খানিকটা অপ্রত্যাশিত হলেও রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত দারুণ প্রতিরোধ দেখিয়ে যাচ্ছে ইউক্রেইন। যুদ্ধে রাশিয়া তাদের ‘পরিকল্পনা অনুযায়ী অগ্রসর হতে পারছে না’। এদিকে, বেশিরভাগ ইউক্রেইনীয়র বিশ্বাস যুদ্ধে তারাই জিতবেন।
ইউক্রেইনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরু পর পাঁচ দিন পেরিয়ে গেছে। অথচ রুশ বাহিনী এখন পর্যন্ত রাজধানী কিয়েভ বা দেশটির অন্য কোনও গুরুত্বপূর্ণ নগরীর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি।
বরং গত রোববার ইউক্রেইনের বাহিনী তাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভের কাছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিমানঘাঁটি দখলে রাশিয়ার চেষ্টা সফলভাবে প্রতিহত করতে পেরেছে বলে জানিয়েছে সিএনএন।
সমর শক্তিতে রাশিয়ার তুলনায় অনেক দুর্বল ইউক্রেইনের সেনাবাহিনী ‘ধারণার চেয়ে কড়া’ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। সেনাদের পাশপাশি দেশটির সাধারণ মানুষও দেশরক্ষার যু্দ্ধে যোগ দিয়েছেন।
কোন বিশ্বাস থেকে দুর্বল ইউক্রেইন শাক্তিশালী রাশিয়ার বিরুদ্ধে এতটা কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হল, তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ এর সাংবাদিক মিশেল গোল্ডবার্গ। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
এ বিষয়ে গত রোববার তিনি কথা বলেন ইউক্রেইনের দার্শনিক এবং ইংরেজি ভাষার নিউজ ওয়েবসাইট ‘ইউক্রেইনওয়ার্ল্ড’ এর প্রধান সম্পাদক ভলোদিমির ইয়ারমোলেনকোর সঙ্গে।
ইয়ারমোলেনকো বলেন, ‘‘তাদের মনোবল খুবই দৃঢ়, এটাকে তারা নিয়তি বলে মেনে নিচ্ছে না, রাশিয়া যেসব শর্ত দিয়েছে সেগুলো নিয়ে আলোচনার কোনও ইচ্ছাও তাদের নেই। তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরা ঠিক করতে চায়।”
‘‘ইউক্রেইনের নাগরিকরা মূলত দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। তারা নিষ্ঠুর বিদেশি শক্তির আগ্রাসন থেকে নিজেদের দেশ এবং নিজেদের জীবনকে রক্ষা করতে চাইছে।”
ইউক্রেইনের এই রুখে দাঁড়ানোই কী ওই অঞ্চলে কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটাবে? পতন ঘটবে পুতিন বা লুকাশেঙ্কোর মত কর্তৃত্ববাদী শাসকগোষ্ঠীর? ইয়ারমোলেনকো তেমনটাই মনে করেন।
আড়াই বছর আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি তেমন ভবিষ্যতের কথাই বলেছিলেন, বলেন মিশেল গোল্ডবার্গ।
তিনি জানান, ২০১৯ সালে ভলোদিমির জেলেনস্কি যখন ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তখন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকলীন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তাকে নিয়ে উপহাস করেছিলেন। ইউক্রেইনের সাধারণ মানুষ বিষয়টি কেমন চোখে দেখছেন সেটা জানতে তিনি ২০১৯ সালে কিয়েভ গিয়েছিলেন। তখনও কথা হয় দার্শনিক ইয়ারমোলেনকোর সঙ্গে।
ইয়ারমোলেনকো তখন বলেছিলেন, বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র এবং কর্তৃত্ববাদের মধ্যে যে যুদ্ধ চলছে তার সম্মুখসারিতে দাঁড়িয়ে আছে ইউক্রেইন। ‘‘ওই যুদ্ধের একদিকে দাঁড়িয়ে ইউরোপ অন্য দিকে রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন। আর ডনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বিভ্রান্তিকর এবং অস্পষ্ট।”
ওই সময় তিনি ইউক্রেইনের ভবিষ্যৎ নিয়ে বলেছিলেন, ‘‘বিষয়টা হলো অনেকটা এমন যে, গণতন্ত্র এবং আইনের শাসন আরও পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ছে কিনা। কীভাবে এটি পূর্ব ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে সেটা এক লম্বা গল্প...এটা প্রথমে পূর্ব ইউরোপে, তারপর মধ্য ইউরোপে এবং তারপর ইউক্রেইন, জর্জিয়া ও মলডোভায়। আমরা আশা করছি একদিন এটা রাশিয়াতেও পৌঁছে যাবে।”
ইয়েরমোলেনকো এসব কথা যখন বলেছেন, তখন ইউক্রেইনের পরিস্থিতি শান্তই ছিল। এখন যুদ্ধ শুরুর পর তিনি বলছেন, ‘‘আমি নিশ্চিত এ যুদ্ধে ইউক্রেইনই জিতবে এবং আমার জোর বিশ্বাস, যদি ইউক্রেইন জেতে তবে সেটা পুতিন এবং লুকাশেঙ্কো (বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো) উভয়ের পতন ডেকে আনবে।”
পুতিন ঘনিষ্ঠ লুকাশেঙ্কোও নিজ দেশে বিরোধী মতকে কঠোর হাতে দমন করেন। ইউক্রেইনের গোয়েন্দারা বলছেন, লুকাশেঙ্কোর বেলারুশও পুতিনের সঙ্গে যোগ দিয়ে ইউক্রেইনে আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
শুধু ইয়েরমোলেনকো নন বরং ইউক্রেইনের ৭০ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন, তারা রুশ আগ্রাসন রুখে দিতে পারবেন। সম্প্রতি এক জনমত জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।
ইউক্রেইন পার্লামন্টের সদস্য অলেকসান্দ্রা উসতিনোভা বর্তমানে ওয়াশিংটনে আছেন এবং সেখানে ইউক্রেইনের পক্ষে কূটনীতিক প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
তিনি বলেন, ‘‘পুতিন ভেবেছিলেন তিনি খুব সহজে আমাদের দেশ দখল করে নেবেন। কিন্তু ইউক্রেইনের মানুষ প্রমাণ করেছে যে, তারা ছেড়ে কথা কইবে না। আমরা বিশ্বাস করি, এই যুদ্ধে আমরাই জিতব।”
উসতিনোভার এই বিশ্বাস বাস্তব রূপ পাবে কিনা সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে এখন পর্যন্ত যা দেখা যাচ্ছে, ইউক্রেইনের বাহিনী ও বেসামরিকদের তুমুল প্রতিরোধের পাশাপাশি রুশ বাহিনীকে রসদ সমস্যারও মোকাবেলা করতে হচ্ছে; অগ্রবর্তী সেনাদের তেল, গুলি ও খাদ্যও ফুরিয়ে যাচ্ছে। ফলে রুশ বাহিনী যেভাবে শুরু করেছিল এখন তাদের আগ্রাসনের গতি অনেক কমে গেছে।
কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, ইউক্রেইনের সেনাবাহিনী শক্তিতে এখন রুশ বাহিনীর সমকক্ষ। বরং রুশ বাহিনীর তুলনায় তারা এখনও অনেক দুর্বল এবং পুতিন চাইলে পুরো ইউক্রেইনের উপর গোলার বর্ষণ করতে পারেন।
তবে ইউক্রেইনের মানুষদের এই বিশ্বাস ও মনোবল যুদ্ধের রাজনীতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্তত যারা বলেছিলেন, রাশিয়া দ্রুত ইউক্রেইন দখল করে নেবে তাদের কথা মেলেনি। একইসঙ্গে এই বিশ্বাসের জোরেই হয়ত পুরো বিশ্ব রাশিয়ার বিরুদ্ধে একজোট হয়েছে।
মিশেল গোল্ডবার্গ বলেন, গত দুইতিন বছরে যারা কিয়েভ সফরে গিয়েছেন তারা দেখতে পেয়েছেন, সেখানকার মানুষ ২০১৪ সালে রুশপন্থি প্রেসিডেন্ট ভিক্টোর ইয়ানুকোভিচের বিরুদ্ধে হওয়া গণআন্দোলনকে কতটা সম্মানের চোখে দেখে, গর্বিত হয়। গণআন্দোলনের মুখে ইয়ানুকোভিচ রাশিয়া পালিয়ে গিয়েছিলেন।
যদিও সব ইউক্রেইনীয় ওই আন্দোলনে সমর্থন দেননি। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ ও পূর্ব অংশের মানুষরা। কিন্তু রাশিয়ার বিরুদ্ধে যারা রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তাদের প্রতি দেশজুড়ে শ্রদ্ধার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
দুই দশকের কম সময়ের মধ্যে ইউক্রেইন দুই দুটি গণআন্দোলন দেখেছে। যার একটি ছিল ইয়ানুকোভিচের ভোট চুরির বিরুদ্ধে ২০০৪ সালে ‘অরেঞ্জ রেভ্যুলেশন’।
ইউক্রেইনের সাংবাদিক এবং ‘লস্ট আইল্যান্ড: টেলস ফ্রম দ্য অকুপাইড ক্রিমিয়া’ এর লেখিকা নাতালিয়া গুমেনিয়ক বলেন, ‘‘ওই দুই গণআন্দোলন ইউক্রেইনের নাগরিকদের নিজেদের অধিকারের দাবিতে কঠোর হতে শিখিয়েছে।”
‘‘ইউক্রেইনীয়দের মধ্যে স্বৈরাশাসকের পতন ঘটানো এবং নজিরবিহীন কিছু করে দেখানো নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব গড়ে উঠেছে।”
ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি সরাসরি রাশিয়া ও বেলারুশের সাধারণ মানুষের কাছে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অনুরোধ করেছেন। যেটাও প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন নাতালিয়া।
তিনি বলেন, ‘‘আমরা সত্যিই বিশ্বাস করি, যদি জনগণ, স্বাধীন জনগণ উঠে দাঁড়ায়, তবে তারা তাদের নেতাদের নত হতে বাধ্য করতে পারে। কারণ আমাদের সঙ্গেও এমনটা হয়েছে।”
তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়, যে গণতান্ত্রিক ইউক্রেইন এতদিন পুতিনের জন্য কোনও হুমকিই ছিল না, এখন সেটাই হয়ে উঠেছে। এবং ইউক্রেইনের জিতে যাওয়া মানে পুতিনের জন্য অসম্মানের।
জাতিগত নানা বিষয় নিয়ে ইউক্রেইনের ভেতরেও দ্বন্দ্ব আছে। কিন্তু রাশিয়ার বিরুদ্ধে জিতে যাওয়ার যে দৃঢ়বিশ্বাস তাদের মধ্যে গড়ে উঠেছে, তা তাদের সমানে বাস্তব যুদ্ধ জয়ের সত্যিকারের এক সুযোগ এনে দিয়েছে।
