Loading...

কয়েক টুকরো রুটির গল্প

| Updated: April 25, 2021 16:12:04


ছবিঃ সংগৃহীত ছবিঃ সংগৃহীত

সিলেট থেকে কিছুদিন হয় ঢাকায় এসেছে আবির। বর্তমানে পুরান ঢাকার সেইন্ট গ্রেগরি স্কুলে পড়ে, থাকে নারিন্দায়। ধোলাইখালের পাশে অবস্থিত এই এলাকাটিতে গড়ে ওঠেছে সারি সারি বাকরখানির দোকান। প্রত্যেকটি দোকান কমপক্ষে তিন দশক পুরনো। আবিরের বাবা তার ছোটবেলায় শ্যামাপ্রসাদ লেন থেকে প্রতিদিন সাইকেলে করে আসতেন নারিন্দায়। তখনো এখানে দুয়েকটা রুটির দোকান ছিল।

রাতের খাবারে আবিরের মা খাসির মাংস ভুনার সাথে পাতলা রুটি নিয়ে এসেছেন। রুটির সাথে মাংস দিয়ে খেতে সে পছন্দ করে। রুটি-মাংস খেতে খেতে সবাই আড্ডা দিচ্ছিল, তখনই প্রসঙ্গ ওঠে পুরান ঢাকার রুটি নিয়ে। তিন দাগ বিশিষ্ট একটি রুটি আবির ঢাকার আসার পর থেকেই দেখে আসছে। রুটিটি দেখতে এমন কেন? আবার নামটাও বেশ অদ্ভুত, ‘বাকরখানি’। সে এই রুটিগুলো সম্পর্কে জানতে চায়। এখান থেকেই প্রসঙ্গের অবতারণা। রুটি নিয়ে কথা হচ্ছে, বলছেন আবিরের দাদু। তার বয়স আনুমানিক ৮০।

“আমি আজ থেকে ৪০ বছর আগে কাজ করতে ভারতে গিয়েছিলাম। সেখানে আমি জেনেছি নানা ধরনের রুটির সম্পর্কে।”

পাতলা রুটি

হরেক রকমের রুটি বানানো হতো ভারতবর্ষে। এর মধ্যে একটি হলো পাতলা রুটি, যেটা আমরা সবাই খেয়ে থাকি। বলা হয়, এই রুটির উৎপত্তি ঘটে মহেঞ্জোদারো সভ্যতার সময়, বর্তমান পাকিস্তানে। যদিও তখন পাকিস্তান-ভারত বলতে কিছু ছিল না, ছিল একটি ভূখণ্ড; যা আমরা বৃহত্তর ভারতবর্ষ হিসেবে চিনি। এই ভারতবর্ষে পাতলা রুটির আগমন ঘটে। অনেকে বলে, প্রথমে সেটি আফ্রিকায় বানানো হয়।

তারপর ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে জাহাজে করে আফ্রিকা থেকে পৌঁছায় ভারতবর্ষে। সবাই জানে, ভারতবর্ষ নানান পদের খাবারের জন্য বিখ্যাত, বিশেষ করে মসলা। তাই ভারতবর্ষে এসে বিভিন্ন অঞ্চলে এই রুটি ছড়িয়ে যায় এবং একেক জায়গায় একেক নামে পরিচিত হতে শুরু হয়। যেমন রয়েছে, তন্দুরের রুটি, নান রুটি, মাসালা রুটি, টানা পরোটা ইত্যাদি। তবে পাতলা রুটির অনুসন্ধানে এর মূল পাওয়া যায় ৫০০০ বছর আগে।

তুর্কি রুটি

রুটির ইতিহাস বলতে গেলে তুর্কিদের বাদ দেওয়া যায় না। ৫০০০ বছর আগে সিন্ধু নদীর তীরে হাতমুখ ধুয়ে আবির ও তার দাদু রওনা দেবেন ১৩০০ বছর আগের আনাতোলিয়ার পথে।

