Loading...

গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়: জানা-অজানায় এক নক্ষত্রের জীবন

| Updated: February 18, 2022 14:21:57


গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়: জানা-অজানায় এক নক্ষত্রের জীবন

তখন ঠিক সন্ধ্যা। পূর্ণিমার চাঁদ বের হতে খানিকটা বাকি। এমন এক মায়াবী রাতে বাংলার আকাশে শোভমান হেমন্ত , শচীনদেব, শ্যামল, মান্না, মানবেন্দ্র - এমনই সব উজ্জ্বল নক্ষত্রের দলে যোগ হলো আরেকখানি তারা - যেন এক ‘সন্ধ্যা’তারা।

বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের অন্যতম কিংবদন্তী শিল্পী গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় সেই তারা। তার আলোময় সুরেলা জীবনের কিছু জানা-অজানা গল্প রইলো পাঠকের জন্যে।

এই পথ যদি না শেষ হয়

'এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলো তো?' - এই গানটি শোনেননি এমন সংগীতপ্রিয় বাঙালি পাওয়া ভার। এই বিখ্যাত গানটির নেপথ্য কণ্ঠে ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আর সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়।

ষাটের দশকের জনপ্রিয় বাংলা সিনেমা সপ্তপদীর গান এটি। গানের দৃশ্যে মোটর বাইক চেপে চলছেন কৃষ্ণেন্দু উত্তমকুমার, তার কাঁধ ধরে পেছনে রীনার বেশে সুচিত্রা সেন।

গানটি শুধুই সুরের জন্যে কালজয়ী নয়। এরকম একটি দৃশ্য সেই সময় কল্পনার অতীত ছিল! কিন্তু সত্যি অর্থে সন্ধ্যাই প্রশ্ন করে বসছেন যেন উত্তমকে, এরকম চললে কেমন হয়? আর হেমন্তের কণ্ঠে উত্তম, উত্তরখানি ফের তাকেই দিতে বলছেন - তুমিই বলো! 

গানটি আদতে ছিল গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের একখানা কবিতা। গানটির রেকর্ডিং যখন চলছে, হেমন্ত ভাবছেন এতে কিছু সংলাপ জুড়ে দিলে কেমন হয়। সেই সংলাপ দেখিয়ে সন্ধ্যাকে বলছেন, "দেখো হয় কিনা, তুমি বলো তো?" তারই ফলাফল হিসেবে গানটি পর্দার কৃষ্ণেন্দু - রীনা ব্রাউনির কণ্ঠে আজও অমর।

যখন গানটি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে, সেই সময় টলিপাড়ার বসুশ্রী হলে বসেছে পহেলা বৈশাখের গানের জলসা। কিন্তু একটি কাজে সেদিন আটকে যান হেমন্ত, তাই ছিলেন না জলসায়। কিন্তু উপস্থিত ছিলেন উত্তম কুমার স্বয়ং।

উত্তম গান গাইতেও উত্তম, তা সকলের জানা। তাই দর্শক শ্রোতারা উত্তমকে সন্ধ্যার সাথে গানটি গাইতে অনুরোধ জানালো।

কিন্তু মুশকিল হলো গানটি উত্তমের মুখস্থ নেই। সঙ্গে থাকা গানের খাতা এগিয়ে দিলেন সন্ধ্যা দেবী। সকলে উপভোগ করল সেই অবিস্মরণীয় যুগলবন্দী, সন্ধ্যার সাথে উত্তমের নিজ কণ্ঠে।

বিয়ে নিয়ে কান্ড

মেয়ের গায়ের রং কালো, বিয়ে হবে কেমন করে? - এমন কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভাবনায় সন্ধ্যার পরিবার ছিল চিন্তিত। তাই মেয়েকে বেশি করে গান শেখানোর জোর। দাদাদের সাথে রেওয়াজে পাঠানো হত সন্ধ্যাকে।

সেসময়কার পরিবারগুলো তাদের শ্যামবর্ণের মেয়েদের বিয়ের বাজারে দাম বাড়াতে গান করা শেখাতেন। যে সন্ধ্যার গান শুনিয়েই পাত্র পক্ষের মন জয় করে ফেলেছিল অনেক বিবাহযোগ্যা কন্যা, সেই বাংলা গানের রানীর পরিবারের তার গায়ের রঙ নিয়ে এমন ভাবনা ছিল, মেনে নেওয়া কষ্টই বটে।

ব্যক্তি জীবনে গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের জীবনসঙ্গী ছিলেন বিখ্যাত গীতিকার শ্যামল গুপ্ত। জীবনের পথ চলা শুরু হলো ভালোবাসায়।

বাংলা ছবির জন্যে অনেক গানই লিখেছেন শ্যামল গুপ্ত। কিন্তু একটি গান দিতে চেয়েছেন ভালোবাসার সন্ধ্যাকে। লেখা শেষে ভাবছেন কার কন্ঠে সুর তুলিয়ে নেবেন প্রেমের ভাষার।

