"হ্যাঁ, আগে বিখ্যাত অনেকেই আসতো, লেখক, কবি আরো অনেকে, তবে নাম মনে নেই"- কথাগুলো বলছিলেন অনিল মিত্র, যিনি প্রায় পাঁচ দশক ধরে কাজ করছেন পুরান ঢাকার বিখ্যাত ক্যাফে কর্নারে।
বাংলাবাজারের মোড় দিয়ে সোজা হেঁটে গেলে সরু রাস্তায় চলাচল করা রিকশার ফাঁকে ফাঁকে দেখা মিলবে বইয়ের দোকান। অযত্নের সাথে বইয়ের দোকানগুলো দাঁড়িয়ে আছে ব্যস্ত নগরী ঢাকার বুড়িগঙ্গার কোল ঘেঁষে। সামনের রাস্তাটির নাম নর্থ ব্রুক হল রোড, এখানেই অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ক্যাফে কর্নার। অনিল বাবুর মতে যেখানে আসতেন কবি-সাহিত্যিকসহ আরো অনেকেই।
শুরুর গল্প
ঢাকার ঐতিহ্যের চিহ্নবাহী পুরাতন যত রেস্তোরাঁর খোঁজ মেলে, তার মধ্যে ক্যাফে কর্নার অন্যতম। এর যাত্রা শুরু হয় পাঁচ দশকের থেকেও বেশি সময় আগে, ষাটের দশকের মাঝামাঝি পর্যায়ে। অনিল বাবু বলেন, "তখন এর জায়গা ছোট ছিল, সন ১৯৬৫। হরিপদ ঘোষ এই হোটেল শুরু করেন। পরে জায়গা সম্প্রসারিত করা হয়।"
রহিম, যিনি এই ক্যাফেতে ত্রিশ বছর ধরে কাজ করছেন, তিনিও স্মরণ করলেন হরিপদ ঘোষকে। তিনি বলেন, "আমি যখন আসি, তখন সবাই মিলে এই দোকানের কর্মচারী দশ-বারো জন। শুরুর দিকেও শুনেছি, এমনই ছিল। অনিল বাবু বর্তমানে এই হোটেলের সবচেয়ে পুরাতন লোক। উনি বর্তমান মালিকেরও আগে থেকে এখানে কর্মরত।"
একজন অনিল মিত্র
অনিল বাবু আর ক্যাফে কর্নার একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে ৭৬ সন থেকে। জীবন সফরে অনেকটা লম্বা সময় পাড়ি দিয়ে এখন হয়েছেন স্মৃতির কাছে বন্দি।
তার ছোটবেলা কেটেছে কুমিল্লা শহরে। ক্যাফে কর্নারের সাথে তার যাত্রার কথা জানান তিনি, "কুমিল্লায় বড় হই। তারপর আসি নারায়ণগঞ্জে। সেখানে আমার হোমিওপ্যাথির দোকান ছিল। যুদ্ধের পর অন্য দশজনের মতো কাজ ও ভাগ্যের সন্ধানে ঢাকায় আসি। তখন আমার শ্যালকের মাধ্যমে ক্যাফে কর্নারের সাথে যুক্ত হই। সময়টা তখন ৭৫ কিংবা ৭৬ সনের হবে।"
ধুলোয় মাখা চশমার মতো ঝাপসা হয়ে আসছে অনিল বাবুর স্মৃতিগুলো। তাই নিজের জীবন ও ক্যাফে কর্নার নিয়ে বলতে গেলে দিন-ক্ষণ-সময়ের হিসাবটা হয়ে যায় সেই ধুলো পড়া অস্পষ্ট চশমার মতো।
খাবার মূল্যের পরিবর্তন
শুধু ঐতিহ্য নয়, খাবারের আকর্ষণে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে এই রেস্তোরাঁয় খেতে। খাবার তালিকায় আছে মোরগ পোলাও, আলু চপ, চিংড়ি ফ্রাই ছাড়াও অনেক কিছু, তবে ক্যাফে কর্নারের মূল আকর্ষণ হলো বিখ্যাত ক্রাম চপ।
বর্তমান বাবুর্চি মুহসীন বলেন, "এই ক্রাম চপ ঢাকায় কেন, বাংলাদেশের আর কোথাও পাবেন না। ক্রাম চপ একটাই এবং সেটা এই হোটেলের।"
সময়ের সাথে খাবার তালিকাতেও দেখা যায় ব্যাপক পরিবর্তন। নব্বই সালে যুক্ত হওয়া কর্মচারী রহিম, অনায়াসেই বলেন তার সময়ের খাবারের মূল্য তালিকা সম্পর্কে।
তিনি বলেন, "৯০ কি ৯১ এর সময় হবে, তখন আলুর চপ এক টাকা, কাটলেট পাওয়া যেত পাঁচ টাকায় আর পরোটা ৫০ পয়সা সাথে ডাল এক টাকায়। ক্রাম চপের মূল্য তখন ১৮ টাকা।"
বর্তমানে এগুলো সব বেড়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১০ টাকা, ৪০ টাকা, ১৫ টাকা (পরোটা ভাজি/ডাল) এর জন্যে। আর ক্রাম চপ ১৪০ টাকা।
ক্রাম চপ ও বাবুর্চিদের পরম্পরা
"খাসির মাংসের কিমা করে তেল আর বিস্কুটের গুঁড়া দিয়ে ভালোভাবে মাখিয়ে ডুবা তেলে কড়কড়া করে ভাজা হয়। তারপর লালচে বাদামি হয়ে গেলে নামিয়ে ফেলা হয়।" ক্রাম চপ তৈরি করার সময় কথাগুলো বলছিলেন বাবুর্চি মুহসীন। তিনিও বহুদিন ধরে কাজ করছেন এই হোটেলে, তা প্রায় বছর কুড়ি ছাড়িয়েছে।
তারও আগে কাজ করে গেছেন দুজন বাবুর্চি। অজিত ও পিটার।
তবে বিখ্যাত ক্রাম চপের সূচনাকারী জোসেফ বাবুর্চি। তার হাতেই ক্রাম চপের যাত্রা শুরু হয়, যার ফলে ক্যাফে কর্নার তার অনন্য পরিচয়টি পায়। তাই সাধারণ হোটেল থেকে ঐতিহ্যবাহী ক্যাফে কর্নারে পরিণত হওয়ার পেছনে ক্রাম চপের উদ্ভাবক জোসেফ বাবুর্চিকে কৃতিত্ব দেওয়াই যায়।
অনিল বাবুর মতে, ক্রাম চপটি জোসেফের হাতে শুরু হয়। তারপর অজিত ও পিটারের পর বর্তমানে মুহসীনের হাতে পৌঁছায়।
ক্যাফে কর্নার সম্পর্কে খেতে আসা লোকজনের কথা:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাকিব শরীফ পুরান ঢাকায় সুযোগ পেলেই ঘুরে আসেন এবং প্রতিবার ক্যাফে কর্নারে তার যাওয়া হয়। তিনি বলেন, "এই হোটেলটি অনেক পুরোনো। অনেকের মুখেই এর কথা শুনেছি। প্রথমবার আসায় নস্টালজিক অনুভূতি হয়েছিল। কেননা, হোটেলের চেয়ার, বেঞ্চ, জানালার পাট সবকিছুতে পুরান একটা ছাপ পাওয়া যায়। হোটেলের এই পুরাতনত্ব আমার ভালো লাগে। তাছাড়া, ক্রাম চপ আমার খুব পছন্দের। হোটেলের কর্মচারী রহিম ভাই ও অনিল বাবুও অনেক মিশুক। পুরান ঢাকার বন্ধুদের নিয়ে আগে প্রায়ই এখানে আসা হতো। সময় ও সুযোগের অভাবে এখন তেমন আসা হয় না। তবে যখনই লাল কুঠি, প্যারিদাস রোড বা বাংলাবাজার আসি, ক্যাফে কর্নারে আমার আসা হয়।"
প্রবীণ মোতাহের ইসলাম থাকেন শিরিস দাস লেনে, মাঝেমধ্যেই এসে ঘুরে যান এখানে। তার যৌবন থেকে বৃদ্ধ হওয়া পর্যন্ত লম্বা সময় অতিক্রম করেন ঢাকায়। তিনি বলেন, "এই হোটেলের চেয়ার-টেবিলে বসে অনেক আড্ডা দিয়েছি। ৫ টাকাও তখন অনেক। ভরপেট খেয়েও কিছু বাকি থাকতো। পরিচিত লোকজন ও বন্ধুদের সাথে প্রায়ই আসতাম এখানে। এখন অনেকেই নেই, তবে আমি ঠিকই চলে আসি সু্যোগ করে।"
হাতবদল
"৯৬ সালে হরিপদ বাবু ক্যাফে কর্নারের মালিকানা হেদায়েত (সোলায়মান মল্লিকের) হাতে দিয়ে যান। এরপর থেকে তিনি কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং সেখানেই মারা যান। বর্তমানে তার ছেলেরা কলকাতার মানিকতলার বিবেকানন্দ রোডে ক্যাফে কর্নার নামেই হোটেল চালিয়ে যাচ্ছেন।"
অনিল বাবু, কর্মচারী রহিম, বাবুর্চি মুহসীন- তারা সবাই ক্যাফে কর্নার পরিবারের পুরাতন সদস্য। সময়ের বিভিন্ন গলি থেকে এসে তারা যুক্ত হয়েছেন ক্যাফে কর্নারে। রয়ে গেছেন এখানেই, এই নর্থ ব্রুকের কোণে।
অনিল বাবু বাইরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলেন, "মুড়ির টিনে (মিনি বাসে) করে এই এলাকায় লোকজন আসতো। তখন অনুন্নত ছিল, এখন পরিবর্তন হয়েছে, উন্নত হয়েছে। তবে মানুষ বহুদূর থেকে এখনও আসে। এটি পরিবর্তন হয়নি।"
মোঃ ইমরান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।