবং ফিলিস্তিনের জাতীয় প্রকল্পকে নস্যাৎ করার লক্ষ্যে।
ইসরায়েল গাজাকে বিচ্ছিন্ন রাখতে চাইছে এবং মহাসাগরের মধ্যে অবস্থিত একটি দুর্ভাগ্যজনক এবং বিপজ্জনক দ্বীপ হিসেবে তুলে ধরছে। এ অবস্থায় গাজার পুনর্বাসনের কোনো রাস্তাই আর খোলা নেই। গাজার অধিবাসীদের স্বাধীন ভাবে চলাফেরার অধিকারের প্রতি সম্মান দেখানো হলেই কেবল গাজার ভৌত অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। এই সম্মান দেখানো হলে গাজাবাসীরা ইসরায়েল বা পশ্চিম তীরের কাজকর্ম করার, পশ্চিম তীর বা বিদেশে লেখাপড়া করতে যাওয়ার, পরিবার বা আত্মীয়-স্বজন-বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে অবাধে স্বাভাবিক মেলামেশা করার সুযোগ পাবে। তাদের মধ্যে আত্মমূল্যবোধ এবং সৃজনশীলতা পুনরায় জেগে উঠবে। ইসরাইলের সরকার এবং হামাস কেউই এ ধরণের কিছু দেখতে চায় না। এ কারণেই অন্যদের এটা চাওয়া উচিত।
[ইসরায়েলী সাংবাদিক আমিরা হাসের লেখাটি হারেৎস থেকে বাংলা রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]
