প্রতিকূলতা বানায় উদ্যোক্তা

ক্রাফট এন্ড কিচেন: একজন কাজলের এগিয়ে চলা


তাহসীন প্রাচী | Published: April 03, 2022 17:14:54 | Updated: April 04, 2022 17:39:08


ক্রাফট এন্ড কিচেনের মোহাম্মদী খানম কাজল

মা উঠোনে মোড়ায় বসেছেন, হাতে একটা থালায় সাজানো মিষ্টি। সামনেই খেলছে আট-নয় বছরের ছোট্ট কাজল। হঠাৎ মায়ের দিকে চোখ পড়তেই ছুটে এসে মিষ্টির থালাটি ফেলে দিল সে।

ছোট্ট ডানপিটে কাজল হয়ত পৃথিবীর জটিল হিসাব - নিকাশ তখনো বুঝতে শেখেনি। তবে উচ্চ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মায়ের যে মিষ্টি খেতে বারণ তা নিয়ে সাবধানতার শেষ ছিল না বাড়ির কারোরই। সেই ঘটনার কয়েকদিন পরই মারা যান কাজলের মা। শৈশবের সেই ঘটনার কথা মনে আসলে এখনো চোখের কোণে কিছুটা অশ্রু উঁকি দেয় তার।

মা মিষ্টি খেতে খুব ভালোবাসতেন, কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার জন্য খেতে পারতেন না। আমরাও খেতে দিতাম না। বড় হয়ে খুব মনে পড়ে, মায়ের মিষ্টি খাওয়ার শখটা আমরা পূরণ করতে পারিনি। মায়ের সেই অপূর্ণ শখের কথা মাথায় রেখেই মিষ্টিপ্রেমীদের জন্য আমার ছোট্ট এই উদ্যোগের শুরু, উদ্যোক্তা মোহাম্মদী খানম কাজল তার উদ্যোগের অনুপ্রেরণার গল্প শুরু করেন এভাবেই।

ফেসবুকে তার সম্পূর্ণ চিনিবিহীন মিষ্টির পেজ ক্রাফট এন্ড কিচেন স্বাস্থ্যসচেতন ক্রেতাদের মাঝে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে, সম্প্রতি তার পেজটির প্রশংসা করেছেন নামীদামী তারকারাও।

কাজলের এই উদ্যোগের শুরুটাও ছুল কাঁটায় ভরা, হাজার প্রতিকূলতার মাঝে একাই এগিয়ে চলেন জেদ ও স্থির ধী নিয়ে। তার যাত্রার পেছনের গল্প অনুপ্রেরণা না জুগিয়ে পারে না।

২০২০ সালের এপ্রিল। পৃথিবী জুড়ে তখন অতিমারীর করালগ্রাসে একের পর এক দুঃসংবাদ ভারী করছে আকাশ। অগণিত মানুষ হারিয়েছেন তাদের প্রিয়জনকে, বাক্স-পেটরা গুটিয়ে শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে পাড়ি জমাচ্ছেন অনেকে। আকস্মিক চাকরিচ্যুতি - ছাঁটাইয়ের মাঝে জীবিকার সন্ধান কঠিন হয়ে যাচ্ছে। জীবনযুদ্ধের এই কঠিন মোড়ে এসে শত প্রতিকূলতার মাঝেও ঘুরে দাঁড়িয়েছেন অনেকে, শুরু করেছেন নিজেদের ছোট একেকটি উদ্যোগ।

কাজল তখন চাকরি করতেন রাজধানীর এক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে। শহরজুড়ে লকডাউনের মাঝেও তাদের কাজ অব্যাহত থাকে। ছুটি নিয়ে বাড়ি ঠাকুরগাঁও চলে যান কাজল, ঢাকায় তখন মাথা গোঁজার ঠাঁই ধরে রাখাও দুষ্কর হয়ে পড়েছে। তাও বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়, যেন এক অকূল পাথারে পড়লেন তিনি।

তারপর করোনার বিপদকালে একাই ঢাকায় রয়ে গেলেন কাজল, বাড়ি ফেরেননি। তার বাবা হৃদরোগের জটিলতায় ভুগছেন, বাবার ওষুধপত্রের এক অংশের খরচ তখন তিনি বহন করেন। উপার্জনের পথ হারিয়ে তখনও তিনি হাল ছাড়েননি; কিছু একটা করবেন এমন লক্ষ্যে রয়ে গেছেন ঢাকায়।

