"পানির নিচের ডলফিনটা তো জঙ্গলের মতোন, হেই দাদা, জঙ্গলের মতোন"! কী, গানটা চেনা চেনা লাগছে? বাংলাদেশের নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারী হলে গানটা চিনে ফেলাই স্বাভাবিক। খুব সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া কার্টুন চরিত্র ছোট্ট ইয়ামিনের এই গান এখনও মানুষের মুখে মুখে।
কিন্তু, এই ইয়ামিন থেকে হিরো আলম, কিংবা অপু ভাই থেকে সেই ফিলিস্তিনি তরুণী মারিয়াম আফিফি- কোনো বিষয় ভাইরাল আসলে কেন হয়? কোনো কিছু ভাইরাল হওয়ার পেছনে সাধারণত কাজ করে মানুষের আশ্চর্য মনস্তত্ত্ব এবং অনেকসময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের বিভিন্ন ক্রিয়াকৌশল।
মানুষের বৈচিত্র্যময় মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলোর মধ্যে অভিনবত্বের খোঁজ এবং নতুন তথ্যের খোঁজ- বিষয় দু’টি এক্ষেত্রে বেশি প্রভাব ফেলে থাকে। অভিনব কিছুর সংস্পর্শে এবং তথ্য ঘাটতি পূরণে আমাদের মস্তিষ্ক থেকে ক্ষরিত হয় ডোপামিন হরমোন। ফলে কোনো কন্টেন্টে এসবের উপস্থিতি দেখা গেলে, মস্তিষ্ক খুব সহজেই আমাদের সেই কন্টেন্টটি বারবার দেখতে বা গ্রহণ করতে উদ্দীপনা দেয়, আর আমরা তা গ্রহণও করি। আমাদের মনস্তাত্ত্বিক দিকটিই এমন, যা সবসময় নতুনত্বের পেছনে ছোটে। একই জিনিস বারবার দেখতে দেখতে; পুরনো চিন্তাধারণা পেতে পেতে মানুষ যখন ক্লান্ত, তখন নতুন, চমকপ্রদ বা অভিনব কিছু সামনে আসলে তা অবশ্যই মানুষের নজর কেড়ে নেয়।
এ বিষয়টিই কিন্তু কাজ করে কোনো কন্টেন্টের ক্ষেত্রেও। ভালো মন্দ যা-ই হোক, একই বিষয় দেখতে দেখতে মানুষের চোখ যখন ক্লান্ত, মন যখন শ্রান্ত, তখন নতুন ধরনের কিছু সামনে পেলে মানুষ তা লুফে নেয়। যার ফলস্বরূপ অভিনব কন্টেন্টগুলোতে আসে বিশাল সংখ্যক ভিউ ও শেয়ার, আর কন্টেন্টটি হয়ে যায় ভাইরাল।
মানুষের মস্তিষ্কের আরেকটি দিক হচ্ছে নতুন তথ্যের খোঁজ করা। জর্জ লোয়েনস্টেইনের 'তথ্য ঘাটতি মতবাদ' অনুসারে, আমরা যা জানি এবং যা জানতে চাই, তার মধ্যে সবসময়ই একটি ঘাটতি লেগেই থাকে। পৃথিবী জুড়েই মানুষ ছুটছে নতুন নতুন সব তথ্যের দিকে। জানার প্রতি মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো যখন মানুষকে দিচ্ছে এক ক্লিকেই নতুন কিছু জানার সুযোগ, তখন কে-ইবা বসে থাকে! ক্লিকে ক্লিকে বাড়ছে ভিউ, বাড়ছে শেয়ার, এভাবেই কন্টেন্টগুলো ভাইরাল।
রোর বাংলার সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজার উসামা রাফিদ এ সম্পর্কে বলেন, "ভাইরাল হওয়ার মূল কারণ হতে পারে কন্টেন্টে নতুন কিছুর সমাবেশ, এমন কিছু যেটা আগে কখনো হয়নি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিতর্কিত জিনিসগুলো একটু বেশি ভাইরাল হয়। এদিকে আবার অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলো অনেকটাই ক্লিকবেইট। যতবেশি ক্লিক বা পাঠক, ততবেশি অনলাইন থেকে অ্যাড আসে তাদের। ফলে, পাঠক বাড়ানোর জন্য তারা অনেকটা ‘ক্যাচি’ শিরোনাম দিয়ে থাকে। এভাবে জিনিসটা ভাইরাল হয়ে যায়।"
বাংলাদেশে ভাইরাল হওয়া কিছু বিষয় যথেষ্ট ভালো হলেও, বেশিরভাগ বিষয়ই নেতিবাচক এবং পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন নয় বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, অর্থহীন বিভিন্ন ভাইরাল কন্টেন্ট এর ভিড়ে, চাইলে ইতিবাচক মানসম্পন্ন ভাইরাল কন্টেন্ট খুঁজে পাওয়া যায় কিন্তু তা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
অনেকসময় দেখা যায়, কোনো কন্টেন্ট ভাইরাল করতে গ্রহণ করা হয় বুস্টিং, প্রোমোটিং সহ নানা ধরনের অনলাইন কৌশল। আবার অনেকসময় একদমই সাধারণ একটি ভিডিও খুব দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। আসলে কোনো কন্টেন্ট যখন দর্শকের অনুভূতিকে নাড়া দেয়, সংবেদনশীল পরিস্থিতি তৈরি করে, তখন সে অন্যদের সাথে তার সেই অনুভূতি ভাগাভাগি করে নিতে চায় এবং কন্টেন্টটি শেয়ার করে। যেসব কন্টেন্টের মধ্যে স্বতন্ত্রতা বা কৌতূহলোদ্দীপক কিছু থাকে, আলাদা করে চোখে পড়ে, সেগুলোও সাধারণত বেশি শেয়ার করা হয়।
দর্শকরা সমসাময়িক ট্রেন্ডের সাথে নিজেকে জড়াতে, জ্ঞান বা দক্ষতার আধিপত্য দেখাতে, নিজের সামাজিকীকরণে, বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া অন্যদের সাথে ভাগাভাগি করার তাড়না থেকে ইন্টারনেটের কোনো বিষয় শেয়ার করে। আর ভাইরাল হতে কন্টেন্ট শেয়ারসংখ্যা রাখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
'মাগলনেট' কিংবা 'ওএমজি এফেক্টস' এর মতো জনপ্রিয় সাইটের প্রতিষ্ঠাতা, ভাইরাল বিষয়ক বিশেষজ্ঞ স্পার্টজের মতে, 'ভাইরাল' হওয়া দু’টি ভাইরাল ফ্যাক্টরের উপর নির্ভর করে। তা হলো, একটি কন্টেন্ট ঠিক কতবার 'শেয়ার' করা হলো এবং কতটুকু সময়ের মধ্যে এই শেয়ারগুলো হলো। শেয়ারের সংখ্যা যত বেশি হয় আর এর সময় যত সংক্ষিপ্ত হয়, কন্টেন্টটি তত বেশি ভাইরাল মনে করা হয় যায়।
স্বভাবতই মানুষ গল্প পছন্দ করে। সেই গল্প যদি তাদের আবেগকে নাড়া দিয়ে যায়, তাহলে তো কথাই নেই। তাই দেখা যায়, কোনো কন্টেন্টের মধ্যে যদি একটা জোরালো গল্প রাখা যায়, তাহলে দর্শক তা বেশি পছন্দ করে, শেয়ার করে, এবং তা ভাইরাল হয়ে যায়। আবার ব্যবহারিক বা প্রয়োজনীয় কোনো বিষয় নিয়ে বানানো ভিডিওও খুব দ্রুত ভাইরাল হয়ে যেতে পারে। এছাড়াও যেসব বিষয় দর্শককে অবাক করতে পারে, এমনকি বিতর্কিতভাবে হলেও তাদের চিন্তাভাবনায় চমকপ্রদ কিছু যুক্ত করতে পারে, দেখা যায়, সেসব বিষয় মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পোঁছে এবং ভাইরাল হয়ে যায়। মানুষের প্রবণতা সবসময় চলতি বিশ্বের সাথে হালনাগাদ থাকা, নতুন কিছু দেখতে চাওয়া, জানতে চাওয়া। তাই ট্রেন্ডিং বিষয়গুলো পুরনোগুলোর চেয়ে বেশি ভাইরাল হয়ে থাকে। সর্বোপরি, কোনোকিছু ভাইরাল হওয়ার রেসিপিটা আসলে অনেক বিষয়ের মিশেল, একটি বা দু’টি বিষয় দিয়ে সবসময় তা নির্ধারণ করাও যায় না।
ফারিয়া ফাতিমা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
fariasneho@gmail.com