এটি আরেকটি রাজ্য, স্বর্গের মতো সুন্দর। আঁকাবাঁকা পথ, মাঝপথে পাহাড়, পাহাড়ের চূড়া স্পর্শ করে মেঘ, আর তার পা ধুয়ে দেয় কিজিলিমার্ক নদী।

এই নদ-নদী ও পাহাড়কে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল হাজার বছরের পুরাতন আনাতোলিয়ার রাজ্য। আনাতোলিয়ায় পৌঁছেই সেখানে রুটি সম্পর্কে বলতে গেলে সর্বপ্রথম যে নাম মাথায় আসে, সেটি হলো ইউফকা রুটি। এর বয়স প্রায় ১৩০০ বছর।

ইউফকা রুটি বেশ বড়। লাঠিতে পেঁচিয়ে বড় গোলাকৃতির এই রুটি গরম করা উল্টো পাতিলের মতো দেখতে তাওয়ার উপর বানানো হয়। এটি তুরস্ক, লাহোর, পাক-আফগান সীমান্তের পার্শ্ববর্তী এলাকা এবং বাংলাদেশের বড় বড় রেস্তোরাঁয় পাওয়া যায়। সাধারণ কোফতা ও গ্রিল জাতীয় খাবারের সাথে এটি পরিবেশন করা হয়। যদিও বর্তমানে ইউফকা সাদা পাতলা রুটির মতো নয়। এটি এখন বিভিন্ন ধরনের মসলা, তেল ও মিষ্টি জাতীয় উপাদান দিয়ে প্যানকেকের মতো বানানো হয়।

চাপাতি

রুটির ইতিহাস বলতে শুরু করা আবিরের দাদুর গল্পের গাড়ি ৫০০০ বছর আগের মহেঞ্জোদারো, তারপর ১৩০০ বছর আগের আনাতোলিয়া হয়ে এসে পৌঁছেছে ৫০০ বছর আগে সম্রাট আকবরের দরবারে।

আকবরের সভায় ছিলেন নবরত্ন। নবরত্নের এক রত্ন আবুল ফজল। আবুল ফজল আইন-ই-আকবরীতে এক বিশেষ ধরনের রুটির কথা বলেন। এ রুটির নাম- চাপাতি রুটি।

‘চাপাট’বা ‘চপেট’সব একই শব্দ-পরিবারের ভাই-বোন, যার অর্থ চড় মারা। এ ধরনের রুটি বানাতে গিয়ে রুটির চাকার উপর বারবার জোরে জোরে চড় মারা হতো বলে এর নাম এমন হয়।

স্থানভেদে রুটিটি বিভিন্নভাবে বানানো হয়। যেমন, গুজরাটে এটি বেশ মোটা ও শক্ত হয়ে থাকে। নানান ধরনের ভর্তা বা ঝোলের সাথে এই রুটিটি বেশ মানায়। খেতে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর।

দাদুর সাথে স্কুলে যাবার সময় সারি সারি দোকানগুলোতে আবির আবার দেখতে পেল বাকরখানি। ছোটবেলায় সিলেটে থাকায় বাকরখানির সাথে তার পরিচয় ঘটেনি। নারিন্দার বিনত বিবি রাস্তা দিয়ে হেঁটে দু’জন পৌঁছালো ধোলাইখাল দিয়ে নারিন্দা প্রবেশদ্বারে। নারিন্দা এখানেই শেষ, তবে আবিরের প্রশ্ন বা দাদুর গল্পের শেষ নেই। নারিন্দা থেকে লক্ষীবাজারের গ্রেগোরি স্কুলে যেতে আরো কয়েক মিনিট সময় লাগবে। এ সময়ে বাকরখানির গল্প বল্লা হয়ে যাবে।

