যে বছর রাইট ভাতৃদ্বয় সর্বপ্রথম আকাশপথে পাড়ি জমালেন আর মেরি ক্যুরি সর্বপ্রথম একজন নারী হিসেবে নোবেল পুরষ্কার গ্রহণ করলেন, সেই বছর জাপানের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ফুকুওকা শহরে জন্ম নিলো ছোট্ট এক শিশু। তারিখটা ছিল ১৯০৩ সালের ২ জানুয়ারি। বাবা-মা মেয়ের নাম রাখলেন কেন তানাকা।
অন্যান্য শিশুদের মতো তিনিও ছিলেন এক সাধারণ পরিবারের সদ্যজাত সন্তান। কেউ কি তখন ভেবেছিল, এই শিশুটিই একদিন বয়সের সীমাকে শতক ছাড়িয়ে পরিণত হবে ‘বিশ্বের সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তি’ হিসেবে।
২০১৯ সালে গিনেজ বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে বিশ্বের সবচেয়ে প্রবীন জীবিত ব্যক্তি হিসেবে কেন তানাকার নাম যুক্ত হয়।
অতঃপর, বছর তিনেক বাদে ১১৯ বছর বয়সে গত ১৯ এপ্রিল কেন তানাকা একটি নার্সিংহোমে তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
দীর্ঘ এই জীবনে নানা চড়াই উৎরাই প্রত্যক্ষ করার পাশাপাশি দুটি বিশ্বযুদ্ধ, ১৯১৮ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারী এবং সর্বশেষ ২০১৯ সালে করোনো মহামারির সাক্ষী ১১৯ বছর বয়সী প্রবীণ ব্যক্তিটি।
তিনি ছিলেন প্রফুল্ল চিত্তের একজন মানুষ এবং উচ্ছ্বসিত জীবনিশক্তির আধার। বেঁচে তো সবাই থাকে, তবে বাঁচার মতো করে কজনই বা বাঁচে? বার্ধক্য তো কেবল বয়সসীমার একটি মাপকাঠি মাত্র যা শরীরকে বুড়িয়ে দেয় ঠিকই তবে সবার মনকে ছুঁতে পারে না। তানাকা ঠিক এমনই একজন মানুষ ছিলেন, বার্ধক্য যার শরীরকে ছুঁতে পেরেছিল, শুধু তবে মনকে কখনো জীর্ণতায় শীর্ণ করে তুলতে পারেনি।
তানাকা নিজের চিন্তা চেতনায় খুব স্বচ্ছ ছিলেন, নিজের প্রতি যত্নশীল হওয়ার পাশাপাশি যুগের সাথে ঠিকঠাক তাল মিলিয়ে চলতেন। অনেকটা বাচ্চাদের মতো তিনি চকলেট আর কোকাকোলা খেতে খুব পছন্দ করতেন। জীবন সায়াহ্নে যখন তাঁকে নার্সিংহোমে নিয়মিত হতে হয়েছিল, সেসময়ও তিনি নাকি প্রায়ই চকোলেট, কোকা-কোলা খাওয়ার আবদার জুড়ে বসতেন। দ্য নিউইয়র্ক টামসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তানাকার নাতি এমনটাই জানিয়েছিলেন।
তার জীবনে ছিল সন্তান হারানোর শোক (তানাকার জীবদ্দশায় তাঁর সকল সন্তানের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়), ১৯৩৮ সালে প্যারাটাইফয়েডে আক্রান্ত হওয়ার দুঃসহ সময়, ১৯৪৮ সালে অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারজনিত অপারেশন, ১৯৯৩ সালে চোখের ছানি অপারেশন এবং ২০০৬ সালে মলাশয়ের ক্যান্সারের সংক্রমণ-এতো কিছুর পরেও তিনি জীবনের শেষদিন অবধি হাসিখুশিথেকেছেন। ‘হেরে যাওয়াটা’ তার পছন্দের তালিকায় কখনোই ছিল না।
জাপানেরনিশি নিপ্পোন শিম্বুন সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডী পেরিয়ে পরিবারের অর্থ উপার্জনের একজন হয়ে উঠতে হয়েছিল তাকে। বাচ্চা দেখাশোনার কাজ, কাঠমিস্ত্রীর কাজ, কৃষিকাজ এবং তাঁতবোনা-শুরুতে এ ধরনের কাজগুলো করতেন তিনি।
১৯ বছর বয়সে তার এক চাচাতো ভাইয়ের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। তাদের ঘর আলো করে এসেছিল দুটি ছেলে ও দুটি মেয়ে সন্তান। নিজ সন্তানের পাশাপাশি তাদের আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকেও তারা সন্তান দত্তক নিয়েছিলেন।
বিয়ের পর দীর্ঘদিনযাবত তিনি তাঁর নিজস্ব একটি দোকান চালিয়েছেন। যেখানে ‘মোচি’ নামের এক ধরনের মিষ্টি পিঠা বিক্রি করা হতো। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর দোকান বন্ধ করে দিয়ে অনেকের মতো তাকেও সলোমন দ্বীপপুঞ্জে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেসময় শুধু তাকে নয়, বরং তার বড় ছেলেকেও যুদ্ধে পাঠানো হয় (মঙ্গোলিয়ায়)।
তানাকা সেখানে যাওয়ার পর জাপানি নৌবাহিনীর ঘাঁটিতে পুনরায় মোচির দোকান খুলে বসেন এবং এবার শুধু মোচিই নয় বরং এর পাশাপাশি একটি নুডলসের রেস্তোরাও শুরু করেন। ১৯৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী স্থানটির দখল নেওয়ার পরেও তিনি সেখানে তার ব্যবসা চালিয়ে যান
১৯৫৯ সালে তিনি এবং তার স্বামী দুজনে মিলে একটি গীর্জায় ছোট ছোট বাচ্চাদের জন্য একটি স্কুল চালু করেন। প্রায় দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে তিনি এই স্কুলটি পরিচালনা করেন।
১৯৭০ সালের দিকে এসে তিনি একটি ফুলের দোকান শুরু করেন এবং দোকানের ফুল সংগ্রহের জন্য সপ্তাহে তিনবার করে নৌকাযোগে তাকে শহরের নানাপ্রান্তে যেতে হতো।
বয়স যখন তার ৮০ ছুঁইছুঁই করছে, তখন তিনি তার সকল প্রকার ব্যবসা সংক্রান্ত কাজ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এসময়টা তিনি ঘরের কাজ করে সময় কাটাতেন এবং জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন আত্মীয়পরিজন এবং পরিচিতদের বাসায় বেড়াতে যেতেন। এছাড়াও নিয়মিত সংবাদপত্র পড়া, গণিতের নানা সমস্যা সমাধান, ওথেলো এবং অন্যান্য বোর্ডভিত্তিক খেলা, যেমন-দাবা খেলে সময় কাটতো তার।
তানাকার দীর্ঘ কর্মময় এবং সাংসারিক জীবনে তিনি সবসময় তাঁর স্বামীকে পাশে পেয়েছেন। ১৯৯৩ সালে ৯০ বছর বয়সে তাঁর স্বামী ডিমেনশিয়ায় ভুগে মারা যান।
তানাকার মৃত্যুর কয়েক বছর আগে থেকেই তাকে মাঝে মাঝেই অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি করতে হতো।
এমন প্রবীণ ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিতে অনেকেই আসতেন। তানাকা খুব আনন্দ এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে সকলের প্রশ্নের উত্তর দিতেন।
তানাকা বার্ধক্যে উপনীত হাজারো মানুষকে আনন্দে বাঁচার এক অমূল্য বার্তা দিয়ে গেছে। বার্ধক্য মানেই অবহেলা, একাকীত্ব বা বিষন্নতায় ভর করে বাঁচা নয়। মূল্যায়নটা আসলে নিজের কাছে, তানাকা হাসি আনন্দে বাঁচতে চেয়েছিল বলেই তিনি শেষ অবধি বাঁচার মতো করে বেঁচেছিলেন।
শবনম জাবীন জেবা ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
zabin860@gmail.com