কাজলরা তিন বোন। মায়ের মৃত্যুর পর বাবার হাতেই বড় হয়েছেন তারা। বাবা প্রতিদিন অফিস শেষ করে জলদি বাসায় ফিরে আসতেন, কারণ তিনি জানতেন তিনি না ফেরা পর্যন্ত আমরা তিন বোন কিছুই খাব না। বাবার শিক্ষা, অনুপ্রেরণা আমাদের মায়ের শোককে শক্তি বানিয়ে এগিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে আজীবন। মাথা নোয়ানোর শিক্ষা কোনোদিনই পাইনি, বলেন কাজল।

বাবা আব্দুল কাদের খান, যার অনুপ্রেরণা ও সাহসে এগিয়ে চলেছেন কাজল



অর্থকষ্টে পরে দিনের পর দিন না খেয়ে কাটিয়েছেন এক রুমের এক ঘরে, বাবার দুশ্চিন্তা যাতে না হয় জানাননি বাবাকেও। এরই মাঝে মাথায় তার খেলছে উদ্যোক্তা হওয়ার ভাবনা, কি করা যায় যা হবে নতুন কিন্তু একই সাথে লাভজনক?

সিদ্ধান্ত নিলেন মিষ্টি বানাবেন। তবে সাধারণ মিষ্টি নয়, সুগার ফ্রি মিষ্টি। মায়ের অসুস্থতা তাকে ভাবিয়েছে, সেই জেদ থেকেই সিদ্ধান্ত নিলেন সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যসম্মত মিষ্টি বানাবেন তিনি, যাতে চিনির লেশমাত্র থাকবে না। স্বাস্থ্যসচেতন ও ডায়াবেটিস আক্রান্ত মানুষেরাও যাতে নির্ভয়ে চাখতে পারেন মিষ্টির স্বাদ।

এক শুভাকাংক্ষী আত্মীয় প্রথম পাঁচ হাজার টাকা তুলে দেন কাজলের হাতে। তা দিয়েই শুরু করে দেন আর প্রথমবারই মূলধনের তিনগুন লাভের মুখ দেখেন তিনি। ব্যস! এরপর আর ফিরে তাকাননি।

যদিও কানের পাশে বারবার বলছিলেন পরিচিতজনেরা, এই ব্যবসা টিকবে না, কাজল একা একা পারবেন না এটা চালাতে। সহজ নারীসুলভ কোনো ব্যবসা করতে, যাতে ঝুঁকি কম।

কিন্তু কাজল নাছোড়বান্দা। তিনি বলেন, একই রেসিপি আমি বারবার বানিয়েছি। অনেকবার ব্যর্থও হয়েছি। কিন্তু জেদ ছিল যে এটাই করব, নিজের কাজকে আরো ভালো করতে হবে। আমার মনে হয়, জেদ আর একাগ্রতা, কোনো কিছুতে হাল না ছাড়া একসময় না একসময় সাফল্য আনবেই।

২০২১ সালের রমজান মাসে তার ব্যবসার টার্নওভার প্রায় লাখের কাছাকাছি পৌঁছে। তার পেজের কর্মী বলতে আছেন তিনি নিজে, দুইজন সাহায্যকারী এবং এক-দুইজন ডেলিভারি বয়। তারা ঢাকার কয়েকটি এলাকায় হোম ডেলিভারি করেন।

বাংলাদেশে সম্পূর্ণ চিনিমুক্ত মিষ্টির বৈচিত্র্যময় সমাহার আগে তেমন একটা দেখা যায়নি, বেশিরভাগই চিনির বিকল্প হিসেবে ডায়াবেটিক চিনি ব্যবহার করে থাকে। তাহলে কাজলের মিষ্টিগুলোর মূল মিষ্টিকারন উপাদান কোনটি?




ক্রাফট এন্ড ক্রেজের চিনিমুক্ত মিষ্টি


যেহেতু আমি মিষ্টি বানাতে কোনো চিনি ব্যবহার করি না, এর বিকল্পের ব্যাপারে আমি বেশ সতর্ক। কারণ আমার খাবারের ক্রেতারা স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতিশ্রুতির পূরণ চান। আমার মিষ্টিতে আমি খেজুর, বিভিন্ন বাদামের প্রাকৃতিক মিষ্টতাকে ব্যবহার করি। বিভিন্ন মাত্রায়, বিভিন্ন কায়দায় এদের সংমিশ্রণে এসব মিষ্টি তৈরি হয়, বলেন কাজল।

যেসব ক্ষেত্রে খেজুর বা বাদাম ব্যবহার করা যায় না, যেমন ডিমের মিহিদানা বা বিভিন্ন হালুয়া, সেগুলোয় তিনি ব্যবহার করেন স্টেভিয়া গাছের পাতার নির্যাস। এই নির্যাস চিনির চেয়ে ২৫০ থেকে ৩০০ গুণ বেশি মিষ্টি। এর মধ্যে কোনো শর্করা কিংবা ক্যালরি নেই।