বাকরখানি

মুর্শিদকুলি খান বাংলায় আসার তার সাথে একজন ঘনিষ্ঠ সঙ্গীও ছিলেন। তিনি সুদূর পারস্য থেকে তার সাথে এসেছেন। মুর্শিদকুলি খান তাকে যোদ্ধা হিসেবে গড়ে তোলেন। মুর্শিদকুলি খান বর্তমান মুর্শিদাবাদে অবস্থান করলেও তার শিষ্যকে পাঠালেন় পূর্ববঙ্গে (বর্তমান বাংলাদেশ)। আর পূর্ববঙ্গে থাকা অবস্থায় তার পরিচয় হয় আরামবাগের এক নর্তকীর সাথে।

অল্প কয়েকদিনের মাঝেই দু’জনের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে যায়। তাদের বন্ধুত্বের মাঝে শত্রু হয়ে প্রবেশ করে কোতোয়াল জয়নুল খান। একদিন সেই বন্ধুকে রক্ষা করতে মুর্শিদকুলি খাঁয়ের শিষ্য জয়নুলের ফাঁদে পা দেন। সিনেমার গল্পের মতো তাদের মধ্যে মারামারি হয়। এক পর্যায়ে জয়নুল পালিয়ে যায়। কিন্তু আশেপাশের মানুষজন ভাবে, মুর্শিদকুলির শিষ্য জয়নুলকে হত্যা করেছেন।

তাই তাকে পাঠানো হয় মুর্শিদকুলির দরবারে। মুর্শিদকুলি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ শাসক। শিষ্যকে অপরাধী হিসেবে দেখেও ক্ষমা করেননি, বরং তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। সিদ্ধান্ত হলো, মৃত্যুদণ্ড হিসেবে তাকে নিক্ষেপ করা হবে ক্ষুধার্ত বাঘের সামনে।

কিন্তু সেই শিষ্যটি বাঘের সাথে লড়াই করে জিতে যায়। ততদিনে জয়নুল আরামবাগের সেই নর্তকীকে হত্যা করে। মুর্শিদকুলি খাঁ’র শিষ্যটি তারপর একা হয়ে যান। অনেকের মতে, তিনি তখন বরিশালে চলে যান এবং সেখানে গিয়ে তিন দাগওলা একটি রুটি বানান। গল্প বলতে বলতে দুজনেই গ্রেগরির গেটে পৌঁছে যায়।

মুর্শিদকুলি খাঁ’র সেই শিষ্যের নাম ছিল আগা বাকর। আর আরামবাগের নর্তকীর নাম ছিল খানি বেগম। এই তিন দাগওলা রুটিটি কয়েকশো বছর আগে বরিশালে (যার পূর্বনাম বাকেরগঞ্জ) আগা বাকর, তার আর খানি বেগমের বন্ধুত্বকে উৎসর্গ করে বানালেন আর দু’জনের নামে এর নাম দিলেন ‘বাকরখানি’। পরবর্তী সময়ে বণিকদের হাত হয় এই রুটি সমুদ্র পাড়ি দিয়ে পারস্য-তুর্কি সহ বিভিন্ন দেশে পৌঁছায়। অমর হয়ে যায় আগা বাকর ও খানি বেগমের কাহিনী।

সেদিন স্কুলে পুরান ঢাকার বন্ধুদের কাছে আবির শুনলো, রুটিটি খেতে কত মজার এবং তারা প্রতিদিন সকালের নাস্তা বাকরখানি দিয়ে করে। চায়ের সাথে, ঝুনা মাংস দিয়ে বা খালি খালিও খাওয়া যায় এই বাকরখানি। জায়গা ভেদে বাকরখানির স্বাদ এবং দেখতে ভিন্ন হয়ে থাকে। ঢাকায় মূলত দুই ধরনের বাকরখানি পাওয়া যায়; একটি হালকা নোনতা স্বাদের, অন্যটি মিষ্টি। সকালের নাস্তায় কিংবা সন্ধ্যার হালকা খাবার সব সময় বাকরখানি সঙ্গী হয়ে থাকে অলিগলিওলা পুরান ঢাকার মানুষের ঘরে ঘরে।

মোঃ ইমরান খান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।

mohd.imranasifkhan@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic