প্রতিবেশী ভারতের শিল্পসমাহারের ভান্ডারে উৎসুক উঁকিঝুঁকি বাঙালির নেহায়েতই কম নয়। এই উঁকিঝুঁকির মাঝে দেখা মিলতে পারে হারিয়ে যেতে বসা এক ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় বস্ত্রশিল্প রোগান।
রোগান শিল্প কাপড় নানা রঙে রাঙিয়ে একেবারে স্বকীয় ছাপ তৈরির একটি পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে সেদ্ধ তেল এবং উদ্ভিজ্জ রঞ্জক থেকে তৈরি রং ব্যবহার করা হয়।
তারপর প্রিন্টিং ব্লক বা বিশেষ পেন্সিল এবং আঙুল ব্যবহার করে কাপড়ের ওপর স্থাপন করা হয় রঙিন ছাপ।
ঐতিহ্যগতভাবে রোগান আর্টে পুষ্পশোভন এবং জ্যামিতিক কারুকাজ ব্যবহার করা হয়। জীবনকে গাছের সাথে তুলনা এবং সুখের বিশেষ দর্শনের জন্য এই শিল্প সুপরিচিত।
চার শতাব্দী আগে গুজরাটের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে রোগান শিল্পের পূর্নাঙ্গ বিকাশ ঘটে। তবে এ শিল্পের জন্মস্থান এটি নয়; জন্মস্থান খুঁজতে ফিরে যেতে হয় এর নামেই।
রোগান একটি ফার্সি শব্দ ,মুঘল শাসনামলে এ শব্দটি সংস্কৃতির বিবর্তনে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত হয়, যার অর্থ তেল। পারস্য এবং সিন্ধের তেলচিত্র থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই গুজরাটের খাত্রী পরিবার সেখানেই তেল আর উদ্ভিজ্জ রঙের মিশেলে করতে শুরু করে রোগান আর্ট।
রোগান নামটি যতটা সাবলীল, কাজটি ততটাও নয়। রঙ প্রস্তুতকরণ, পেন্সিল প্রস্তুত এবং কাপড়ে রঙ লেপন মিলে কঠিন এক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয় হাতের এ কাজ।
প্রথমে উদ্ভিদের বীজ থেকে আহরণ করা হয় তেল। একটি কড়াইতে পর্যায়ক্রমে ১২ থেকে ১৪ ঘন্টা সিদ্ধ করা হয় তা। পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ হতে প্রায় দুদিন সময় লাগে। উত্তপ্ত উদ্ভিজ্জ তেল তারপর ঠান্ডা পানির সাথে মেশাতে হয়, এরপর মিশ্রণ ঘন হয়। এ ঘন মিশ্রণকে রোগান নামক পাতলা সোনালী বাদামী পদার্থে পরিণত করা হয়।
পরবর্তী ধাপে রং যোগ করা হয়। এর জন্য আবার প্রাণবন্ত রঙগুলো পানি এবং রোগানের সাথে মেশানো হয় একটি মূলের সাহায্যে। পানিতে সংরক্ষণ করার কারণ হলো রোগানকে শুকিয়ে যাবার হাত থেকে রক্ষা করা। এরপরই শুরু হয় অংকনের কাজ।
অংকনের প্রক্রিয়াটিও সহজ নয়। ডিজাইনের উপর নির্ভর করে এ কাজ করতে দিন, সপ্তাহ, এমনকি মাসও লেগে যেতে পারে।
এই সূক্ষ্ম প্রক্রিয়ার বিপরীতে শিল্পীর প্রয়োজনীয় সরঞ্জামগুলোর ব্যবহার খানিকটা সহজ। একটি ধাতব দন্ডের মতো পেন্সিল এবং হাতের তালু ব্যবহার করে তিনি বাকি কাজ করেন। শুধু এই নকশায় রং করার অংশটাই জয় করে নেবে যেকোনো দর্শকের মন।
প্রাথমিকভাবে রোগান আর্ট গুজরাটের স্থানীয় পশুপালক এবং কৃষক পরিবারগুলো ধারণ করেছিল। ঐতিহ্যগতভাবে, এই সম্প্রদায়ের বিয়ের পোষাক এই হস্তশিল্প দিয়ে সাজানো হতো।
তবে সময়ের আবর্তনে সাশ্রয়ী বিকল্প হিসাবে মেশিনে তৈরি কাপড়ের সহজলভ্য হয় আর চাহিদা হ্রাস পায় এ শিল্পের। যদিও ‘২০-এর দশকে এসে রোগান আর্ট বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে চলে আসে। কিন্তু ঐতিহ্য আজও টিকে আছে গুজরাটের কাচ জেলার নিরোনা গ্রামে।
সেখানে খাত্রী পরিবার ১৯৮০ সাল থেকে পরিকল্পনা করে তাদের পারিবারিক প্রাচীন এ ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তারা পুরনো এ কারুকাজকে আনুষ্ঠানিক পোশাকের জন্য বাণিজ্যিকীকরণ করেছে।
একইসাথে রোগান আর্টের বিভিন্ন জিনিস একে প্রদর্শনী আয়োজন করছে প্রতিনিয়ত। শিল্পবোধ সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়েও আর্ট ফর্মটিকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে তারা।
শিল্পকর্মকে টিকিয়ে রাখার নিরিখে কাজ করার জন্য ২০১৯ সালে ভারত সরকার পদ্মশ্রী পুরষ্কারে ভূষিত করে খাত্রী পরিবারের রোগান শিল্পী আব্দুল গফুর খাত্রীকে।
মোজাক্কির রিফাত বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নরত।
anmrifat14@gmail.com
