ভারতে পাওয়া করোনাভাইরাসের ডেল্টা ধরনের আগ্রাসী বিস্তারের মধ্যে বাংলাদেশে এক সপ্তাহের ব্যবধানে শনাক্ত ও মৃতের সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিকে দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ‘তৃতীয় ঢেউয়ের শুরু’ বলতে চান সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন।
গত ১৯ জুন পর্যন্ত এক সপ্তাহে ২৩ হাজার ৫৪১ জনের কোভিড-১৯ শনাক্ত হওয়ার তথ্য দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তার পর থেকে ২৬ জুন শনিবার পর্যন্ত এক সপ্তাহে নতুন করে আরও ৩৫ হাজার ১১১ জন শনাক্ত হয়েছে।
অর্থাৎ মহামারীর ২৪তম সপ্তাহের তুলনায় ২৫তম সপ্তাহ শেষে করোনাভাইরাস শনাক্তের সংখ্যা ১১ হাজার ৫৭ বা ৪৯ দশমিক ১৫ শতাংশ বেড়েছে। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
একইভাবে ২৪তম সপ্তাহে কোভিড-১৯ রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৩৯৫, যা পরবর্তী এক সপ্তাহে হয়েছে ৫৮৭। অর্থাৎ আগের সপ্তাহের চেয়ে মৃত্যু সংখ্যা ১৯২ বা ৪৮ দশমিক ৬১ শতাংশ বেড়েছে।
উপরন্তু নমুনা পরীক্ষা ও সুস্থতার সংখ্যা যে সে হারে বাড়েনি, তাতেও করোনাভারাসের সংক্রমণ ও মৃত্যু পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র ধরা পড়ে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে শনিবার যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তাতে দেখা যায়, ২৫তম সপ্তাহে নমুনা পরীক্ষা ১৮ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং সুস্থ হওয়ার সংখ্যা ২৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেড়েছে।
১৯ জুন এক সপ্তাহে নমুনা পরীক্ষা হয় এক লাখ ৪৯ হাজার ১৪০টি এবং সুস্থ হওয়ার সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ১২২, যেখানে ২৬ জুন এক সপ্তাহে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় যথাক্রমে একলাখ ৭৬ হাজার ৮৭৮ ও ২০ হাজার ৭০৮।
কোভিড পরিস্থিতি নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা তৃতীয় ঢেউয়ে ঢুকেছি, তার আরেকটি ‘ইন্ডিকেটর’ হলো আমাদের সর্বাত্মকভাবে যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে। এটাকে দ্বিতীয় ঢেউয়ের অংশ বলা যাবে না।
“যদি এটা কমে যেত এবং কমে দ্রুত দ্বিতীয় ঢেউয়ের কাছাকাছি উঠে যেত তাহলে দ্বিতীয় ঢেউয়ের অংশ বলা যেত। কিন্তু এটা ধীরে ধীরে চূড়ার দিকে উঠেছে।”
এই অবস্থা কমপক্ষে আরও দুই সপ্তাহ চলার পূর্বাভাস দিয়ে তিনি বলেন, “যেদিন থেকে আমরা সব ধরনের ‘পাবলিক মুভমেন্ট রেস্ট্রিকটেড’ করব তার দুই সপ্তাহ পর পর্যন্ত এই গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী থাকবে।
“শীর্ষবিন্দুতে ওঠার পর আস্তে আস্তে নামার একটা আশা আছে। যদি আমরা সব কিছুতে নিয়ন্ত্রণ আনতে পারি।”
করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা হু হু করে বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোববার পর্যন্ত ১৫ দিনে এক হাজার রোগীর মৃত্যুতে বাংলাদেশে মৃতের সংখ্যা ১৪ হাজার ছাড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার পর্যন্ত এক দিনে দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে ৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, শনাক্ত হয়েছে ৪ হাজার ৩৩৪ জন নতুন রোগী।
সকাল পর্যন্ত দেশে মৃতের সংখ্যা বেড়ে হলে ১৪ হাজার ৫৩; মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে হল ৮ লাখ ৮৩ হাজার ১৩৮।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিবেশী ভারত থেকে দেশের সীমান্ত জেলাগুলোতে করোনাভাইরাসের ডেল্টা ধরন ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি খারাপ খুলনা বিভাগে। সেখানে দৈনিক শনাক্তের এই হার থাকছে ৪০ শতাংশের বেশি; রাজশাহীতে থাকছে ২০ শতাংশের কাছকাছি।
মে মাসের শুরুতেই ভারত থেকে আসা তিন বাংলাদেশির দেহে করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ডেল্টা শনাক্ত করা হয়। এরপর রাজশাহী ও খুলনার ভারত সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে নতুন করে সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে।
জুনের শুরুতে আইইডিসিআর জানায়, দেশে করোনাভাইরাসের ধরনটির সামাজিক বিস্তার বা কমিউনিটি ট্রান্সমিশন ঘটেছে।
সংক্রমণের প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউয়ে ঢাকার পরিস্থিতিই সবচেয়ে খারাপ ছিল। কিন্তু ডেল্টা ধরন ছড়াতে শুরু করার পর এখন উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলাগুলোর পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠছে।
পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ ধারণ করায় সংক্রমণ রুখতে সরকারকে আবারও বিধি-নিষেধ আরোপ করতে হচ্ছে। সোমবার থেকে সীমিত পরিসরে এবং ১ জুলাই থেকে কঠোর লকডাউন দিয়ে দেশকে প্রায় অচল রাখা হবে।
জনসাধারণকে বিধিনিষেধ মানাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়মিত বাহিনীর সঙ্গে প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকেও মাঠে নামানোর প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার।
শনিবার পর্যন্ত করোনাভাইরাসে বিশ্বে মৃত্যু ৩৯ লাখ ছাড়িয়েছে, এই সময়ে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা পৌঁছেছে ১৮ কোটিতে।
বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়েছিল গত বছর ৮ মার্চ; প্রথম রোগী শনাক্তের ১০ দিন পর গত বছরের ১৮ মার্চ দেশে প্রথম মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
প্রথম মৃত্যুর আড়াই মাস পর গত বছরের ১০ জুন মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ছাড়ায়।
এরপর ৫ জুলাই ২ হাজার, ২৮ জুলাই ৩ হাজার, ২৫ অগাস্ট ৪ হাজার, ২২ সেপ্টেম্বর ৫ হাজার ছাড়ায় মৃতের সংখ্যা।
এরপর কমে আসে দৈনিক মৃত্যু। ৪ নভেম্বর ৬ হাজার, ১২ ডিসেম্বর ৭ হাজারের ঘর ছাড়ায় মৃত্যুর সংখ্যা। এ বছরের ২৩ জানুয়ারি ৮ হাজার এবং ৩১ মার্চ মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৯ হাজার ছাড়ায়।
সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর পর ১৫ দিনেই এক হাজার কোভিড-১৯ রোগীর মৃত্যু ঘটলে গত ১৫ এপ্রিল মৃতের মোট সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
এর পরের এক হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটাতে মাত্র দশ দিন সময় নেয় করোনাভাইরাস; মোট মৃতের সংখ্যা ১১ হাজার ছাড়িয়ে যায় ২৫ এপ্রিল।
তার ১৬ দিন পর ১১ মে করোনাভাইরাসে মৃত্যু ১২ হাজার ছাড়িয়ে যায়। তার এক মাস পর ১১ জুন তা ১৩ হাজার ছাড়িয়েছিল।
দিনে মৃত্যুর রেকর্ডও হয়েছে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ে। ১৯ এপ্রিল ১১২ জনের মৃত্যুর খবর দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সে সময় টানা চার দিন মৃত্যুর সংখ্যা ছিল একশর ওপরে।
শুক্রবার আবার দৈনিক মৃত্যু শত ছাড়িয়ে ১০৮ এ গিয়ে পৌঁছায়। শনিবার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু হয়েছে ৭৭ জনের।
