রংধনু ছড়িয়ে থাকে যে রঙের মিতালী আর বৈচিত্র্য, তাতে অর্থ আরোপ করে মানুষ বেছে নেয় কোনো না কোনো বিশেষত্ব। লাল হয় দ্রোহের রঙ, তো নীল বেদনার ছবি আঁকে। সব শুষে নিয়ে কালো হয়ে যায় শোকের প্রতিনিধি, সাদা হয়ে ওঠে শান্তির প্রতীক। সে জের ধরেই বেগুনি হয়েছে এক বিশেষ দিনের রঙ, বর্ণালির শুরুর দিকের সদস্য এই পার্পল বা বেগুনি হয়েছে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিনিধি। এ দিবস উদযাপনের জন্য হুট করেই তাই বেগুনি পোশাক, বেগুনি রঙের পণ্যের ছড়াছড়ি ঘটে বাজারে।
এ দিনের চেতনার সাথে নিজেকে যুক্ত করবার সবচেয়ে সহজ উপায় যেন গায়ে এক ফালি বেগুনি রঙ জড়িয়ে নেয়া কিংবা বর্তমান যুগে ভাব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম– নিজের মতো করে সামাজিক মাধ্যমে বেগুনি রঙের উপস্থাপন করা। এই দিবসের বিভিন্ন পোস্টার, সেমিনারের ব্যানার, টকশোর ব্যাকগ্রাউন্ড সবকিছুতেই দেখা যাবে এই একই রঙের বিভিন্ন রূপ। কিন্তু কেন? কেন বেগুনি রঙই নারী দিবসের রঙ হলো? এই ‘কেন’র উত্তরেই আজকের এ লেখা।
ইতিহাসের পাতা থেকে
বর্তমানের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দ্বারস্থ হতে হয় অতীতের কাছে। ইতিহাসের পাতা থেকে খোঁজ মিললো বেগুনি রঙের রহস্যেরও। এক শতাব্দীরও আগে পনেরো হাজার নারী নিউইয়র্ক শহরের রাস্তায় সমবেত পদক্ষেপে হেঁটে গিয়েছিলেন, নিজেদের শর্তপূরণ ও ভোটাধিকার আদায়ের লক্ষ্যে। সেই আন্দোলনের সূত্র ধরে আজো নারীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ইত্যাদি সকল প্রকার সমতা আদায়ের জন্য ৮ মার্চকে উদযাপন করা হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে।
১৯০৮ সালের দিকে যুক্তরাজ্যের দ্য উইমেন’স সোশ্যাল অ্যান্ড পলিটিক্যাল ইউনিয়ন তিনটি রঙকে ব্যবহার করে নারীর সাম্যের দিকটি নির্দেশ করে। বেগুনি, সবুজ ও সাদা। এই প্রেক্ষাপট অনুযায়ী বেগুনি ছিলো ন্যায় ও মর্যাদার রঙ, সবুজ আশার প্রতীক। সাদা প্রতিনিধিত্ব করে পবিত্রতা বা শুদ্ধতার। পরবর্তী সময়ের নারীবাদী আন্দোলনগুলোতেও রঙের এই ত্রিমোহনা সেই একই চেতনাকে ধরে রাখে। গত শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকের আন্দোলনকারীরা প্রথমদিকের নারী ভোটাধিকারকর্মীরদের প্রতি সম্মান জানিয়েই আবারো এই রঙগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করে তোলেন।
বর্তমানের আয়নায়
তবে এই চেতনাকে উদযাপনের বিষয়টি শুধু বেগুনি রঙের একচ্ছত্র আধিপত্যে কীভাবে এলো, তা জানা যায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান প্যান্টনের বক্তব্যে। নিউ জার্সিতে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব হচ্ছে রঙ সংক্রান্ত বৈশ্বিক একটি ভাষা তৈরি করা এবং বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পণ্য উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে রঙ বিষয়ক সিদ্ধান্ত দেয়া। ২০১৮ সালে প্যান্টন বেগুনিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের রঙ হিসেবে ঘোষণা দেয়। এই বেগুনি রঙ দ্বারা নির্দেশ করা যায় সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মিকেও, যার শক্তিশালী অস্তিত্বের সাথে মিলে যায় নারীজাতির অদম্য স্বভাব।
কোনো রঙ বা প্রতীক নিজে থেকে কখনো কোনো অর্থ বহন করে না। সামাজিক, ঐতিহাসিক কিংবা সংস্কৃতিগত পটভূমি থেকে আমরাই সেগুলোতে যোগ করি বিশেষ অর্থ এবং করে তুলি বিভিন্ন উদযাপনের মাধ্যম। নারী দিবসের সাথে এই নির্দিষ্ট রঙটির যোগাযোগও সেই একই যাত্রার অংশ। বেগুনি ছাড়া অন্য যেকোনো রঙই হতে পারতো এ দিবসের প্রতিনিধি, তবে তাতেও একটুকু মলিন হতো না যুগে যুগে নারীর টিকে থাকার লড়াই কিংবা লড়াইয়ের ইতিহাস। যে রঙেই পালন করা হোক, অধিকার আদায়ের চেতনা থাক অমলিন।
অনিন্দিতা চৌধুরী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
anindetamonti3@gmail.com
