কর্মক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সব সার্টিফিকেট, ডিগ্রি থাকার পরেও চাকরিদাতারা এখন অগ্রাধিকার দিচ্ছেন বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষভাবে পারদর্শীদের, যাদের পড়াশোনা বাদেও অন্যান্য ক্ষেত্রে দক্ষতা আছে।
প্রতিযোগিতামূলক এই বিশ্বে সকলেই তাই চেষ্টা করে নিজেকে আরো সমৃদ্ধ করার। নিজেকে অন্যদের চেয়ে একটু এগিয়ে রাখার এই চেষ্টায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে একটি নতুন ভাষা।
খুব বেশিদিন আগে নয়, ইংরেজি ছাড়া অন্য কোনো ভাষা শেখায় আগ্রহী কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল। কিন্তু এখন সময় পাল্টেছে। অনেকেই এখন পড়াশোনার পাশাপাশি শিখছেন একটি নতুন ভাষা।
কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার দিক থেকে অন্যদের চেয়ে একটু এগিয়ে থাকা, বাইরের নামিদামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়ার ইচ্ছা বা বৃত্তির জন্য আবেদনের আগে, বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে সহজ করা, চাকরি বা ব্যবসার জন্য অথবা নিছক শখ বা আগ্রহের কারণেও অনেকে বিদেশি ভাষা শিখছেন।
একটি নতুন ভাষা একজনকে শুধু সমৃদ্ধই করে না, বরং একটি সম্পূর্ণ নতুন সংস্কৃতি ও জাতির সাথে পরিচয়েরও পথ খুলে দেয়। অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা শুধুমাত্র একটি বিদেশি সংস্কৃতির প্রতি তাদের আগ্রহের জন্য সেই বিদেশি ভাষা শেখা শুরু করেছে।
জাপানি অ্যানিমে ও মাঙ্গা প্রেমীরা সাবটাইটেল ছাড়া অ্যানিমে দেখতে এবং জাপানি সংস্কৃতির প্রতি তাদের আগ্রহের জায়গা থেকে জাপানি ভাষা শিখতে আগ্রহী হয়ে উঠে। বাংলাদেশে কে-পপ (কোরিয়ান পপ সংগীত ধারা) ও কে-ড্রামা (কোরিয়ান ড্রামা/নাটক) প্রেমীদের মধ্যে কোরিয়ান ভাষা শেখার প্রবণতাও বর্তমানে চোখে পড়ছে।
তবে নতুন একটি ভাষা শেখার উপকারিতা আসলে এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়।
একটি নতুন ভাষা শেখার প্রক্রিয়া স্মৃতিশক্তিকে তীক্ষ্ণ করে এবং মস্তিষ্কের শক্তি বাড়ায়। একটি নতুন ভাষা শেখার সময় আমাদের মস্তিষ্কের অনেকগুলো অংশ একই সাথে কাজ করে, যার ফলে মনোযোগ বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন ঘটনার মাঝে যোগসূত্র স্থাপনের দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জনের মতো বেশকিছু উপকার পাওয়া যায়।
‘জার্নাল অব এক্সপেরিমেন্টাল চাইল্ড সাইকোলজি’তে প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, যে শিশুরা একাধিক ভাষা শিখেছে তারা একটি ভাষা জানা শিশুদের তুলনায় পড়াশোনা মনে রাখা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে বেশি ভালো ফলাফল করছে।
নতুন একটি ভাষা শেখা মস্তিষ্কের জন্য একটি দুর্দান্ত ব্যায়াম। একটি সক্রিয় মস্তিষ্ক বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানসিক বিভিন্ন অসুস্থতা দূরে রাখে। এটি মানসিক বার্ধক্য প্রতিরোধে সাহায্য করে, স্মৃতিশক্তি উন্নত করে, সতর্কতা বাড়ায় এবং সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করে।
যারা একাধিক ভাষায় কথা বলতে পারে তাদের ডিমেনশিয়া ও অ্যালঝেইমার রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার যারা শুধুমাত্র একটি ভাষা জানে তাদের চেয়ে কম। বহুভাষীদের মানসিক বার্ধক্যও অন্যদের চেয়ে দেরিতে আসে ।
অর্থাৎ ব্রেইনকে সুস্থ ও সক্রিয় রাখার এবং ডিমেনশিয়ার মতো মানসিক নানা রোগ প্রতিরোধেরও অন্যতম উপায় হতে পারে একটি নতুন ভাষা শেখা।
বিদেশি ভাষা জানা ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে। বহুজাতিক চাকরির ক্ষেত্রে সিভিতে ইংরেজির পাশাপাশি আরেকটি বিদেশি ভাষার দক্ষতা অন্যান্য চাকরির আবেদনকারীদের থেকে একজনকে আলাদা করে।
দোভাষী এবং অনুবাদক হওয়ার পাশাপাশি, হিউম্যান রিসোর্স স্পেশালিস্ট, কাস্টম সার্ভিস ম্যানেজার, হসপিটালিটি ম্যানেজার, কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর, ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট, মার্কেটিং ম্যানেজারের চাকরিতেও বিশেষ সুবিধা ও অগ্রাধিকার পাওয়া যায় একটি নতুন ভাষা জানা থাকলে। অথবা ভাষা শিখে কেউ কেউ আবার সেই ভাষার শিক্ষক হিসেবেও যোগদান করেন।
একটি ভাষায় নির্দিষ্ট কিছু শব্দ, প্রবচন, বাক্যাংশ রয়েছে যার প্রতিটি ভাষায় সঠিক অনুবাদ নেই। এই কারণেই বিদেশি ভাষায় রচিত উপন্যাস, কবিতা, মহাকাব্য, নাটক ইত্যাদির অনুবাদ পড়ে তার পূর্ণাঙ্গ ভাব অনুধাবন করা সম্ভব হয় না। শুধুমাত্র ভাষাটি জানা থাকলেই একজন সে ভাষায় রচিত সাহিত্যের সৌন্দর্য সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করতে পারে। ফরাসি এবং রাশিয়ান সাহিত্য বিশাল এবং এই ভাষাগুলো শেখা সাহিত্য অনুরাগীদের জন্য জ্ঞান ও বিনোদনের একটি নতুন জগত খুলে দিতে পারে।
ভাষা একটি সংস্কৃতির অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একটি নতুন ভাষা শেখা সাংস্কৃতিক জ্ঞানের বিকাশ ঘটায় এবং ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে।
কিছু দেশে কাজ বা পড়াশোনার জন্য সে দেশের ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক না। তবুও তাদের ভাষা না শিখে সেখানে বসবাস ও কাজ করাকে অভদ্রতা বা অসম্মানজনক হিসাবে দেখা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ফ্রান্সে কাজের সুবাদে গিয়ে যারা ইংরেজিতে কথা বলে তাদেরকে ফরাসিরা কিছুটা যেন তাচ্ছিল্যের সাথেই দেখে থাকে।
কোন ভাষা শিখবেন?
একটি নতুন ভাষা রপ্ত করা অনেক সময়সাপেক্ষ ও সাধনার একটি বিষয়। তাই ভাষা নির্বাচনের ক্ষেত্রে এমন একটি ভাষাই বেছে নেওয়া উচিত যেই ভাষা বা ভাষার সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি আপনার আগ্রহ রয়েছে। এছাড়াও অর্থনৈতিক দিক থেকে এগিয়ে থাকা দেশগুলোর ভাষা (যেমন চীনের প্রধান ভাষা মান্দারিন) শেখা কর্মক্ষেত্রে অধিক সুযোগ ও সুবিধা সৃষ্টি করতে পারে।
আবার উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন থাকলে সেসকল দেশের ভাষা শেখা লাভজনক হতে পারে। যেমন, জাপানের অনেক নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য জাপানি ভাষা শেখাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তাই জাপানি ভাষা জানা থাকলে জাপানে উচ্চশিক্ষা সহজতর হয়।
কোথায় শিখবেন?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা শিক্ষা ইন্সটিটিউট এ বর্তমানে রয়েছে ফরাসি, জাপানি, স্প্যানিশ, তুর্কিসহ ১৪ টি ভাষা শেখার চার ধরনের কোর্স। রাজধানীর আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, জাপানিজ কালচারাল সেন্টার, গ্যোটে ইনস্টিটিউট, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব ল্যাঙ্গুয়েজস, ঢাকা ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব, রাশিয়ান কালচারাল সেন্টার ইত্যাদি ভাষার স্কুলগুলিতেও রয়েছে নানান ভাষা শেখার সুযোগ।
এসব প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ফরাসি, জার্মান, স্প্যানিশ, ইতালিয়ান, জাপানি, চীনা, কোরিয়ান ইত্যাদি ভাষা শিখছে অনেকেই। ইন্টারনেটের যুগে আজকাল ভাষা শেখার প্রক্রিয়াটিও বেশ সহজ হয়েছে। বিভিন্ন ভাষা শেখার জন্য রয়েছে মজার মজার সব অ্যাপ, ইউটিউবে মেলে শত শত টিউটোরিয়াল।
সব মিলিয়ে ইচ্ছা থাকলে যে কেউ চাইলে ঘরে বসেই একটি ভাষা শেখা শুরু করতে পারেন।
নাফিসা ইসলাম মেঘা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।
nfsmegha@gmail.com
