ধরুন আপনার কাছে একটি বই আছে, এর বিনিময়ে আরেকজনের কাছে থাকা একটি বই সংগ্রহ করতে পারবেন। শুনে অনেকের কাছেই এটি সাধারণ বিষয় মনে হতে পারে। কারণ দেশের আনাচে কানাচে অনেক জায়গায়ই এখন বই বিনিময় মেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। কিন্তু বইয়ের জায়গায় যদি বলা হয় একইভাবে গাছ বিনিময় করা যাবে? তাহলে নিশ্চয়ই অনেকের চোখ কপালে উঠবে।
এরকমই এক ভিন্নধর্মী মেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে রাজধানীর গুলশানে পুলিশ প্লাজার সামনে। প্রতি মাসের শেষ শুক্রবার বসে অভিনব এ মেলা। ফেসবুকভিত্তিক দুইটি গ্রুপ বাংলাদেশ প্ল্যান্ট লাভারস সোসাইটি এবং বাংলাদেশ ক্যাকটাস লাভারস সোসাইটির আয়োজনে করা হয়ে থাকে বিশেষ এ ধরনের মেলা।
আপাতপক্ষে গ্রুপ দুটিকে আলাদা মনে হলেও দুটি গ্রুপের যাত্রাই শুরু হয় আসিফ ইকবালের হাত ধরে। মূলত দেশের বিভিন্ন স্থানের বৃক্ষপ্রেমীদের নিয়ে বাংলাদেশ প্ল্যান্ট লাভারস সোসাইটি গ্রুপটি শুরু করা হয়েছিলো ২০১৭ সালের জুন মাসে। এর প্রায় ৬ মাস পর অর্থাৎ ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে শুরু হয় বাংলাদেশ ক্যাকটাস লাভারস সোসাইটি গ্রুপের যাত্রা যা মূলত ক্যাকটাস, কাঁটামুকুট জাতীয় গাছের বাগান যারা করেন তাদের নিয়ে গড়ে তোলা।
গ্রুপ দুটির একজন শীর্ষ এডমিন সেলিনা আহমেদ জানান, “বাংলাদেশ প্ল্যান্ট লাভারস সোসাইটি গ্রুপটি যদিও বাংলাদেশ ক্যাকটাস লাভারস সোসাইটির আগে শুরু করা হয়েছিল কিন্তু মূলত বাংলাদেশ ক্যাকটাস লাভারস সোসাইটির কার্যক্রম ভালোভাবে শুরু হওয়ার পরই বাংলাদেশ প্ল্যান্ট লাভারস সোসাইটি গ্রুপটি নতুন করে সবার সামনে আসে।”
গ্রুপ দুটির উদ্যোক্তা একজন হলেও কেনো আলাদা নামে দুটি গ্রুপ করে কার্যক্রম চালানো হয় জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ক্যাকটাস লাভারস সোসাইটি গ্রুপটি মূলত ক্যাকটাস, কাটামুকুট এ জাতীয় গাছের বিনিময় করার জন্য তৈরি করা হয়। আর বাকি সব গাছ বিনিময় করা হয় বাংলাদেশ প্ল্যান্ট লাভারস সোসাইটি গ্রুপটির মাধ্যমে।”
গ্রুপ দুটি আসিফ ইকবালের নেতৃত্বে গড়ে উঠলেও বর্তমানে সেলিনা আহমেদই বাংলাদেশ প্ল্যান্ট লাভারস সোসাইটি গ্রুপটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে রয়েছেন।
বর্তমানে বাংলাদেশ প্ল্যান্ট লাভারস সোসাইটির সদস্য সংখ্যা ৮৭ হাজারের বেশি এবং বাংলাদেশ ক্যাকটাস লাভারস সোসাইটির সদস্য সংখ্যা ৭৩ হাজারের বেশি।
প্রতি মাসে আয়োজিত এ গাছ বিনিময় কর্মসূচি সফল করার জন্য কাজ করেন ১৫ জন স্বেচ্ছাসেবী।
সেলিনা আহমেদ আরও জানান, “আমাদের গ্রুপে মূলত গাছ বিনিময় কর্মসূচি শুরু হয় করোনা সংক্রমণের শুরুর দিকে। প্রথমদিকে অনলাইনেই গাছ বিনিময় করতো গ্রুপের সদস্যরা। কিন্তু অনেক সময় দেখা যেতো অনেকে গাছ বিনিময় করতে চেয়ে পরে নিজেরা গাছ দিত না। আবার পার্সেল করার একটা ঝামেলা ছিলো। তাই করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমরা সরাসরি গাছ বিনিময় কর্মসূচিটি নিয়মিত করার উদ্যোগ নেই।”
বাংলাদেশ প্ল্যান্ট লাভারস সোসাইটি এবং বাংলাদেশ ক্যাকটাস লাভারস সোসাইটি গ্রুপ দুটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন বেশ কিছু সক্রিয় মডারেটর। এর মধ্যে একজন হলেন শাহপরান যিনি প্রতিটি মেলায় উপস্থিত থেকে গাছ বিনিময়ের আয়োজনটি সফল করার জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

শাহপরান তাদের এ গাছ বিনিময় কর্মসূচির ব্যাপারে বলেন, “আমদের গ্রুপ গত বছর থেকে এই এক্সচেঞ্জ ডে অনুষ্ঠান করে আসছে। প্রতি মাসের শেষ শুক্রবার এই প্ল্যান্ট এক্সচেঞ্জ ডে অনুষ্ঠান করা হয়। অনুষ্ঠানটি মূলত করা হয় যারা নতুন-পুরাতন বাগানি আছেন তারা যেন সহজে গাছ সংগ্রহ করতে পারে্ন। তাছাড়া অনেক ছাত্র বাগানিও থাকে যারা গাছ কিনতে পারে না। কিন্তু এই অনুষ্ঠানে আসলে সহজেই গাছ পেয়ে যায়। অনেক বড় বাগানি আছেন যারা তাদের অতিরিক্ত গাছ নিয়ে আসেন অনুষ্ঠানে সবাইকে দিতে। আবার অনেকে আমাদের ফেসবুক গ্রুপ বাংলাদেশ প্ল্যান্ট লাভারস সোসাইটি ও বাংলাদেশ ক্যাকটাস লাভারস সোসাইটিতে আগে পোস্ট করে রাখে যে তার একটি গাছ অতিরিক্ত আছে, সে ঐ গাছটার বিনিময়ে অন্য আরেকটি গাছ চায়।”
“এমন অসংখ্য মানুষ গ্রুপে পোস্টের মাধ্যমে প্ল্যান্ট এক্সচেঞ্জ করে। আর এই পুরো আয়োজনটিই করা হয় বাংলাদেশ প্ল্যান্ট লাভারস সোসাইটি ও বাংলাদেশ ক্যাকটাস লাভারস সোসাইটি এর তত্ত্বাবধানে।”
এছাড়াও তিনি গ্রুপ দুইটির কাজের পরিধি সম্পর্কে বলেন, “দুইটি গ্রুপ আলাদা হলেও আমরা এক হয়েই কাজ করি। বিসিএলএস মূলত কাজ করে ক্যাকটাস, সাকুলেন্ট, কাটামুকুট আরো অসংখ্য দুর্লভ গাছ নিয়ে। আর বিপিএলএস কাজ করে সব রকমের গাছ নিয়ে ”
এ অভিনব গাছ বিনিময় মেলায় যে শুধুমাত্র গাছ বিনিময় হয় তা নয়, সেরা বাগানিদের পুরস্কৃতও করা হয়। এ সম্পর্কে শাহপরান বলেন, “আমাদের দেশে অনেক পুরান ও বড় বাগানি আছেন। তাদের সম্মাননা প্রদানের জন্য বিপিএলএস ও বিসিএলএস মিলে এবার আমরা আমাদের দেশের দশ জন বাগানিকে দেশ সেরা বাগানির সম্মাননা প্রদান করেছি। তাছাড়া আমাদের গ্রুপ থেকে প্রতি মাসে দশ জন সক্রিয় সদস্যকেও আমরা বিভিন্ন গাছ দিয়ে উপহার দিয়ে থাকি। এতে করে তাদের বাগান করার প্রতি আগ্রহ আরো অনেক বাড়ে।”
বাংলাদেশ প্ল্যান্ট লাভারস সোসাইটির সূচনা নিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের এর যাত্রা শুরু হয় ২০২০ সালে। বাংলাদেশ ক্যাকটাস লাভারস সোসাইটির এডমিন আসিফ ইকবাল, সাদাত ফেরদৌস, সেলিনা আহমেদ, শেরজান আলী ও তানিয়া মুক্তা মিলে এই গ্রুপটি তৈরি করেন। সবাই তারা একত্রিত হয়ে এই দুইটি গ্রুপ চালনা করেন।”
তাদের কার্যক্রম এখন যে শুধু এ দুটি গ্রুপের মধ্যে সীমাবদ্ধ আছে তা নয়। বর্তমানে দেশে কাটামুকুট গাছের জনপ্রিয়তা বাড়ার কারণে তারা বাংলাদেশ ইউফোরবিয়া লাভারস সোসাইটি নামে নতুন একটি গ্রুপের উদ্বোধন করেছেন।
গ্রুপগুলোর কর্ণধার আসিফ ইকবালের কাঁটামুকুট বাগানে আমাদের দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমাণ কাঁটামুকুট প্রজাতির সংগ্রহ আছে বলে জানা যায় শাহপরানের কাছে।

এছাড়াও শাহপরান বাংলাদেশ প্ল্যান্ট লাভারস সোসাইটতে তার নিজের যাত্রা নিয়ে বলেন, “আমি গ্রুপের সাধারণ মেম্বার ছিলাম। কিন্তু বর্তমানে আমি গ্রুপের একজন মডারেটর। মডারেটরের দায়িত্বে আছি প্রায় দুই বছর হয়। আমাদের গ্রুপে আমার মতো এমন আরো দশ জন মডারেটর আছে। আমরা সবাই মিলে এই গ্রুপ পরিচালনা করি। আমাদের এই প্লান্ট এক্সচেঞ্জ অনুষ্ঠানটি ঢাকা শহরের ভিতরে করা হয়। আমরা এবার উদ্যোগ নিয়েছি আমাদের এই সবুজ বিনিময় অনুষ্ঠান আমাদের দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ করে বিভাগীয় শহরগুলোতে করবো। এতে করে সবুজের বিনিময় আরো প্রসার পাবে।”
বাংলাদেশে যেখানে প্রয়োজনের তুলনায় গাছের পরিমাণ অনেক কম, সেখানে তরুণদের এ উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। এরকম কিছু অভিনব উদ্যোগই পারে বাংলাদেশের সেই সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা রূপ আবার ফিরিয়ে আনতে।
মোঃ ওমর ফারুক তপু বর্তমানে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যন্ত্রকৌশল বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
jafinhasan03@gmail.com
