Loading...

কেমন ছিল আমাদের শিক্ষকদের ছাত্রজীবন?

| Updated: August 28, 2021 15:07:28


-প্রতীকী ছবি -প্রতীকী ছবি

জন্মের পর থেকে একজন শিশুকে বেশ কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। প্রতিটি মানুষকেই পার করতে হয় জীবনের বিচিত্র এসব অধ্যায়, যার প্রত্যেকটিতেই থাকে নতুন কিছু অভিজ্ঞতা কিংবা সাড়া জাগানো কিছু স্মৃতি। এর মধ্যে ছাত্রজীবনের সময়টুকু একজন মানুষের জীবনে দাগ কাটে সবচেয়ে বেশি। আর এর থেকে বাদ যান না আমাদের শিক্ষকরাও। তাঁদের ছাত্রজীবনটিও থাকে বিচিত্র সব অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ।

এ বিষয়ে প্রথমেই কথা হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রুমানা আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, “আমাদের সময়ে যেহেতু তথ্য-প্রযুক্তির খুব একটা বেশি প্রচলন ছিল না, তাই সেসময় আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনারে বসে বই পড়তাম। তাছাড়া বন্ধুদের সঙ্গে ক্লাসের ফাঁকে পাহাড় বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা ছিল। আর এই সময়গুলোকে এখন খুব মিস করি। তাছাড়া তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্র কল্যাণ সংস্থার সাথে কাজ করতাম এবং সেখানকার বিভিন্ন প্রোগ্রামে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করতাম।”

অন্যদিকে চট্টগ্রামের হাজেরা-তজু ডিগ্রি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক প্রবীর বড়ুয়া তাঁর ছাত্রজীবনের কথা স্মরণ করে বলেন, “আমার কলেজটি ছিল বাড়ির কাছেই। আমার কলেজের গেটের ভেতর অনেকগুলো নারিকেল গাছ ছিল। প্রহরীদের কড়া পাহারায় সেখান থেকে নারিকেল পেড়ে খাওয়া অনেকটা অসম্ভব ব্যাপার হলেও, আমার আমার জন্য কাজটি কিছুটা সহজ ছিল অনেকটা পারিবারিক কলেজ হওয়াতে। গাছ থেকে নারিকেল এনে সেগুলো বাড়িতে বসে খাওয়ার মুহূর্তগুলো এখনো খুব মিস করি। পাশাপাশি কলেজ জীবনে বন্ধুদের সাথে নিয়মিত ক্যারাম খেলতাম। তাছাড়া ঐ সময়েই কবিতা লেখার অভ্যাস গড়ে উঠেছিল যা এখনো নিজের মধ্যে লালন করার চেষ্টা করি।“

এরপর কথা হয় হাজেরা-তজু ডিগ্রি কলেজের আরেক শিক্ষক ব্যবস্থাপনা বিভাগের তাহমিনা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়টুকু সবার কাছে খুবই আনন্দদায়ক হলেও আমার জন্য তা ছিল খুবই সংগ্রামের একটি গল্প। উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষে থাকতেই আমার বিয়ে হয়ে যায়। আমার প্রথম বাচ্চা হওয়ার ২১ দিন পর আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ফর্ম তুলি। এরপর সেখানে ভর্তি হই ব্যবস্থাপনা বিভাগে। সংসারের চাপে তখন আমার পক্ষে সবসময় সব ক্লাস করা সম্ভব ছিল না। তবে আমার বন্ধু-বান্ধবরা আমাকে পড়ালেখার বিষয়ে অনেক সাহায্য করেছে। এজন্য আমি তাদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। আমার মাস্টার্সের পরীক্ষার ১০ দিন পর আমার ছেলে জন্মগ্রহণ করে। ঐ অবস্থায় অনেকেই পরীক্ষা দিতে নিষেধ করলেও আমি অনেকটা জোর করেই পরীক্ষা দিয়েছিলাম। তবে এখন এ কথা ভাবতে খুবই ভালো লাগে যে এত কষ্ট করে সবকিছু করলেও আজকে আমার সব ছেলেমেয়েই দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় সফল।”

