Loading...
The Financial Express

কিছুক্ষণ রেস্তোরাঁ

| Updated: July 17, 2022 15:25:04


কিছুক্ষণ রেস্তোরাঁ, ছবি: লেখক কিছুক্ষণ রেস্তোরাঁ, ছবি: লেখক

'আর কিছুক্ষণ কি রবে বন্ধু, আরো কিছু কথা কি হবে?'- দীর্ঘদিন পর কারো সাথে দেখা হয়ে গেলে মনের মধ্যে জমে থাকা কথাগুলো সব এক নিমেষেই বেরিয়ে আসতে চায়। আর জেমসের এই গানটার কথাগুলোর মতই জমে থাকা কথাগুলো শেষ হয়েও হয়না শেষ। আর সেজন্য দরকার হয় এমন কোনো একটা জায়গার, যেখানে বেশ কিছুটা সময় বসে কথা বলা যায়। সাথে যদি থাকে একটু তেলেভাজা, সুপ বা চা - তাহলে তো আরো ভালোই হয়।

অবসরে কিছুটা সময় কাটানোর এমন ভাবনা থেকেই আজ থেকে চুয়াল্লিশ বছর আগে নারায়ণ চন্দ্র ঘোষ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রেস্তোঁরা 'কিছুক্ষণ।' পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ার ৩৪/১ কেশব ব্যানার্জী রোডে অবস্থিত এই ছোট্ট দোকানটি। একপাশে দুটি কাঠের টেবিল, আরেক পাশে আড়াআড়ি আরেকটি বড় টেবিল। ছোটগুলোতে চারজন ও বড়টিতে ৮ - ১০ জন বসা যায়।

মূলত কোলকাতার বোস কেবিন এর মত জায়গা থেকে অণুপ্রাণিত হয়েই নারায়ণবাবু ভেবেছিলেন এমন একটি রেস্তোঁরা করার কথা, যেখানে মানুষজন ঘরোয়া বৈঠকী পরিবেশে আড্ডা দিতে পারবেন। 

সেই ভাবনা থেকেই ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন 'কিছুক্ষণ।'

নামটি দিয়েছিলেন প্রখ্যাত গল্পকার কায়েস আহমেদ (১৯৪৮ - ৯২)। কায়েস আহমেদ এই এলাকার কাছেই থাকতেন। আরেক কিংবদন্তী ঔপনাসিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের (১৯৪৩-৯৭) সাথে তিনি ও নারায়ণবাবু আড্ডা দিতেন সামনে থাকা দোকান ইউনাইটেড মেডিকেল হলে। 

সেখান থেকেই এই চিন্তার সূত্রপাত ও কায়েস আহমেদের দেয়া নামে শুরু হলো 'কিছুক্ষণ।'






শুরু থেকেই রেস্তোরাঁটি তাদের বিকেলের নাস্তাগুলোর জন্য আলাদা খ্যাতি পেয়ে যায়। একসময় আট আনায় চপ ও এক টাকায় কাটলেট পাওয়া যেত। এত বছর পরেও অবশ্য দাম খুব বেশি বাড়েনি। চপ এখন ১০ টাকা, কাটলেট ২০ টাকা। আর আছে তাদের বিখ্যাত চিকেন এন্ড এগ সুপ। এই সুপের বিশেষত্ব হলো এখানে মুরগির মাংসের ছোট ছোট টুকরো থাকে ও উপরে একটি ডিম ভেঙে দেয়া হয়। এটি এখন ৪০ টাকা ও ৬০ টাকা বাটি হিসেবে পাওয়া যায়।

এই অভিনব রেসিপিটি ছিলো এখানকার প্রথম বাবুর্চি বিমল ডি কস্টার। উনি প্রথম দশ বছর ছিলেন এখানকার বাবুর্চি। তারপর বিভিন্নসময় বাবুর্চি পরিবর্তন হয়েছে। তবে বিমলের সেসব রেসিপিই এখনো অনুসরণ করা হয়৷ বর্তমান বাবুর্চি মোহাম্মদ শহীদও সেটিই করছেন।

