Loading...

কেতাদুরস্ত: ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের 'কেতাদুরস্ত' বয়ান

| Updated: February 27, 2022 10:14:06


কেতাদুরস্ত: ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের 'কেতাদুরস্ত' বয়ান

উপরের লাইনটি 'কেতাদুরস্ত' উপন্যাসের একদম শেষ দুই লাইন। এ বছর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত যেসব বই বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে তার একটি হলো কেতাদুরস্ত। নবীন লেখক তানভির অনয়ের লেখা এই বইটি প্রকাশ করেছে পেন্ডুলাম পাবলিশার্স। তানভির অয়নের লেখা প্রথম হলেও প্রকাশিত তৃতীয় গ্রন্থ এটি।

উপরের লাইন দুটো বইটি সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা পাঠককে দিতে পারে। লেখক বইটি লিখেছেন একটি কিশোরোপোযোগী উপন্যাস হিসেবে। তবে একটি স্বনামধন্য স্কুল ও কলেজের মোড়কে সেখানে উঠে এসেছে ক্ষমতা কাঠামোর নির্মম নিয়ন্ত্রণের চিত্রও।  

উপন্যাসের চরিত্রগুলোয় আছে বৈচিত্র্য - অরিত্র, জারিফ, শুভ্র, রাফিদ, সুলেখা, সুপ্তি, দীপিকা, জাস্টিনসহ আরো অনেকের আনাগোনা। আরো আছে কলেজ প্রিন্সিপাল জাকির আহাম্মদ, গভর্নিং বডির প্রধান রহিকুল কবির ও নবনিযুক্ত প্রিন্সিপাল মোহনার মতো কিছু চরিত্র। 

উপন্যাসের শুরু এইচএসসি ব্যাচের ফল প্রকাশ ও উদযাপনের আনন্দোল্লাসের মধ্য দিয়ে। তার ভেতর একে একে চরিত্রগুলোর প্রবেশ ও প্রকাশ। ভাবুক-চিন্তক অরিত্র কিংবা পেশিশক্তি নির্ভর রাফিদ- উভয়ই এক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী।

ঘটনা মোড় নেয় একটি স্টুডেন্ট কাউন্সিল নির্বাচন নিয়ে৷ অরিত্র ও রাফিদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভেতর দিয়ে নির্বাচনে যোগ্যতা বনাম জৌলুশের লড়াই দেখিয়েছেন তিনি। কে শেষপর্যন্ত কাউন্সিলর হলো আর কীভাবে নবনিযুক্ত প্রিন্সিপাল মোহনার সাথে কাজ করলো সেসব নিয়েই কাহিনীর এগিয়ে যাওয়া।

এখানে শিক্ষকের যোগসাজশে নির্বাচনে কারচুপির ব্যাপারটিও লেখক এনেছেন। দিনশেষে যোগ্যতার প্রতি মানুষের আস্থার আশাবাদ রেখেছেন।

তবে লেখক এক্ষেত্রে নাটকীয় আবহ সৃষ্টির জন্য অনেকক্ষেত্রে বেশিমাত্রায় প্রশ্নের ব্যবহার করেছেন। যেমন- 'কেন, কেন, কেন?' এদিকে তিনি আরো সতর্ক হতে পারতেন।

ইয়েল ইউনিভার্সিটির গ্র‍্যাজুয়েট মোহনা কলেজের প্রিন্সিপাল হন তার প্রভাবশালী মামা রহিকুল কবিরের রেফারেন্সে। বড় পদ যে মানুষের মন উন্নত করতে পারেনা, সেটি রহিকুলকে দেখলে বোঝা যায়। ভাগনী মোহনার টিপ-শাড়ির হাতা নিয়ে ভ্রূ কুঁচকানো হওয়া কিংবা 'তুই তো আমেরিকা থেকে পজেটিভিটির ট্যাংকি নিয়ে এসেছিস'- এসব কথাতেই এটা বোঝা যায়।

লেখকের লেখার ধরন থেকে এটা স্পষ্ট যে, তিনি লেখায় অনেক কিছু আনতে চেয়েছেন। মোহনার তার বন্ধুদের সাথে দেশিয় বিভিন্ন বিষয়ের আলাপ আমাদের চোখে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক চরিত্র হাজির করে। বড় সেমিনার বা তত্ত্বীয় আলাপ যে দিনশেষে গণ্ডিবদ্ধ হয়ে বইয়ের পাতায় আর মঞ্চের কথাতেই থাকে; তাও স্পষ্ট হয়।  

কাউন্সিলর নির্বাচনের পর লেখক স্পর্শকাতর বিভিন্ন ইস্যুকে কাউন্সিলের মাধ্যমে লেখায় এনেছেন। এসব ঘটনায় আরো কিছুটা ব্যাখ্যার প্রয়োজন ছিলো। বিশেষত উপন্যাসের শেষদিকে কলেজে হতে যাওয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আর সড়ক দুর্ঘটনায় অন্যতম প্রধান একটি চরিত্রের মৃত্যুর ঘটনা আরো বড় পরিসর দাবি করে।

তবে ক্ষমতার নগ্ন চিত্র ও পদের কাছে মানুষের নত হওয়া এই দুটো ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়। ইয়েল-ফেরত উদার ও মুক্তমনা মোহনার করা শিক্ষার্থী বহিষ্কার কিংবা আন্দোলন দমন এসব বিষয়কে আরো প্রতিষ্ঠিত করে।

উপন্যাসের ক্লাইম্যাক্স অতি নাটকীয় হয়েছে বলা চলে। এক্ষেত্রে লেখক অতিরিক্ত চমক দিতে চেয়েছেন- যা পাঠককে ডক্টর ফাউস্ট বা জিওদার্নো ব্রুনোর কথা মনে করাতে পারে।

তবে মানুষের ব্যক্তিগত বিবেক ও বোধশক্তি যে ক্ষমতার নিগড়েই বন্দী এবং সিস্টেমের ভেতরে থেকে যে অবকাঠামো পরিবর্তন করা যায়না- সেটাই মূলত উপন্যাসে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে সাবলীল এই উপন্যাসটি একটানে পড়ার পর পাঠক একরকম শূন্যতা বোধ করতে পারেন। বইটি তাদের আমোদের তৃপ্তি নয়, বরং মানুষ হিসেবে ক্ষুদ্রতা ও অসহয়তাকে স্মরণ করিয়ে দেবে।

সবশেষে বইটির একটি প্রবাদতুল্য এপিগ্রাম দিয়েই শেষ করা যাক- ' ন্যায় বা অন্যায় বলতে কিছুই নেই। ক্ষমতাই সব নিয়ন্ত্রণ করে। কেউ ক্ষমতা গ্রহণ করেনা, ক্ষমতা ব্যক্তিকে গ্রহণ করে।'

মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।

mahmudnewaz939@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic