প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে ১জি থেকে ৪জি পর্যন্ত গতির ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা পেয়েছে ব্যবহারকারীরা। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে ইতোমধ্যে ৫জি নেটওয়ার্কের উন্মোচন হয়ে গেছে। গত বছর ডিসেম্বরে বাংলাদেশে প্রথম টেলিটক কোম্পানি ৫জি সেবা প্রদানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়।
সেলুলার নেটওয়ার্কের প্রথম প্রজন্ম অর্থাৎ ১জি দিয়ে কেবল কথা বলা সম্ভব ছিল। তারপর দ্বিতীয় প্রজন্ম বা ২জি’তে লিখিত বার্তা বা টেক্সট ম্যাসেজিং এর সুবিধা যোগ করা হয়। ৩জি নেটওয়ার্কে প্রথম ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ মেলে।
এরপর তুলনামূলক দ্রুতগতির সেবা প্রদানের উদ্দেশ্যে হাজির হয় ৪জি। যার মাধ্যমে কম সময়ে বড় আকৃতির ফাইল অন্য ডিভাইসে স্থানান্তর করার সুবিধার পাশাপাশি একাধিক ডিভাইস সংযোগের সুবিধা প্রদান করা হয়।
এরপর এলো ৫জি। যদিও কারা প্রথম এই নেটওয়ার্ক ব্যবহারকারীদের কাছে উন্মোচন করেছে তা নিয়ে তর্কের শেষ নেই। ২০১৯ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার দাবি অনুযায়ী চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের আগে তারা ৫জি হ্যান্ডসেটের মাধ্যমে প্রথম এই সেবা প্রদান করে।
আবার যুক্তরাষ্ট্রের এটি এন্ড টি এবং ভ্যারাইজন কমিউনিকেশন প্রতিষ্ঠানের কথা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ার কয়েক মাস আগে ৫জি সেবার ঘোষণা দেয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রে ৫জি নেটওয়ার্ক প্রথম ব্যবহার করা হয় মোবাইল হটস্পট ডিভাইসের মাধ্যমে।
সকলের কাছে নিছক তর্ক মনে হলেও ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অনেক গুরুত্ববহ। তাদের গবেষণা মোতাবেক, ৫জি সেবা প্রদানের মাধ্যমে ২০৩৫ সাল নাগাদ প্রায় সাড়ে ১২শ ট্রিলিয়ন ডলারের মুনাফা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রযুক্তিবিদদের মতে, ৫জি বা পঞ্চম প্রজন্মের নেটওয়ার্ক হবে ৪জির তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেশি দ্রুতগতির। ৪জি নেটওয়ার্কে প্রতিক্রিয়া প্রদানের গতি যেখানে ৫০ মিলিসেকেন্ড। সেখানে ৫জি নেটওয়ার্কে হবে মাত্র ১ মিলিসেকেন্ড যা চোখের পলক পড়ার থেকে ৪০০ গুণ দ্রুত।
৩জি নেটওয়ার্কে যেখানে ইন্টারনেট গতি ছিল মাত্র ২ এমবিপিএস, ৪জি’তে সেটি হয় ৩০ এমবিপিএস। তবে ৫জি নেটওয়ার্কে ইন্টারনেটের গতি হবে ৬০ এমবিপিএস থেকে ১জিবিপিএস।
সহজ ভাষায়, ৩জি দিয়ে ১২০ মিনিটের একটি সিনেমা ডাউনলোড করতে যেখানে লাগবে প্রায় ২৬ ঘণ্টা, সেখানে ৪জি নেটওয়ার্কে লাগে ৬ মিনিট। আর ৫জি’তে লাগবে মাত্র ৩ দশমিক ৬ সেকেন্ড!
বিশ্বের ৬১টি দেশে চলমান দ্রুতগতির এই সেবা এক কথায় কাল্পনিক জগতকে বাস্তবে রূপায়িত করতে যাচ্ছে। ইন্টারনেট অব থিংস (IOT) এর মাধ্যমে মোবাইল ফোন দিয়েই বাড়ির ইলেকট্রনিক জিনিসপত্র নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
স্বচালিত গাড়িও নিয়ন্ত্রিত হবে ৫জি নেটওয়ার্ক দিয়ে। মেটাভার্সের ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মাধ্যমে অফিস-আদালতের সব কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। তবে এজন্য ৪জির থেকেও কম শক্তি ব্যয় হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ তো গেল সুবিধার কথা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ৫জি নেটওয়ার্কের আবির্ভাবে এক নতুন দুনিয়ায় প্রবেশদ্বার উন্মোচিত হওয়ার গুঞ্জন সর্বত্র শোনা গেলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঠিক কতটা ফলপ্রসূ হবে এই গতি?
একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে টেলিটকের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ রেজাউল করিম রিজভী বলেন, “চলতি বছর পরীক্ষামূলক এবং আগামী বছর সীমিত আকারে ৫জি সেবা চালু হলেও এর ইকোসিস্টেম তৈরি হতে ২০২৫ সাল পর্যন্ত লাগবে।”
তারহীন ব্যবস্থাকে পাকাপোক্ত করা ৫জির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বাধাহীন যোগাযোগ। অর্থাৎ, ইন্টারনেট সেবা প্রদানে মোবাইল টাওয়ার থেকে ডিভাইসের মধ্যবর্তী স্থানে বাধা থাকলে গতি কমে যেতে পারে।
আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলেও এই সেবা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এমনকি ৫জি টাওয়ারের জন্য আকাশপথের যোগাযোগব্যবস্থাও বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
শহরাঞ্চলেই যেখানে ঠিকমতো ইন্টারনেট ব্রাউজ করা যায় না সেখানে প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে হাল আমলের ১জি কিংবা ২জি দিয়েই কাজ চালাতে হয়। বর্তমানে চলমান ৪জি নেটওয়ার্ক আসল ৪জি কি না তা নিয়েও রয়েছে ব্যাপক তর্কবিতর্ক।
স্পিডেস্ট গ্লোবাল ইনডেক্স এর সর্বশেষ তালিকায় ১৩৯ দেশের মাঝে ইন্টারনেট গতিতে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৫।
এরই মাঝে ৫জির কথা শোনা গেলেও তা বাস্তবায়ন হবে কিনা কিংবা হলেও তা মানসম্পন্ন হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় থাকছেই।
আসরিফা সুলতানা রিয়া বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নরত।
asrifasultanareya@gmail.com
