চাওয়া-পাওয়ার তালমিল না থাকার কারণে নিজের সাথে নিজেরই হরেকরকম দ্বন্দ্ব নিয়ে আমরা চলি, অনেকেই হয়তো আবার দিনদুনিয়া ভুলে হয়ে যাইউদাসীন। তবে দিনশেষে সব ফন্দিফিকির করে এই আমরাই আসলে নিজেকে সবচেয়ে বেশি উৎপাদনক্ষম হিসেবে দেখতে চাই। ইংরেজি পরিভাষায় যাকে বলে প্রোডাকটিভিটি।
আজকের লেখায় মূলত নিজেকে ঠিক কী কৌশলে আরও বেশি প্রোডাকটিভ বা উৎপাদনক্ষম হিসেবে তৈরি করা যায়, সে নিয়েই কথা বলব।
ক্রিয়া এবং প্রতিক্রিয়া, চলার পথে গুরুত্বপূর্ণ দু'টো শব্দ। ক্রিয়া হলো এমন একটি ব্যাপার, যেখানে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় প্রণোদিত হয়ে কাজ করতে থাকে এবং গভীর দৃষ্টি স্থাপনের মাধ্যমে নিজেই নিজের ভুলভ্রান্তি শোধরানোর চেষ্টা করে। অন্যদিকে, প্রতিক্রিয়া তার উল্টো। মানুষভেদে প্রকার খুঁজতে গেলে, হয়তো পৃথিবীতে এমন মানুষের সংখ্যাই ভারি যারা ক্রিয়ার চাইতে প্রতিক্রিয়ায় চালিত হয় বেশি। প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বাসী লোকেরা মূলত অন্য কেউ কী বলে, কিংবা অন্য কারো মতামতের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে নিজের কর্মকে বিচার করে। যা কিনা উৎপাদনশীলতা বিষয়টির সঙ্গে পুরোদস্তুর সাংঘর্ষিক। ব্যক্তি ঠিক তখনই নিজের থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণ আউটপুট দাবি করতে পারে, যখন সে সম্পূর্ণই নিজের প্রেষণায় চলে। তাই, অন্যের প্রতিক্রিয়ার উপর চোখ রাখলেও তা যেন নিজের নিজস্বতাকে নষ্ট না করে, সেদিকে দৃষ্টি রাখা দরকার।
কোনো একটি কাজে বিশেষ দখল থাকা সত্ত্বেও, অনেকসময় বিভিন্ন ধরনের কাজ (অকাজ বলাই বেশি শ্রেয়) একসাথে করার ফলে, মূল কাজটি আর সুন্দর সমাপনের মুখ দেখে না। এতে করে আমরা আমাদের সম্ভাবনাময় কোনো ব্যাপারকে বিষিয়ে তুলি। নিজের প্রোডাকটিভ ক্ষমতাকে আরও অগ্রসর করতে, অবশ্যই পাশাপাশি বলে কিছু রাখা উচিত নয়। অর্থাৎ, আপনি যখন কোনো একটি কাজ করা শুরু করবেন, সে কাজটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্য কোনো কাজে মনোযোগ না দেয়াই ভালো হবে। তবে এক্ষেত্রে বর্তমানে বহুল প্রচলিত শব্দ মাল্টিটাস্কিং বা একসাথে অনেকগুলো কাজ করার জয়গান যে হচ্ছে, সে বিষয়টিও এড়িয়ে গেলে চলবে না। ব্যক্তিভেদে, ব্যক্তির সক্ষমতা অনুযায়ী কাজের ধরন হওয়াই শ্রেয়।
নিজের কাছ থেকে ভালো কিছু পাবার সুন্দর কৌশলটি হচ্ছে, চাপমুক্ত থাকা। কিন্তু অনেকসময় আমরা জেনে না জেনে অসংখ্য লক্ষ্য নিজের জন্য প্রস্তুত রাখি। যা কিনা আমাদের পথচলাকে অমসৃণ করে তোলে। তাই ব্যক্তি যদি নিজের প্রোডাকটিভ ক্ষমতার বৃদ্ধি ঘটাতে চায়, তবে অবশ্যই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লক্ষ্য সামনে রেখে এগোনো উত্তম হবে।
পৃথিবীতে নিখুঁত বলে কিছু নেই। তবে আমাদের আশেপাশে এমন অনেককেই দেখি, যারা কিনা সবসময়ই নিজেদের সকল কর্মে শতভাগ নিখুঁত হতে চায়। এমন চাওয়া অবশ্য খারাপ কিছু নয়, তবে অতিমাত্রায় যখন এটি নেশা বা আচ্ছন্নতার রূপ নেয়, তখন ব্যক্তি চাইলেও নতুন কিছু করার রসদ জোগাতে পারে না। এতে করে একই বৃত্তে বারবার ঘুরপাক খেতে খেতে সেই ব্যক্তিটি একসময় হতাশ হয়ে পড়ে, যা বরাবরই উৎপাদনশীলতার পথে অন্তরায়। সুতরাং যা-ই করা হোক না কেন, তা কোনোদিনই শতভাগ ত্রুটিমুক্ত হতে পারে না এমন ভাবনাই মানুষকে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী ও অগ্রসরমান করে তুলতে পারে।
কাজ না করা যেমন কাজের কথা নয়, আবার অতিমাত্রায় কাজ করাও কাজের কিছু নয়। ব্যক্তি যখন একটানা কোনো কাজ করতে থাকে, তখন স্বাভাবিক কারণেই কাজটিতে সে নিজেকে সম্পূর্ণ মেলে ধরতে পারে না। ফলে আদতে যে পরিমাণ কাজ করা সম্ভব ছিল, তা আর হয়ে ওঠে না। যেকোনো কাজে, অল্প সময় বিরতি ধরে এগিয়ে গেলে, সে কাজ পরিমাণে বেশি হবার পাশাপাশি ভালো ও সঠিক হবার সম্ভাবনাও বাড়ে।
আমরা যদি কাজের ক্ষেত্রে নিজেই নিজের জন্য একটি সময় বেঁধে দিই, তাহলে কেমন হয়? হয়তো সময় নির্ধারণের প্রয়োজন না-ও থাকতে পারে। কিন্তু এ কাজটি আমরা করব একান্তই নিজের স্বার্থে। কোনো কাজ শুরু করার আগে মাথায় যদি সেটি সম্পাদনের চূড়ান্ত সময় লিপিবদ্ধ থাকে, তবে ব্যক্তি তখন বেশ ভালো প্রোডাকটিভ আচরণ করতে পারে।
জন্মগতভাবে অনেকের মধ্যেই বিশেষ কিছু গুন থাকে, একথা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু, প্রতিটি গুনকে আরও গুণ করার সুযোগ অবশ্যই রয়েছে। নির্দিষ্ট করে বললে, যা আছে, তাকে আরও বেশি মজবুত করার মাধ্যমেই ব্যক্তি তার উৎপাদন ক্ষমতার বৃদ্ধি ঘটাতে পারে।
জীবনের সব গলি আমাদের আপন না-ও হতে পারে, আবার কিছু মোড় হয়তো আমাদের নিজ থেকেই আপন করে নেয়। তাই যাপনের তাগিদে, সবসময় যে পছন্দের কর্মের সাথে দেখা হয়, এমন নয়। পছন্দ না হলেও স্থির থেকে, ঠাণ্ডা মাথায় কোনো কাজে চোখ রাখা গেলে, ধীরে ধীরে সে কাজেও ভালোলাগা তৈরি হতে পারে।
সঞ্জয় দত্ত ইংরেজি ও সাহিত্য বিষয়ে পড়াশোনা করছেন।
sanjoydatta0001@gmail.com