ছাত্রজীবনের মজার সব কাহিনী জানতে আরো কথা হয় চট্টগ্রামের কাজেম আলী স্কুল এন্ড কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক কানিজ ফাতিমার সঙ্গে। তিনি বলেন, “২০০৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর থেকে প্রত্যেকটি মুহূর্তই ছিল খুবই আনন্দঘন। আমরা যখন প্রথম বর্ষে পড়ি,  একদিন আমাদের কোনো ক্লাসরুম ফাঁকা ছিল না। পরে আমাদের বিভাগের এক শিক্ষক জহিরুল হক স্যার বলেন, ‘ক্লাস নেই তো কী হয়েছে। ঝুপড়ি তো আছে।‘ পরে ক্লাসরুমের পরিবর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ঝুপড়িতে গিয়ে ২ ঘণ্টার মতো ক্লাস নেন স্যার। এই স্মৃতিটিও কখনো ভোলার মতো নয়।“

চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুল এন্ড কলেজের সিনিয়র শিক্ষক তানিয়া নাসরিন বলেন, “ছাত্রজীবনে আমি একটু দুষ্টু প্রকৃতির ছিলাম। আমাদের একটি সার্কেল ছিল, যারা প্রত্যেকদিন ঘুব তাড়াতাড়ি ক্লাসে চলে যেতাম যাতে পেছনের সিটগুলো ফাঁকা পাই। ক্লাসের ফাঁকে বন্ধুদের সাথে দুষ্টু-মিষ্টি আড্ডার গল্প এখনো খুব মনে পড়ে। তবে আমি ঐসময় পড়ালেখার পাশাপাশি গান এবং নাচেও খুব আগ্রহী ছিলাম এবং তখন এগুলো অনুশীলনও করতাম।“

ঢাকার ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজের ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগের প্রভাষক ফারহা ফারজানা বলেন, “আমি স্কুলজীবনে খুবই পড়ুয়া প্রকৃতির ছিলাম। পড়ালেখাই ছিল আমার প্রধান কাজ। যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই, তখন কিছুটা সময় বন্ধুদের সাথে আনন্দ করে কাটালেও পড়ালেখাটাকে তখনো খুব গুরুত্ব দিতাম। তখন সবার কাছে ল্যাপটপ ছিল না। তাই গ্রুপওয়ার্ক করার জন্য আমরা সবাই কোনো এক বন্ধুর বাসায় গিয়ে একসাথে কাজ করতাম। এতে আমাদের বন্ডিংটাও আরো শক্ত হতো।”

এ বিষয়ে আরো কথা হয় চট্টগ্রামের দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া পদুয়া ডিগ্রি কলেজের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের প্রভাষক এইচ. এম. মহিউদ্দিন ইসলাম স্যারের সঙ্গে। তিনি তার স্কুল জীবনের কথা স্মরণ করে বলেন, “আমার স্কুল জীবন কেটেছে গ্রামে। বৃষ্টির সময় গ্রামের কাঁচা রাস্তা অনেক পিচ্ছিল হয়ে থাকত। আর তখন আমরা স্কুলে না যাওয়ার একটা ছল খুঁজে পেতাম। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত হলেও প্রায় সময় আমরা ইচ্ছা করেই কাদায় পড়ে যেতাম, যাতে করে আর সেদিন স্কুলে যেতে না হয়। এরপর গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ইছামতী নদীতে গিয়ে বন্ধুদের সাথে সাঁতার কাটতাম। তাছাড়া ছাত্রজীবনে প্রায়ই ইছামতী নদীর তীরে বসে বন্ধুদের সাথে অনেক আনন্দঘন সময় কাটিয়েছি।”

ছাত্রজীবন সবার কাছেই জীবনের বিশেষ একটি সময়। কারণ পড়াশোনার চাপ থাকলেও এই সময়টা অনেকটা নিজের মতো করেই কাটানো যায়। ব্যতিক্রম নয় আমাদের শিক্ষকদের ছত্রজীবনও। নানা ধরণের বিচিত্র সব অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ ছিল তাঁদের জীবনের এই সময়টি, যা সবসময় তাঁদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

তানজিম হাসান পাটোয়ারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।

tanjimhasan001@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic