Loading...

খুনি মেলেনি, করবী খুনের বিচারের কী হবে?

| Updated: February 14, 2022 12:43:53


তাসনিম রহমান করবী। তাসনিম রহমান করবী।

নিজের ঘরে খুন হয়েছিলেন তাসনিম রহমান করবী, গলা কেটে হত্যা করা হয়েছিল তাকে, বাঁচার চেষ্টা যে করেছিলেন, তা মিলেছিল ধস্তাধস্তির আলামতে। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

খুনের বিষয়টি নিশ্চিত হলেও খুনি কারা, তদন্তে তা চিহ্নিত করা যায়নি উল্লেখ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি।

ফলে এই কিশোরী হত্যার বিচার আপাতত বন্ধ হয়ে গেল। আর বিচার হবে কি না, তাও অনিশ্চয়তায় পড়ে গেল। 

এ পরিস্থিতিতে হতাশা প্রকাশ করেছেন করবীর আইনজীবী মা আফরোজা ফারহানা আহমেদ অরেঞ্জ এবং আইনজীবী বাবা এস এম মিজানুর রহমান।

ফারহানা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা কাউকে, কোনো ব্যক্তিকে সরাসরি দোষারোপ করছি না, দোষ আমাদের ভাগ্যের। আমরা দুর্ভাগা।

“আমার স্বামী মিজানুর রহমানও একজন আইনজীবী, আমাদের বেলায়ও এরকম হল, আর সাধারণ মানুষের কী হবে?”

মামলার সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে যিনি চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দিয়েছেন, সেই মাইনুল ইসলাম খুনি চিহ্নিত করতে না পারার ব্যর্থতাকে ‘দুর্ভাগ্য’ হিসেবেই বর্ণনা করছেন।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটা আমাদের দুর্ভাগ্য যে সিআইডির প্রধান, একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন সিআইডি কর্মকর্তা মিলে টিম গঠন করে তদন্ত করার পরেও কিছু পাইনি।

“এটি একটি নৃশংস হত্যার ঘটনা। দুঃখজনক এ ঘটনার তদন্তের আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগে ৭/৮ বছর পার হয়ে গিয়েছিল। ঘটনার প্রথমদিকে তদন্তের দায়িত্ব পেলে কিছু করতে পারতাম। এতটা পরে আর কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না। আমরাও পাইনি।”

২০১২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বিকালে ঢাকার হাজারীবাগ থানা এলাকার ভাগলপুরে ফারহানা ও মিজানের ফ্ল্যাটে খুন করা হয় করবীকে।

১৩ বছরের করবী পিলখানা মুন্সি আবদুর রউফ স্কুল ও কলেজে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত। ছয় তলা ওই বাড়ির তিনতলার ফ্ল্যাটে থাকত তারা। তিন কক্ষের ওই ফ্ল্যাটের করবীকে তার কক্ষেই খুন করা হয়।

ওই ভবনের চার তলায় করবীর নানীর বাসা। নানীর কাছেই করবী ও তার ছোট ভাইকে রেখে সাধারণত বের হতেন তার বাবা-মা। সেদিন করবী স্কুল থেকে দুপুরে ফিরে একাই বাসায় ছিল।

করবীর লাশ তার কক্ষের খাটের উপর পাওয়া গিয়েছিল। খুনিদের সঙ্গে ধস্তাধস্তির কারণে ঘরের জানালার পর্দা ছিল ছেঁড়া। বটি দিয়ে কাটা হয়েছিল তার গলা।

করবীর লাশ উদ্ধারের সময় বাসার আলমারি পাওয়া গিয়েছিল খোলা, আর সেখানে থাকা চার ভরি স্বর্ণালঙ্কার পাওয়া যায়নি।

সেদিনই মিজানুর রহমান হাজারীবাগ থানায় ডাকাতি ও হত্যার অভিযোগ এনে মামলা করেন। তবে তাতে কাউকে আসামি করা হয়নি।

গুরুত্ব বিবেচনায় মামলাটিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেলে নেওয়া হয়েছিল। থানা-পুলিশের তদন্তে অগ্রগতি না থাকায় সেই দায়িত্ব দেওয়া হয় গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি)

ঘটনার কিছুদিন পর ওই বাড়ির ছয়তলায় খোলা অসম্পূর্ণ একটি ফ্লোরে মাদক সেবনকারীদের পরিত্যক্ত ফেনসিডিলের বোতল ও হেরোইন সেবনের আলামত পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন ডিবির তদন্ত কর্মকর্তা এসআই নূরুজ্জামান।

তিনি বলেছিলেন, “কিন্তু তাদের ব্যাপারে এলাকাবাসী মুখ না খোলায় হত্যাকারীদের সনাক্তে কোনো সূত্র মেলানো কঠিন হয়ে পড়ে।”

ডিবির তদন্তেও অগ্রগতি না হওয়ায় ২০১৬ সালে তদন্তভার চাপে সিআইডির উপর। সিআইডির পরিদর্শক মনির হোসেন প্রথমে তদন্ত করেন। পরে দায়িত্ব পান পরিদর্শক মো. জহিরুল হক। এরপর আজিজুর রহমানের হাত ঘুরে দায়িত্ব মাইনুল ইসলাম।

ঘটনার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল মো. শামিম আহমেদ (৩৫), মো. সাইদুল ইসলাম (২৭), মো. হাবিবুর রহমান ভুট্ট (২৮), মো. আজিম হোসেন পলাশ ((২৩), মো. হাসেম (২৩), মো. আব্দুল আহমেদ হান্নান মোল্লা (৩৩), মো. কামরুল ইসলামকে (৩১)।

তবে চূড়ান্ত প্রতিবেদন গৃহীত হওয়ার পরে তাদের আদালত অব্যাহতি দেয় বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান করবীর বাবা আইনজীবী মিজানুর রহমান।

গত বছরের ডিসেম্বরে ঢাকার একটি আদালত সিআইডির দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করেন। তাতেই থেমে গেল বিচার প্রক্রিয়া।

গত বছরের এপ্রিল মাসে দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা মাইনুল বলেন, “জব্দকৃত আলামত, সাক্ষীদের জবানবন্দি, করবীর সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত রিপোট পর্যালোচনায় ঘটনার পারপার্শ্বিকতায় অপরাধ সত্য প্রমাণিত হলেও প্রকৃত হত্যাকারীরা শনাক্ত না হওয়ায় আরও অধিক তদন্তধীন থাকলেও সুফলের সম্ভাবনা ক্ষীণ থাকায় এ মামলার তদন্ত সমাপ্ত করে মামলাটির চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করা হল।

“পরবর্তীতে কোনো সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করার আবেদন রেখে এবং আসামিদের মামলার দায় থেকে অব্যাহতির আবেদন করা যাচ্ছে।”

গত বছরের ২২ ডিসেম্বর ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম মো. হাসিবুল হক প্রতিবেদনটি গ্রহণ করে মামলার সমস্ত কার্যক্রম নিষ্পত্তি করে দেন।

ঢাকার একটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালে রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ কৌঁসুলি ফারহানা অরেঞ্জ মেয়ের হত্যার তদন্তে পুলিশের তিনটি শাখার ব্যর্থ্তায় আক্ষেপ করে বলেন, “আমাদের তদন্ত সংস্থাগুলোর আধুনিকায়ন দরকার, দরকার বিশেষ প্রশিক্ষণের। তা না হলে বিচার ব্যবস্থায় সঙ্কট তৈরি হবে।”

Share if you like

Filter By Topic