রেস্তোঁরাটি সকাল ৭ টা থেকে ১১ টা ও বিকেল ৫ টা থেকে রাত ৮ টা/ ৯ টা পর্যন্ত খোলা থাকে। সকালে মূলত নাস্তা অর্থাৎ, পরোটা, ডাল, সবজি পাওয়া যায়। আর আলাদাভাবে পরিচিত আইটেমগুলো পাওয়া যায় বিকেলের পর। তাদের মোগলাইও বেশ জনপ্রিয়। ৬০ টাকা করে। তবে একসাথে বেশি বানানো হয়না। আগেই অর্ডার দিয়ে রাখতে হয়।

দোকানটি বর্তমানে দেখভাল করছেন নারায়ণ চন্দ্র ঘোষের ছেলে স্বপন চন্দ্র ঘোষ। তার কাছ থেকে জানা গেলো এক মর্মান্তিক ঘটনার পর তার এই দোকানের দায়িত্ব নেয়ার কথা।

১৯৯৬ সালের ১১ ডিসেম্বর। প্রচণ্ড শীতের এক সকালে নারায়ণবাবু দাঁড়িয়ে ছিলেন দোকানের ঠিক সামনেই। কুয়াশাচ্ছন্ন সেই সকালে একটি ট্রাক বেপরোয়াভাবে ধাক্কা দেয় তাকে। উনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। তারপর স্বপন চন্দ্র ঘোষকেই ব্যবসার হাল ধরতে হয়। তার কথা থেকে জানা গেলো, ঘাতক ড্রাইভারের দুবছরের সাজা হয়েছিল।




রেস্তোঁরাটির খাবারের বাইরেও আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো দুদিকের দেয়ালে টানানো ছবিগুলো। একদিকে উত্তম কুমার, কাজী নজরুল ইসলাম । আরেকদিকে আবার শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য, সত্যজিৎ রায়৷ এছাড়াও আরো বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ আছেন সেখানে।

স্বপন বাবু জানালেন, "বাবা সাহিত্য-শিল্পের খুব সমঝদার ছিলেন। ফরাশগঞ্জে থিয়েটার করতেন। আদিবাড়ি ছিলো আসামে। শরৎচন্দ্রের লেখা পড়তেন খুব। উত্তম কুমারের মহাভক্ত ছিলেন। তাই তাদেরসহ আরো বিভিন্ন রথী-মহারথীদের ছবি টানানো। আর কায়েস আহমেদ বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসরা তো প্রায়ই আড্ডা দিতেন এখানে এসে। তারা ছিলেন বাবার বন্ধুস্থানীয়। ক্রিকেটার আমিনুল ইসলাম বুলবুলও এখানে এসেছেন বিভিন্ন সময়।"

এখনো স্থানীয়দের কাছে শেষ বিকেলের আড্ডার জন্য বিশেষ স্থান ধরে রেখেছে এই রেস্তোরাঁ। এর পেছনে তুলনামূলক স্বল্পমূল্য যেমন একটি ব্যাপার, আবার খাবারের স্বাদও ব্যাপার। মাত্র ২০ টাকাতেই যেমন এখানে পাওয়া যায় চিকেন কাটলেট। মাংসের ভাগটা খারাপ না এতে। তাদের আলাদা একটি বিটলবণ আছে, যা যেকোন আইটেমেরই স্বাদ অনেকগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

কাজেই হতেই পারে কোন এক বিকেলে 'কিছুক্ষণ' রেস্তোরাঁয় কিছুক্ষণ আড্ডা। সাথে থাকলো চপ, কাটলেট, স্যুপ বা মোগলাই।

মাহমুদ নেওয়াজ জয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত

mahmudnewaz939@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic