সবুজ ঘাসে ভরা মাঠে কোথাও ৭-৮ জন, কোথাও ১৫-২০ জনের জটলা। গোল হয়ে বসে আছে সবাই। গোলের মাঝে কেউ পত্রিকার উপর, কেউ আবার প্লেটে খাবার সাজিয়ে রেখেছে। এমন বেশ কিছু জটলায় পুরো মাঠ ভরে গেছে। সবাই অপেক্ষা করছে মাগরিবের আজানের। বুঝতে আর বাকি নেই কেন এই অপেক্ষা। পবিত্র রমজান মাস চলছে। ক্লাস কিংবা পরীক্ষা থাকায় অনেকেই থাকছেন ক্যাম্পাসে। সেহেরিটা কোনোরকম সেরে নিলেও ইফতারটা যেন বন্ধুরা মিলে করা চাই-ই চাই। সেজন্যই খোলা মাঠে বন্ধুদের সাথে ইফতারের আয়োজন।
একসাথে ইফতার করার এমন দৃশ্য চোখে পড়ে দেশের প্রায় সব কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বা খেলার মাঠে, শহীদ মিনারে, মুক্তমঞ্চে কিংবা হলের ছাদে একত্রে ইফতার যেন ভুলিয়ে দেয় পরিবারের সাথে ইফতারের কথা।
পরীক্ষা থাকায় এবার রোজায় ক্যাম্পাসে আছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানজিনা আমান তানজুম। এবার রোজায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস - পরীক্ষা চলছে। প্রথমবারের মতো পরিবার থেকে দূরে রোজা পালন করছেন তানজুম। তবে বিভাগ এবং হলের বন্ধুদের সাথেই ইফতার করেন তিনি, পরিবারকে মিস করলেও তাই একটা নতুনত্ব উপভোগ করছেন। ইফতারকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে শিক্ষার্থীদের ইফতার আয়োজন এক উৎসবমুখর আবহের সৃষ্টি করে ক্যাম্পাসে, যা বেশ উপভোগ্য মনে হয়েছে তার কাছে।
ক্যাম্পাসে ইফতার নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী জায়েদ বলেন, একটা ভিন্ন তবে উপভোগ্য অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে ভালোই লাগছে। পরিবারের সাথে থেকে বাহারি খাবার না খাওয়ায় একটা অপূর্ণতা থেকেই যায়। ইফতারিতে কি খাবো না খাবো, কখন ইফতার বানাবো এরকম বিভিন্ন বিষয় মাঝে মাঝে চাপের কারণ হয়ে যায় যা পরিবারের সাথে থাকলে ততটা অনুভব হতো না।
ক্যাম্পাসের বন্ধুদের এমন ইফতারে মুসলিম শিক্ষার্থী ছাড়াও অংশ নেয় অন্য ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরাও। এতে ইফতার যেন হয়ে ওঠে অসাম্প্রদায়িকতার এক অনন্য উপমা।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রূম্পা নন্দী ছোটবেলা থেকেই বন্ধুদের সাথে মিলেমিশে সব উৎসবেই অংশগ্রহণ করেন। ক্যাম্পাসে ইফতার নিয়ে তিনি বলেন, আমার মনে আছে ছোটবেলা ইফতার পার্টি করার জন্য বাবার থেকে টাকা নিতাম। ঈদে ঘুরতে যাওয়ার জন্য বাবা জামা কিনে দিতেন, টাকা দিতেন। রোজার মাসে প্রায় প্রতিদিনই একসাথে ইফতার করতাম। এখনো করি।
আবার পুজোর সময় ওদের (বন্ধুদের) জন্য নাড়ু বানিয়ে নিয়ে যেতাম। একসাথে ইফতার করাটা আমার কাছে অনেকটা পিকনিকের মতো লাগে। বন্ধুরা মিলে সবার থেকে টাকা তুলে ইফতারির বাজার করা হয়, বলেন রূম্পা।
তিনি আরও বলেন, আসলে দিন শেষে আমরা সবাই মানুষ। ভালো লাগা, খারাপ লাগা, সুখ, দুঃখ, রাগ, অভিমান, অনুভূতি এগুলো সবারই আছে। শুধু ধর্মের অজুহাত দেখিয়ে কেউকে আলাদা ভাবার কিছু নেই। সবার সাথে মিলেমিশে থাকার মজাই আলাদা। আমার বন্ধুরাও কখনো আমাকে আলাদা করে দেখেনি। আর যার যে মাধ্যম ভালো লাগে যে যেই মাধ্যমে বিশ্বাস করে সে সেই ভাবে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকবে। এটা সবার ব্যক্তি স্বাধীনতা।
ক্যাম্পাসে যে শুধু বন্ধুরা মিলে ইফতার করে এমনটাও নয়। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, আঞ্চলিক সংগঠনের সদস্যরাও একসাথে মিলে ইফতার করেন। এতে পারষ্পরিক সৌহার্দ্য অনেকগুণ বেড়ে যায় বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাহিম আহনাফ। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি অনেকগুলো সংগঠনের সাথে জড়িত। রোজা এলেই এক এক করে সব সংগঠন ইফতার আয়োজন করে। আমরা সবাই মিলে চাঁদা দিয়ে সেসবে অংশগ্রহন করি। সত্যি বলতে সব ধরণের আয়োজনই আমার কাছে আনন্দের। আর সেটা যদি হয় ইফতার, তাহলে তো কথাই নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনিরুল হক নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসেন। প্রত্যেকেই একে অন্য থেকে সাংস্কৃতিকভাবে কিছুটা আলাদভাবে বেড়ে উঠেছেন। তবুও রোজায় ইফতারকে কেন্দ্র করে অনেকের সাথে পরিচয়ের সুযোগ তৈরি হয়।
ক্যাম্পাসে ইফতারে খাবারের আয়োজনেও থাকে বৈচিত্র্য। দোকান থেকে কেনা বিভিন্ন ফল, খেঁজুর, ছোলা, পিঁয়াজু, আলুর চপ, বেগুনি, জিলাপির সাথে কখনও বন্ধুদের বাসা কিংবা মেস থেকে রান্না করা খাবারও থাকে ইফতারিতে। কেউ আবার মাঠে বসেই শরবত বানান।
বাহারি ইফতারের আয়োজন না থাকলেও বন্ধুদের সাথে ক্যাম্পাসে আড্ডায় আড্ডায় ইফতার একদিকে যেমন পরিবার থেকে দূরে থাকার কষ্ট ভুলিয়ে দেয়, অন্যদিকে নিজেদের মাঝে পারষ্পরিক হৃদ্যতা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। সব ধর্মের সহপাঠীদের সাথে মিলে ইফতার যেন হয়ে ওঠে সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ।
ফরহাদুর রহমান কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী।
farhad.mcj1@gmail.com