Loading...
The Financial Express

কোক স্টুডিও: সীমানা পেরিয়ে সুরের প্রতি ভালোবাসার কারখানা

| Updated: February 17, 2022 09:44:14


কোক স্টুডিও: সীমানা পেরিয়ে সুরের প্রতি ভালোবাসার কারখানা

গত ৮ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার একটি পাঁচ তারকা হোটেলে পর্দা উঠলো বাংলাদেশে কোক স্টুডিও বাংলা’র প্রথম আসরের। বহুল প্রতীক্ষিত এই আয়োজনের বাংলাদেশে আসা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সরগরম হয়ে উঠেছে, প্রথম কম্পোজিশন হিসেবে মুক্তিপ্রাপ্ত রবি ঠাকুরের একলা চলো রে এবং শিরোনামহীন ব্যন্ডের হাসিমুখ গানের মনমাতানো ফিউশন প্রথম সপ্তাহেই পেয়েছে লক্ষ লক্ষ শেয়ার।

আধুনিক কালের সংগীতপ্রেমীদের কাছে কোক স্টুডিও পরিচিত নাম। মূলধারার জনপ্রিয় গান থেকে শুরু করে হারিয়ে যেতে বসা লোকগানগুলোকে কোক স্টুডিওর শিল্পীরা জাদুকরী কম্পোজিশনে নতুন আঙ্গিকে তুলে আনেন, সাথে থাকে ইনডোর মিউজিকের বাদ্যযন্ত্রের ঝলকে ভরা মিউজিক ভিডিওগুলো।

অধুনা কোক স্টুডিওর ধারণা এসেছিল ২০০৭ সালের ব্রাজিলের এককালীন প্রচারণামূলক অনুষ্ঠান 'কোকা কোলা জিরো স্টুডিও ' হতে । এটি  সেসময়ের জনপ্রিয় নকিয়ার নতুন মিউজিক ফোনের প্রচারে ব্যাপক সাড়া জাগায়।

ব্রাজিলের এই  অনুষ্ঠানটি থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই পাকিস্তানের কোকা কোলা কোম্পানির মার্কেটিং হেড নাদিম জামানের মাথায় এলো এক ভাবনা। তিনি উর্দু ব্যান্ড তারকা রোহাইল হায়াতের সাথে মিলে শুরু করেন আজকের জনপ্রিয় কোক স্টুডিওর মঞ্চ। এভাবেই গজল-কাওয়ালির তীর্থভূমি পাকিস্তানে কোক স্টুডিওর যাত্রা শুরু হয়।

কোক স্টুডিও পাকিস্তানের  জনপ্রিয় লাইভ টেলিভিশন রিয়ালিটি শোয়ের তালিকায় অন্যতম জনপ্রিয় আয়োজনের আসন দখল করে আছে বহুদিন ধরে। রোহাইল হায়াতের প্রযোজনায় শুরুটা হলেও বর্তমানে প্রযোজকের ভূমিকায় আছে রক ব্যান্ড স্ট্রিংস। এখন কোক স্টুডিও-র ১৪তম আসর (সিজন)  চলমান।

করাচি হতে সম্প্রচারিত এই মঞ্চে ক্লাসিকাল ,ফোক, সুফি, গজল, কাওয়ালি ,ভাঙরাসহ বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী ঘরানার পরিবেশনা চলে আসছে।  গিটার, পিয়ানো, ড্রামের সাথে বাজে দেশি রুবাব সরোদ, সিতার,বাঁশি, ঢোল ও তবলা ।

এই মঞ্চে  ঝড় তুলেছেন শিল্পী আতিফ আসলাম, মিকাল হাসান ব্যান্ড, স্ট্রিংস ব্যান্ড , নূরী, মোমিনা , আসিম আজহার , জেব্ ,হানিয়া , দানিয়েল জাফর প্রমুখেরা। ক্লাসিকাল শিল্পীদের মধ্যে আছেন শাফকাত আমানত আলী খান , রাহাত ফতেহ আলী খান ও সুফি নক্ষত্র আবিদা পারভীন।

এখনো পর্যন্ত কোক স্টুডিও পাকিস্তান তাদের প্রতিটি সিজনে বাজিমাত করেছে কোনো চলচ্চিত্রের গানের রোশনাই ছাড়াই।

ছাপ তিলক, তেরে উহ পেয়ার, গারাজ বারাস, তাজদার-ই-হারাম , আফরিন আফরিন  গানের রেকর্ডগুলি এখনো পাওয়া যায় ইউটিউবে সার্চ করলেই। যে কেউ শুধু শুনলেই আন্দাজ করতে পারবে স্বরের কারুকাজ কতো খানি সুন্দর হতে পারে !

সুরের এই মোহনীয় জাদু ছড়িয়ে ছিল ২০১৩ সালে আফ্রিকায় ও মধ্যপ্রাচ্যে ২০১২ সালে বেল ৩আরবি নামে   । এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে ফিলিপাইনেও কোক স্টুডিও নতুন ঠিকানা পেয়েছিল।

পাকিস্তানের ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তায়  অনুপ্রাণিত হয়ে কোক স্টুডিওর ভারতে আগমন ঘটে। এটি প্রতিষ্ঠার সময় ভারতের গুগল সার্চের অন্যতম জনপ্রিয় নাম ছিল কোক স্টুডিও পাকিস্তান ।

ভারতে কোক স্টুডিও একই শিরোনামে আসে ২০১১ সালে। এই আসরের  প্রযোজক ছিলেন মুম্বাইয়ের প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ লেসলি লুইস । সম্প্রচারের সঙ্গী হয় জনপ্রিয় টেলিভিশন এমটিভি। তৎকালীন কোকাকোলা ইন্ডিয়ার ডিরেক্টিং ম্যানেজার ওয়াসিম বশীরের সাথে চুক্তি করে এগিয়ে যাওয়া আসরটি শ্রোতাদের কাছে পাকিস্তানের মতোই সুনাম কুড়াতে থাকে।

পর পর কয়েকটি আসরে উঠে আসে ভারতের বিভিন্ন সংগীত ঘরানার সুর। হিন্দুস্থানী ও কর্ণাটকি- একসাথে তালে তাল মিলিয়ে রসিকজনের মন ছুঁয়েছে, সাথে ছিল আঞ্চলিক লোকসংগীত। একইসাথে ঠুমরি ,টপ্পা, হোরি , ভজন ,কাওয়ালি - বাদ যায় নি কিছুই।

একদিকে যেমন বলিউডি গানের পরিবেশনায়  মঞ্চ  মাতাতেন শংকর মাধবন, সুনিধি চৌহান , বিশাল , হার্ষদীপ , অনুপম ও শানেরা, অন্য দিকে লোকগীতির লহর তুলতেন রঘু দীক্ষিত ও পাপনের মতো শিল্পীরা ।

নির্মোহিয়া , সাওয়ান মে , হুসনে , তু মানে ইয়া না মানে, খারি খারি, মাস্ত মালাঙ', বাদরি বাদররিয়া , সাহিল তাক- সহ বেশ কয়েকটি গান জনপ্রিয়তা লাভ করে শ্রোতাদের মাঝে।

বাঙালি শ্রোতাদের জন্যে আনন্দের বিষয় হলো কোক স্টুডিও বাংলার আগেও বাংলা গান মঞ্চস্থ হয়েছে। এমনকি তা-ও পাকিস্তানেই ! আমায় ভাসাইলি রে  গানটি শোনা গিয়েছিল আলমগীর ও ফারিহা পারভেজের কণ্ঠে ।

কোক স্টুডিও ইন্ডিয়ায় অনুপম রায় , বাবুল সুপ্রিয় ও সাত্যকি  ব্যানার্জি তিনজনের সুর মিলে বাংলা হিন্দি মিশেলে নতুন রূপ পেয়েছিল লালনগীতি মনের মানুষ। কমলা সুন্দরী ও রঙ্গবতী  গান ভিন্ন সুরে আসর মাতিয়েছে।

 এখনো চাইলে যে কেউ ইউটিউব ঘুরে শুনে আসতে পারে গানগুলি।

পাকিস্তান হোক কিংবা ভারত, প্রতি পর্বেই হাউজ ব্যান্ড এবং অতিথি শিল্পীরা দেশি সুরগুলিকে পরিশ্রুত করে এক গানের সাথে অন্য গান জুড়ে শ্রোতাদের নতুন চমক উপহার দিয়েছে। শিল্পীদের নিজস্ব ঢঙে বহু শোনা গানগুলি নতুন প্রাণ পেয়েছে ।

এখন দুই বাংলার বঙ্গবাসী গানপ্রেমীর দৃষ্টি কোক স্টুডিও বাংলার মঞ্চে। এবারের আসরে থাকবে ১০টির মতো গান। সবার কৌতুহল মেটাতে খুব শীঘ্রই প্রকাশিত হবে ইন-হাউজ প্রথম গান। কোক স্টুডিওর ফেসবুক পেজ , ইউটিউব ও স্পোটিফাইয়ে খুব সহজেই শোনা যাবে সব গান।

সুস্মিতা রায় বর্তমানে শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করেছেন।

susmi9897@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic