Loading...

বিশ্বমারি কোভিড বিশ্বব্যবস্থা ও রাজনীতিতে গভীর ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত দুটি বই এ নিয়ে আলোকপাত করেছে

কোভিড এবং নয়া বিশ্ব ব্যবস্থা

| Updated: September 29, 2021 18:36:29


অ্যাডাম টুজ অ্যাডাম টুজ

হতবাক, বিহ্বলতা এবং বিস্ময়কে সম্বল করে জরুরী পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে অর্থনীতি, সমাজ বা রাজনীতির বড়সড় দিক পরিবর্তনের অনুসন্ধান করতে হয়েছে। ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদরা কি একে নিছক অসাধারণ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করবেন নাকি একটি মোড় পরিবর্তন হিসেবে গণ্য করবেন, পাশাপাশি সে ভাবনাও মগজে খেলে যাচ্ছে। বিশ্বমারি চলছে গত ১৮ মাস ধরে।

কিন্তু এরই মধ্যে মনে হচ্ছে “চিরকালীন বিশ্বমারির” পূর্ণগ্রাসে পড়েছে দুনিয়া। দুটি প্রান্তিক ভাবনার দোলাচলে এখন বিরামহীন আবর্তন চলছে। এ ভাবনার এক প্রান্তে রয়েছে, বিশ্বমারি সবকিছুই পাল্টে দেবে। অপর প্রান্তবাসীরা মনে করছে, না কিছুই হবে না, আবার পুরানো পৃথিবীতে ফিরে যাবো।

এই দুই প্রান্তিক ভাবনার মাঝামাঝি কোথাও বিরাজ করছে যথার্থ সত্য। প্রযুক্তির অগ্রসরধারা পর্যবেক্ষণ করে বিখ্যাত কল্প-বিজ্ঞান লেখক আর্থার সি ক্লার্ক বলেছিলেন, “স্বল্প মেয়াদে প্রযুক্তির প্রভাবকে বড় করে দেখছি আমরা, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এ প্রভাবকে দেখছি খাটো করে।” তাঁর এমন আখ্যানের করোনাভাইরাস সংস্করণ, মনে হয়, আশু প্রয়োজনীয় হয়ে দেখা দিয়েছে।

২০২০ সালে যদি আপনি বিত্তবান ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকা কিংবা চীনেই থাকতেন, করোনা বিশ্বমারির করাল প্রভাব নিয়ে ভাবতে হলে আপনি কঠোর পরিস্থিতিতে সাথে টক্কর খেতেন। এই প্রভাবের ধাক্কায় অর্থনীতি বা সমাজ কতোটা চোট খেয়েছে এবং  তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার হিসাব-নিকাশ করতে গেলে আপনাকে হয়ত মাথা পাথরেই ভাঙ্গতে হতো। ঘটনার সকল স্রোতই ছিল নজিরহীন। ধরুন, বিত্তবান দেশগুলোতে ১৯৪৫ সালের পর  ঝটিকার গতিতে সবকিছু বন্ধ করে দেওয়ার বা ভয়াবহ পরিস্থিতির বিরূপ ফাঁদে আটকে খাপ-খাইয়ে নেওয়ার মতো কর্ম বা আইনি তৎপরতা দেখা যায়নি। অন্যদিকে, ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৬ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পর এমন ঘটনা চীনের জীবনে অদেখাই রয়ে গেছে। এছাড়া, জরুরী পরিস্থিতির প্রভাব এক জিনিস কিন্তু মৌলিক, টেকসই পরিবর্তন পুরোই অন্য বিষয়।

কিংবা আপনি যদি জাপান বা সাহারা মরুর দক্ষিণ বা নিম্নাঞ্চলের দেশগুলোর, সাব-সাহারীয় আফ্রিকা নামে পরিচিত, যে কোনো একটায় কিংবা মধ্য বা পূর্বাঞ্চলীয় ইউরোপে কোনো দেশে বসবাস করতেন তাহলে এ বিশ্বমারিকে প্রথম দফায় তেমন জরুরি পরিস্থিতির আদলে দেখতেন না। বরং জীবন-যাপন তখন বেশ ফুরফুরে বলেই মনে হতো। যদিও আপনার আশেপাশে বিদেশিদের সমাগম ক্রমেই কমতে থাকতো। তবে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নাড়ির টান না থাকলে এই পরিস্থিতিকে বরং টেনে নিয়ে বাড়তি সুবিধার কোটায় যোগ করে দিতেন।

এবার আসুন ২০২১ সালে। প্রায় চটজলদি অঞ্চলগুলোর কেমন যেন অদলবদল ঘটে গেল। করোনা নিয়ে ভারতের আত্মপ্রসাদ দেশটিকে জরুরি পরিস্থিতির ভয়াবহ চত্বরে নিয়ে ঠেকাল। লাতিন আমেরিকার আগের বছর যে ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মুখে পড়েছিল এবং মৃত্যুহার দেখা দিয়েছিল অনুরূপ অবস্থা এবারে আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য বাস্তব হয়ে উঠল। জাপানে জরুরী পরিস্থিতির ভয়াবহতা প্রায় মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার পর্যায়ে যেয়ে ঠেকল। অলিম্পিক এবং প্যারা-অলিম্পিকের স্বাগতিক দেশটিই এ দুই ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করল দর্শকহীন, প্রায় ‘রুদ্ধদ্বার’ পরিবেশে। অন্যদিকে আমেরিকা এবং ইউরোপ সবকিছু আবার খুলে দেওয়ার এবং স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়ার তোড়জোড়ে নামল। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাইওয়ানের মতোই তাদের অর্থনৈতিক উৎপাদন ব্যবস্থা বিশ্বমারি-পূর্ব অবস্থায় ফিরে যাওয়ার পথ করে নিতে থাকলো।

ডাউনিং স্ট্রিট থেকে চাকরিচ্যুত উপদেষ্টা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনকে নিয়ে যে চমৎকার উপমা দিয়েছেন তাই হয়ত এখানে তুলে ধরা যায়। তিনি বলেছিলেন, “সুপারমার্কেটের শপিং ট্রলির মতো বরিস জনসন একবার এদিকে তারপরই সেদিকে উথালপাতাল করছেন।” এই একই উপমা বিশ্বমারির বেলাও খাটে। বিশ্বমারি বিদায় হওয়ার কোনো আলামতই এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। ভূগোল এবং প্রকৃতির মধ্যে কেবল একবার এদিকে আরেকবার ওদিকে উথালপাতাল করছে। সব নীতি নির্ধারকরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বদলে শুধরে নেওয়ার চেষ্টায় মাথার ঘাম পায়ে ফেলছেন।

২০০৮’এর মার্কিন-ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে তাৎক্ষণিক অনেক বিশ্লেষণ হয়েছে। তবে এর মধ্যে গভীরতা এবং বিস্তৃতির পাল্লায় ব্যাপক ভাবে সমাদৃত এবং সবচেয়ে সেরা সমীক্ষার মুকুট পেয়েছে যে বই সেটি হলো, ক্রাশড। এই বইয়ের লেখক, আমেরিকার কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রিটিশ ঐতিহাসিক এবং ইউরোপীয় ইন্সটিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক অ্যাডাম টুজ। তাঁর বইটি প্রকাশিত হয় ২০০৮ সালেই এবং সে সময়ে অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে বই লেখার প্রশংসাও জোটে টুজের বরাতে। বিশ্বমারিকে তুলে ধরে তাৎক্ষণিকভাবে যে সব বই প্রকাশিত হচ্ছে এবারে সে সারিতে যোগ দিলেন টুজ। দেরি করার তর যেন তাঁর সইছিল না। তবে দ্রুত প্রকাশিত বিশ্বমারি নিয়ে সে সব বইয়ের অনেকগুলোই এরই মধ্যে প্রাসঙ্গিকতাও হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু তাঁর শাটডাউন এবং মার্কিন দুই বোদ্ধা-পণ্ডিত কলিন কাহল ও থমাস রাইটের লেখা আফটারশকস  অন্তর্দৃষ্টি এবং কাঠামোর সমৃদ্ধ সূত্রে স্থায়ী হতে পারে। হতে পারে মূল্যবান।

টুজ লিখিত শাটডাউন বইয়ের প্রচ্ছদ

দুই.

শাটডাউন  পড়তে বসে পাঠক অনুভব করতে পারেন, তিনি বসে আছেন মহান এক অধ্যাপকের পাশে। উপাত্ত এবং গল্পের মালা সাজিয়ে ঘটনা শেষ পর্যন্ত কোথায় যাচ্ছে তা উদ্দীপনার সাথে তিনি ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। গোটা ঘটনাপ্রবাহের অর্থ কী এবং এর গতিপথ আমাদেরকে কোন দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সে ভাবনাও তাঁর মাথায় খেলে যাচ্ছে। ঘটনা সবিস্তারে লেখার মাধ্যমে তা নিজের জন্য হয়ত এক স্ব-চিকিৎসার কাজ করছে সে কথা বুঝতে অসুবিধা হয় না। ইতালীয় দার্শনিক বেনিদেত্তো কোরোচের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, “সকল ইতিহাসই সমসাময়িক ইতিহাস।” তবে সমসাময়িকেই খোদ ইতিহাস হিসেবে মেনে তিনি একে আরেক দফা এগিয়ে নিয়ে যান। টুজি এক দশকের মধ্যে বিশ্বমারি নিয়ে যে বইই লিখেন না কেনো তা উন্নত ইতিহাস হবে। কাহিনি এখনো শেষ হয়নি।

তাই অধ্যাপকের সাথে বসা মানেই হলো, সময়ের চমৎকার বিনিয়োগ।  বড় অর্জন এনে দেয় তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এবং জ্ঞান। তাঁর ভৌগলিক এবং আন্তপাঠ্যবিষয়াদি সম্পর্কিত প্রজ্ঞার ব্যাপ্তি আকর্ষণীয় এবং সহায়ক। নিজ বসবাসের সুবাদে বিশ্বমারি নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ প্রধানত আবর্তিত হয়েছে আমেরিকাকেই ঘিরে। বিশ্বমারির মধ্য দিয়ে কথিত প্রস্তুতি এবং যথার্থ প্রস্তুতির মধ্যে বিস্তর ফারাক নগ্ন ভাবে সামনে এসেছে। বিশেষ ভাবে এ দিকটা হৃদয়গ্রাহী উপস্থাপনে জার্মান সমাজবিজ্ঞানী উলরিচ বেকের বক্তব্যকে সামনে নিয়ে আসেন তিনি। সব সমস্যা মোকাবেলার কাগজি নীল-নকশা আঁকা আছে কিন্তু প্রয়োজনে দ্রুত মোতায়েনের অক্ষমতাকে তুলে ধরতে যেয়ে তিনি হয়ে ওঠেন লক্ষ্যভেদে দক্ষ তীরন্দাজ। বেকের “সংঘবন্ধ দায়িত্বহীনতা” শব্দগুচ্ছকে নির্ভুল নিশানায় ছুঁড়ে দিলেন তিনি।

[ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলা রূপান্তর সৈয়দ মূসা রেজা]

Share if you like

Filter By Topic