দ্বারস্থ হলেন বন্ধু মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের। বন্ধুর প্রেমপত্র গেয়ে শোনালেন মানবেন্দ্র। রেকর্ড হলো 'আমি এতো যে তোমায় ভালোবেসেছি' (১৯৫৭)। সেই শুরু, তারপরে আরো অনেক গান সন্ধ্যার জন্যই চুপিচুপি লিখতেন শ্যামল গুপ্ত।

এই যুগলের পরিণয়ের পথে বাঁধা ছিল অনেক। ব্রাহ্মণ বংশের মেয়ে গুপ্ত পরিবারে গোত্রান্তর হবে,  মানতে পারছিল না পরিবার। দুজনে প্রতীক্ষার প্রহর গুনেছিলেন। অবশেষে ১৯৬৬ সালের ১০ মার্চ তারা বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। বিয়ের দিন ঘটেছিল এক অদ্ভূত কান্ড।

শহর কলকাতায় ডাকা হয়েছিল বনধ (হরতাল)। তাই বরবেশে শ্যামল গুপ্ত বিয়ের আসরে উঠলেন এম্বুলেন্সে করে!

মহালয়ায় সন্ধ্যার গান

দুর্গাপূজার আগে মহালয়ার ভোর মানেই বাঙালির কাছে পঙ্কজ কুমার মল্লিকের 'মহিষাসুরমর্দিনী,' যা ছাড়া পূজাই বোধহয় শুরু হয় না। ঊষা লগ্ন হতে প্রকৃতির রূপের সাথে মিলিয়ে মিলিয়ে গান বাজানো হতে থাকে একের পর এক। 

কলকাতার আকাশবাণীর এই রেকর্ডিংয়ের একেবারে শেষের আগের গান 'বিমানে বিমানে আলোকের গান' - সন্ধ্যার গাওয়া। যেটি আজ ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে বাজছে, বেজে যাবে আগামী দিনগুলোতেও মহালয়ার দিনে।

ঘরে ঘরে সনাতনীরা লক্ষ্মী পূজায় 'এসো মা লক্ষ্মী' গান গেয়ে দেবীকে বরণ করে। এর রেকর্ডেও কন্ঠ দিয়েছেন সন্ধ্যা।

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত প্রথম রেকর্ড নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, যাতে ছিল সানাই ও ঘুঙুরের আওয়াজ। গানটি রেকর্ড করতে হয়েছে দ্বিতীয়বার। ছায়াছবির দৃশ্যে ব্যবহৃত পূজারতা মৌসুমী চ্যাটার্জি ঠোঁট মিলিয়েছেন গানে।

মেয়ের সাথে গান

মেয়ে শ্রাবন্তীর ছিল মায়ের সাথে মধুর সম্পর্ক। পরিবারের গুণে টুকটাক গান তিনিও শিখেছেন। ২০০৮ সালের  ২৫ ডিসেম্বর একটি শো তে মায়ের সাথে করেছেন 'মা ও মেয়ের গান।’

মেয়ে গাইছে, ‘তুমি আমার মা আমি তোমার মেয়ে, বলো না মা কি পেয়েছ আমায় কোলে পেয়ে?’

মা উত্তরে গাইলেন, ‘যেদিন আমার কোলে এলি, প্রথম হলাম মা।’

একটি ইউটিউব চ্যানেল থেকে শেয়ার হওয়া  সেই মূহুর্ত এখন রীতিমত ভাইরাল।

বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন শরণার্থীদের সাহায্য করতে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় নিজেই নেমে পড়েন অর্থসাহায্য যোগাড় করতে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের হয়ে তিনই সেসময় কাজ করেছেন। বঙ্গবন্ধুর কারামুক্তি উপলক্ষে গেয়েছেন ‘বঙ্গবন্ধু তুমি ফিরে এলে' গানটি।

গতবছর বাংলাদেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সন্ধ্যা দেবী বিনম্র শ্রদ্ধা জানান বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুর প্রতি।

সজল চোখে বলেন, "বাংলাদেশ আমাকে আমার নিজের দেশ থেকে বেশি ভালোবাসে। আমি জানি না কতটা ভালোবাসা আমি দিতে পেরেছি, কিন্তু আমি বাংলাদেশকে খুব ভালোবাসি। বাংলাদেশের মানুষের প্রতি আমার ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। জানি না এই ভালোবাসা দেওয়ার যোগ্যতা আমার আছে কিনা। মুজিবরজীকে আমার কোটি কোটি প্রণাম।"

 

সুস্মিতা রায় বর্তমানে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজে ৩য় বর্ষে অধ্যয়নরত।

susmi9897@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic