‘তর্ক থেকে যদি চমৎকার কিছু হয়, তবে তর্কই ভালো’ – বিষয়টা তবে কপালের ভাঁজে খানিকটা হলেও ভাঁজের সৃষ্টি করবে। আর সেটা যদি হয় অনন্য কোনো আবিষ্কার তাহলে জানার আগ্রহটা বেড়ে যায় কয়েকগুণ!
সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তি কে, শ্রেষ্ঠ ধনকুবের কে, কে দ্রুত সময়ে কী পাড়ি দিলো, সবচেয়ে বেটে মানুষ, সবচেয়ে মোটা মানুষ- এমন কতশত বিষয়ের রেকর্ডের ঝুলি নিয়ে প্রতি বছর গিনেজ বুকের নতুন একেকটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এতো তথ্য সন্ধান করে, সেগুলো যাচাই বাছাই করে নথিভুক্ত করার বুদ্ধিটা ঠিক কার মাথা থেকে বেরিয়েছিলো অর্থাৎ এই বইটা আবিষ্কারের নেপথ্য কাহিনীটা সম্পর্কে একটা অজানা আগ্রহ কাজ করে। কীভাবে আবিষ্কার হলো গিনেজ বুক?
যুগান্তকারী এই আবিষ্কারের ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল সেই ১৯৫১ সালে। সে বছর নভেম্বর মাসে গিনেজ ব্রিউয়ারি নামের একটি বিয়ার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক, স্যার হিউগ বিভের (যিনি জাতিগতভাবে একজন আইরিশ ছিলেন এবং এই গিনেজ ব্রিউয়ারির অবস্থান ছিল দুবলিনে) আয়ারল্যান্ডে এক শিকার ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন।
উদ্দেশ্য ছিল ‘গোল্ডেন প্লোভার’(এটা এক ধরনের লম্বা পা বিশিষ্ট জলের পাখি যারা বেশিরভাগ সময় জলের মধ্যে দিয়ে চলে) নামের এক ধরনের পাখি শিকার করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তিনি বা তার দলের কেউই সেদিন এই পাখি শিকার করতে পারেন নি।
কিন্তু দিনশেষে তার এবং দলের লোকদের মধ্যে কথা প্রসঙ্গে ‘ইউরোপের সবচেয়ে দ্রুততম পাখি’কোনটি এ বিষয়ে একরকমের বলা যায় বাকবিতন্ডা শুরু হয়ে যায়। তর্কের সমাধানে আসতে অনেক বই ঘেটেও এই তথ্যের সঠিক সন্ধান সেদিন মেলে নি।
এর প্রায় বছর তিনেক বাদে ১৯৫৪ সালের দিকে হঠাৎই একদিন সেইদিনের সেই তর্কের কথা স্যার হিউগের মনে পড়ে যায়। বিষয়টা স্যার হিউগকে বেশ ভাবিয়ে তোলে। তিনি ভাবলেন, এমন একটা রেকর্ড বই যদি থাকতো যেখানে এরকম অনেক তথ্যের সহজ সন্ধান মিলবে তাহলে কেমন হয়! আর তাছাড়া ব্রিটেনের প্রকাশনা সংস্থাগুলোর পৃষ্ঠপোষক যারা রয়েছেন, তারাও নিশ্চয় এমন একটা বই পেলে বেশ আনন্দের সাথেই তা গ্রহণ করবেন। যেমন ভাবা তেমন কাজ। তর্কের সমাধানে এমন একটি বই সৃষ্টির পেছনে লেগে পড়লেন।
প্রথমে তিনি দুইজন ব্যক্তিতে নিযুক্ত করলেন। তারা হলেন নরিস এবং রস ম্যাক হুইরটার-জমজ দুই ভাই, যারা লন্ডনভিত্তিক একটি এজেন্সির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং এই এজেন্সির কাজ ছিল সংবাদপত্র এবং বিজ্ঞাপনদাতাদের বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য এবং পরিসংখ্যান সরবরাহ করা।
সে বছর নভেম্বর মাসের ৩০ তারিখে একটি জিমন্যাশিয়ামের দুটি কক্ষকে খানিকটা সাজিয়ে গুজিয়ে নিয়ে অফিস হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা হয় এবং কার্যক্রম শুরু হয়।
দুইভাই ব্যাপক তথ্য অনুসন্ধানের পর বই লিখার কাজ শুরু করেন এবং প্রথম সংস্করণের বইটি লিখতে টানা ১৩ সপ্তাহ ৪৫ ঘন্টা সময় লেগেছিল। এর মধ্যে সাপ্তাহিক ছুটি এবং ব্যাংক বন্ধের দিনগুলোও অন্তর্ভুক্ত ছিল। স্যার হিউগ যেমন আশাবাদী ছিলেন যে বইটি প্রকাশকরা লুফে নিবে, কাজ করার সময় জমজ ভাইরাও উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে এই বইটি সর্বকালের সেরা বিক্রিত একটি বই হতে যাচ্ছে।
লিখা শেষ হলে গিনেজ ব্র্যান্ডকে প্রমোট করার উদ্দেশ্যে বইটি বিনামূল্যে প্রকাশনা সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু বইটি এতোটা জনপ্রিয়তা লাভ করে যে প্রকাশনা সংস্থাটি বইটি বিক্রি শুরু করে। সেবছর বইটি একটি বেস্ট সেলার বই হিসেবে স্বীকৃত হয়।
এর পরের বছর আমেরিকাতে এবং পরবর্তীতে আরো বেশ কয়েকটি দেশে এই বইয়ের সংস্করণ বের হয়।
জমজ দুই ভাই থেমে থাকেন নি। তারা বিশ্ব চষে বেরিয়েছেন সঠিক তথ্যের সন্ধানে। রস ম্যাকহুইটার ১৯৭৫ সালে একজন আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি গানম্যানের হাতে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত বই সংকলনের কাজ করে গেছেন। আর তার অপর ভাই নরিস ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত বইয়ের সম্পাদক হিসেবে কাজ করে গেছেন।
বর্তমানে এটি একটি গ্লোব্যাল ব্রান্ড এবং বইটি ‘দ্য গিনেজ বুক অফ রেকর্ড’হিসেবে পরিচিত। আর এই বইয়ে নথিভুক্ত হওয়া রেকর্ডসমূহ গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড হিসেবে পরিচিত।
দুই রুমের ছোট্ট একটি অফিস দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে লন্ডন, নিউইয়র্ক, বেইজিং, টোকিও ও দুবাইতে এর অফিস রয়েছে এবং বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর এবং নির্ধারকগণ।
শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
zabin860@gmail.com