প্রতিকূলতার মুখে একাই দুর্গ

করোনার মাঝে একজন উদ্যোক্তা হিসেবে যাত্রা শুরু করার পথে পথে ছিল কাঁটা। কাঁচামাল কেনা থেকে শুরু করে ডেলিভারি একা কাজল সামলাতেন সবটা। কথার ফাঁকে ফাঁকে ফোন বেজে উঠছিলো তার, ক্রেতার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন ধৈর্যের সাথে।

খাবার ক্রেতার হাতে পৌঁছাতে সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়, অনেক সময় ডেলিভারির কাজে দেরি হয়ে যায়। খাবারও গরমের জন্য কিছুটা গলে যাওয়ার ভয় ছিল, তাই সেসব দিক বিবেচনায় প্যাকেজিং ও সংরক্ষণের বিষয়ে আরো মনোযোগ দেই, বলেন কাজল।

পেজ সামলানো থেকে খাবার তৈরি, সংরক্ষণ, প্যাকেজিং কাজল করেছেন একাই। শুরুর দিকে সারাদিন রাত কাজ করতে হয়েছে অর্ডারের চা্প সামলাতে। শারীরিক ধকল কাটিয়েছেন মানসিক জোর দিয়ে, এটাই কাজলের মনোভাব।

অনেকেই বলেছিল এই কাজ আমাকে দিয়ে হবে না, একা একা করে ওঠা, এতদিক সামলানো কিভাবে পারব? মাঝে মাঝেই মনে হতো এবার আর পারছি না, কিন্তু হাল ছেড়ে দেইনি। সব প্রতিকূলতার মুখে একাই দাঁড়িয়েছেন দুর্গ হয়ে।

কাজলের সাহস হিসেবে থেকেছেন তার পরিবার, বিশেষত বাবা আবদুল কাদের খান। তার বাবাও টুকটাক মেয়ের সাথে বসে লাড্ডু বানান, প্রেরণা যোগান হাল না ছাড়ার।

সম্প্রতি নিজের ফেসবুক পেজ থেকে কাজলের ফেসবুক পেজ ক্রাফট এন্ড কিচেনের প্রশংসা করেছেন মোঃ আব্দুন নূর তুষার। তিনি লিখেছেন কাজলের এই উদ্যোগের কথা, তার নেপথ্যের গল্প। তারকা থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মাঝে কাজলের পেজের চিনিমুক্ত মিষ্টি বেশ পরিচিতি নাম।

ক্রাফট এন্ড কিচেনের মিষ্টিগুলোর নাম হয়ত বিদেশি, কিন্তু উপকরণ ও বানানোর কায়দার প্রায় সবটাই দেশি, এমনটাই জানান কাজল।

মিষ্টিগুলো তৈরিতে বাংলার আদি ও ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি তৈরির প্রক্রিয়া ও উপকরণই ব্যবহার করেন তিনি। তার পেজের সবচেয়ে জনপ্রিয় কিছু মিষ্টান্নের নাম পিনাট লাড্ডু, ড্রাই নাটস বরফি, ডেটস লাড্ডু, ডার্ক চকোলেট ডেটস এন্ড নাটস লাড্ডু, কোকোনাট ডেটস লাড্ডু, চকোলেট কোকোনাট বাইটস।

সুন্দর একেকটি আল্পনা আঁকা বাক্সে প্যাকেজিং করেন তার মিষ্টিগুলো, প্রিয়জনকে উপহার দেন অনেকেই তাই বাক্সগুলো সাজিয়ে দেয়ারও সুযোগ রয়েছে।




এমন আলপনা আঁকা বাক্সেই মিলবে বাহারি সব চিনিবিহীন মিষ্টি




প্রাণোচ্ছ্বল, হাসিখুশি একজন কাজল শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে জীবনের অন্ধকার বিপদের দিনগুলো কাটিয়েছেন নিজের মনোবল ও জেদের জোরে। শূন্য থেকে শুরু করে দাঁড় করিয়েছেন নিজের একটি ছোট ব্যবসা, যার মাধ্যমে বাংলাদেশে ভিন্ন ধারার মিষ্টিকে সেই ঐতিহ্যের মিশেলে বহন করে নিতে চান দেশে বিদেশে, কিছুটা না হয় ব্যতিক্রম কায়দাতেই।

প্রতিকূলতা কিভাবে উদ্যোক্তা গড়ে, মোহাম্মদী খানম কাজল তার এক অসাধারণ উদাহরণ।

তাহসীন প্রাচী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করেছেন।

amipurbo@gmail.com

Share if you like