Loading...
The Financial Express

গুহাচিত্ররা কথা বলে

| Updated: June 05, 2022 23:22:22


আলতামিরা গুহার দেয়ালে আঁকা বাইসন, ছবি: ওয়ার্ল্ডহিস্ট্রি আলতামিরা গুহার দেয়ালে আঁকা বাইসন, ছবি: ওয়ার্ল্ডহিস্ট্রি

বিলীন হতে বসেছে প্রাগৈতিহাসিক যুগে রচিত গুহাচিত্র। সম্প্রতি এক গবেষণায় জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে মানবসভ্যতার সাথে জড়িয়ে থাকা অনন্য কীর্তিসমূহ।

ইন্দোনেশিয়ার দক্ষিণ সুলাওয়েশি প্রদেশে রয়েছে প্রায় ৩০০ টিরও অধিক গুহা। এগুলো মূলত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বুকে ধারণ করে রয়েছে পৃথিবীর আদিম মানুষদের অনন্য সব চিত্রকর্ম। বলা হয়ে থাকে বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো গুহাচিত্র এই অঞ্চলে রয়েছে। সভ্যতার এই পুরাকির্তিগুলোই আজ ধ্বংসের মুখে। বিশ্বের কিছু প্রাচীন গুহাচিত্র সম্পর্কে জানার আগে এই চিত্রগুলো আঁকার উদ্দেশ্য কী ছিল এবং আঁকার ক্ষেত্রে গুহা মানবরা কী ব্যবহার করতেন সে সম্পর্কে একটু ধারণা নেওয়া যাক।

ভন পেটিনজার, যিনি বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ ভিক্টোরিয়াতে ইউরোপীয় গুহাগুলোতে খুঁজে পাওয়া প্রাগৈতিহাসিক চিত্রকর্ম বা সংকেতও বলা যেতে পারে-এ নিয়ে পিএইচডিতে অধ্যয়নরত রয়েছেন। তিনি গত এক দশক ধরে এ নিয়ে গবেষণা করে চলেছেন।

প্রায় ৩০০ টিরও বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট নিয়ে প্রকাশিত গবেষণাপত্র অধ্যয়ন এবং সশরীরে প্রায় ৫২ টি গুহা পরিদর্শনের পর তিনি অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে খুব সম্ভবত যোগাযোগের জন্য এই ধরনের চিত্র আঁকা হতো বিশেষত তাদের জন্য যারা দূরে রয়েছে; সামনাসামনি যাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয় না। মুখের ভাষার প্রচলন হওয়ারও অনেক অনেক আগের এই চিত্রকর্মগুলো।

এখন তো ছবি আঁকার জন্য কত রকমের রং আর বাহারী ডিজাইনের তুলি/পেন্সিলসহ আরো কতকিছু পাওয়া যায়। কিন্তু সেই প্রাচীনকালে কী দিয়ে ছবি আঁকা হতো?

আর্ট রাডার জার্নালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মূলত প্রকৃতি থেকে পাওয়া বিভিন্ন রঞ্জক পদার্থ (যেমন – কয়লা বা ভুসা থেকে কালো রং, লিমোনাইট থেকে হলুদ রং, হেমাটাইট থেকে লাল রং, পোড়া খোলস, ক্যালসাইট থেকে সাদা রং) প্রাণীজ চর্বি, পালক এবং পশুপাখির লালার সাথে মিশিয়ে রং বানিয়ে ব্যবহার করা হতো।

এই রং ব্যবহার করে গুহার দেয়ালে বা ছাদে আঁকার জন্য তুলি হিসেবে ব্যবহার করা হতো পাথরের টুকরো, গাছের ডাল এবং পাখির শরীরের ফাঁপা হাড়।

লাসকক্স গুহা

ফ্রান্সের দক্ষিণ - পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত এই গুহায় রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো এবং অত্যাশ্চর্য চিত্রকর্ম। ভাবা যায়, কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই কিছু আদিম মানুষ গুহার ভেতরে নানা রকম বিশালাকার সব প্রাণীর চিত্র এঁকে রেখেছে; যার মধ্যে রয়েছে, যেমন -  ষাঁড়, ঘোড়া। ইউরোপের প্যালিওলিথিক্যাল যুগে এই অঞ্চলে এই প্রাণিগুলোর বিচরণ ছিল এবং এখনো আছে।

লাসকক্স গুহার দেয়ালে আঁকা চিত্র  ছবি: হিস্ট্রি ডট কম

গুহার দেওয়ালে প্রায় ২,০০০ - এরও বেশি ছবি আঁকা রয়েছে।

১৯৪০ সালের দিকে একদল কিশোরের কৌতূহল আর আগ্রহের ফলস্বরূপ এই গুহাচিত্র আবিষ্কৃত হয়। সেই কিশোররা কী কখনো ভেবেছিল তাদের মাধ্যমে মানব সভ্যতার এমন প্রাচীন সাক্ষী উন্মোচিত হবে!

১৯৭৯ সালে এই গুহাটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষিত হয়।

অতীতে এই গুহাটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকলেও বর্তমানে চিত্রকর্মগুলো ধূসর এবং ছত্রাকের উপস্থিতির কারণে নষ্ট হতে শুরু করলে তা পরিদর্শনের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়।

কেভ অফ সুইমারস

পৃথিবীর এক শেষ প্রান্তে রয়েছে এই গুহাটি। তবে এই অঞ্চলের নামের সাথে গুহার নামটা মেলালে খানিকটা সতর্ক দৃষ্টিতে পুনরায় নাম দুটো পড়ে দেখতে হয়। মিশরের সাহারা মরুভূমি অঞ্চলে রয়েছে এই কেভ অফ সুইমারস। ভুল না ঠিকই পড়েছেন সবাই। এই গুহার দেওয়ালে আঁকা রয়েছে – অনেক মানুষ সাঁতার কাটছে। তাই অনেক বিজ্ঞানীরা মনে করেন প্রাগৈতিহাসিক সময়ে হয়তো এখানে বিশাল হ্রদ বা নদী ছিল যা সময়ের সাথে বিলীন হয়ে আজ ধু ধু মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।

‘দ্য ইংলিশ পেশেন্ট’ সিনেমায় অনেকেই হয়তো টিভির পর্দায় এই গুহাটি দেখেছেন।

১৯৩৩ সালে ল্যাজলো অ্যালম্যাসি নামের একজন হাঙ্গেরিয়ান এক্সপ্লোরার এই গুহাচিত্রের সন্ধান পান। ধারণা করা হয় এগুলো নিয়োলিথিক যুগে (প্রায় ১০,০০০ বছর আগে) আঁকা হয়েছিল।

দর্শকদের উপস্থিতি এবং অতিরিক্ত আগ্রহের কারণে এই গুহার অনেক ছবিই নষ্ট হতে বসেছে। তাই স্থানীয় কর্তৃপক্ষ পরিদর্শনের সময় বাড়তি সতর্কতা জারি করেছেন।

আলতামিরা

স্পেনের পশ্চিমাঞ্চলে এই গুহাটি অবস্থিত। এই গুহার ভেতরে এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত পুরোটা জুড়ে ছবি আঁকা রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে মানুষ অধীর আগ্রহে আর অবাক বিস্ময়ে আদিম মানুষদের হাতে আঁকা বাইসন, ঘোড়া আর রহস্যে ঘেরা অনেকগুলো সংকেতের মিশেল দেখতে আসে এখানে।

গবেষকদের মতে এগুলো প্রায় ১৪,৮২০ - ১৩,১৩০ বছরের পুরনো।

১৮৭৫ সালে মডেস্টো ক্যুবিলাস নামের এক স্থানীয় ব্যক্তি সর্বপ্রথম এই গুহাচিত্রগুলোর সন্ধান পান।

এক শিলাপ্রপাতের পর থেকে জনসাধারণের পরিদর্শনের জন্য গুহাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাছাড়াও দেখতে আসা মানুষের শ্বাস - প্রশ্বাস থেকে নির্গত কার্বনডাইঅক্সাইডের ফলে ছবিগুলো বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল।

দ্য রক আর্ট অফ কাকাডু ন্যাশনাল পার্ক

অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত এই পাথুরে পার্কে রয়েছে এই দেশের প্রাচীন মানুষদের আঁকা সব চিত্রকর্ম। এগুলোর বেশিরভাগই আঁকা হয়েছে বিভিন্ন পাথরের উপর। এই ছবিগুলো সভ্যতা বিবর্জিত সেই মানুষগুলো সম্পর্কে খানিকটা ধারণা দেয়। বিভিন্ন মানুষ এবং প্রাণীর ছবি আঁকা রয়েছে প্রস্তর খন্ডগুলোতে। এছাড়াও এখানে এক্স-রে আর্টের দেখা মেলে।

লুডইগ লেইচার্ড নামের এক জার্মান এক্সপ্লোরার ১৮৪৫ সালে প্রথম এগুলো খুঁজে পান।

বিজ্ঞানীরা দাবি করেন যে প্রায় ২০,০০০ বছরের পুরনো এই গুহাচিত্রগুলো। 

জনসাধারণের জন্য এই পার্কটি উন্মুক্ত রয়েছে।

মাগুরা কেভ

এই গুহাটি বুলগেরিয়া অবস্থিত। প্রাচীনকালে উদযাপিত নানা উৎসব, গুরত্বপূর্ণ ঘটনা এবং নানা দেব - দেবীর প্রতিকৃতি আঁকা রয়েছে। বাদ যায়নি নারীর অবয়ব, মুখোশ মানব, শিকারের দৃশ্য, গাছপালা এবং আকাশের তারা। এছাড়াও এখানে একটি সোলার ক্যালেন্ডারের খোঁজ মিলেছে এবং বলা হয়ে থাকে এটি একটি বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন সোলার ক্যালেন্ডার।

এই গুহায় প্রায় ৭০০ টিরও বেশি চিত্রকর্ম পাওয়া গেছে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন যে এই চিত্রগুলো সামুদ্রিক পাখি এবং বাদুরের মল দিয়ে আঁকা হয়েছে।

ধারণা করা হয় ছবিগুলো প্রায় ১০,০০০ – ৮,০০০ বছর আগে আঁকা হয়েছিল।

এখানে পরিদর্শনের জন্য আগে থেকে বুকিং দিয়ে রাখতে হয় এবং অনুমতি নিতে হয়।

শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি  অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।

zabin860@gmail.com

 

Share if you like

Filter By Topic