ঢাকায় একটি পত্রিকা অফিসে সহ-সম্পাদনার কাজ করেন রাফসান তুষার। কাজের প্রয়োজনে পুরো কর্মঘণ্টাই তাকে ডেস্কে বসে কাজ করতে হয়। সম্প্রতি তিনি কোমর ব্যথায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ডাক্তার তাকে বলেছেন, দীর্ঘসময় একটানা বসে কাজ করার কারণে এই সমস্যা হয়েছে। তিনি বলেন, আমি আসলে আমার কাজের পুরোটা সময় একটানা বসে কাজ করতাম। কোনো বিরতি নিতাম না। যার কারণে এই সমস্যা দেখা দিয়েছে।
করোনার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় বাসায় বসে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেছেন নাজমুল হাসান সজিব। তিনি প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ করেন। কিন্তু সম্প্রতি তিনি বেশ কিছু শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতায় ভুগছেন। এসব সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে তাকে চিকিৎসক কারণ হিসেবে বলেছেন, বিরতি ছাড়া একটানা কাজ করার কারণে এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এই দুজনের মতো অনেকেই হয়তো টানা কাজ করার কারনে বিভিন্ন অসুস্থতাসহ নানা সমস্যায় পড়ছেন। কিন্তু নিয়ম করে কাজের মাঝে বিরতি নিলে তা থেকে অনেকটা মুক্তি পাওয়া সম্ভব। আজকের এ লেখায় আমরা কাজে কেন বিরতি নেবেন এবং কী উপায়ে কত সময় বিরতি নেওয়া ভালো, এ বিষয়ে আলোচনা করবো।
কেন বিরতি নেবেন
সম্প্রতি মাইক্রোসফটের হিউম্যান ফ্যাক্টর ল্যাবের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, যদি কোনো মানুষ একটানা দীর্ঘক্ষণ কাজ করেন, কিন্তু বিরতি না নেন- তাহলে তার মেজাজ বিগড়ে যেতে পারে। কিন্তু বিপরীতে কাজে বিরতি দিলে ব্যক্তির কার্যক্ষমতা, এমনকি সৃষ্টিশীলতাও বৃদ্ধি পায়।
রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের ডা. রাফিয়া আলমের মতে, দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে থাকা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অনেকে বাসায় কিংবা অফিসে টানা বসে কাজ করতে হয়। একটানা বসে কার ফলে মুটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। পাশাপাশি ডায়াবেটিস ও হৃদরোগও হতে পারে। আবার একটানা একই ভঙ্গিতে বসে থাকার ফলে ঘাড় বা পিঠে ব্যথাও হতে পারে।
সাধারণত দীর্ঘক্ষণ কোনো বিষয়ের ওপর একাগ্রতা ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব। সর্বোচ্চ এক বা দুই ঘণ্টা রাখা সম্ভব। টানা কাজের মাঝে দম নেওয়ার জন্য হলেও কিছু সময় প্রয়োজন। এটা না করলে, হয় আলসেমি চলে আসবে, নয়তো শরীর খুব ক্লান্ত লাগবে। মনে হবে, একটু শুয়ে থাকতে পারলে হয়তো ভাল লাগবে। কিন্তু ছোট্ট একটা বিরতি নিলেই ক্লান্তি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। আবার টানা কাজ করলে চোখ সবসময় সেটা সহ্য করতে পারে না। চোখের বিশ্রাম লাগবেই। দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটারে তাকিয়ে কাজ করলে প্রথমে চোখ জ্বালাপোড়া করতে পারে।
বিবিসির এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০০৮ সালে যুক্তরাজ্যে একটি গবেষণা পরিচালনা করে গবেষকরা দেখতে পেয়েছিলেন যে, একটি কোম্পানির ব্যায়ামাগারে কাজের ফাঁকে ব্যায়াম করেছেন, এমন দুই শতাধিক কর্মচারী অন্য কর্মচারীর কাজে উৎপাদনশীলতা বেশি। কর্মচারীরা প্রতিদিনের কাজের মাঝে যে দিনগুলোয় তারা ব্যায়াম করেছেন, সেসব দিনে কাজ শেষে তারা মনভরা সন্তুষ্টি নিয়ে বাড়িও ফিরেছেন।
২০১৩ সালে, অন্য একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, বয়স নির্বিশেষে, মানুষ নিয়মিত পরিমিত ব্যায়াম করার কারণে মেধার উন্নয়নে তাৎক্ষণিক উপকারিতা পেয়েছে।
কীভাবে বিরতি নেবেন
প্রতি ১-২ ঘণ্টা কাজের মাঝে ৩-৫ মিনিটের জন্য বিরতি নিন। বসে কাজ করলে উঠে দাঁড়ান। অফিসের ভেতরে একটু হাঁটুন। মোদ্দাকথা, একটু সময়ের জন্য হলেও চেয়ার ছেড়ে উঠুন। হাত ও পায়ের বিভিন্ন জোড়া বা অস্থিসন্ধি নাড়ান। সম্ভব হলে হালকা ব্যায়ামও করতে পারেন। কোনো কোনো অফিসে ব্যায়ামাগার আছে। অনেকে কাজের ফাঁকে যোগব্যায়ামও করে থাকেন, যা অত্যন্ত উপকারী।
চেয়ারে বসে অবস্থায় পা মেঝে থেকে অল্প ওপরে তুলে দুই পায়ের পাতা ওপর দিকে করে শরীরের দিকে টেনে রাখুন দশ সেকেন্ড। এবার ছেড়ে ঠিক উল্টো দিকে পায়ের পাতা ঠেলে দিন। এইভাবে দশ সেকেন্ড রাখুন। আবার চেয়ারে বসেই পা মাটিতে ঠেকিয়ে রাখুন। এবার শরীরের উপরের অংশ একদিকে যতটা সম্ভব ঘোরানোর চেষ্টা করুন। আবার বিপরীত দিকেও একইভাবে ঘোরান। দিনে অন্তত দশবার করে এই ব্যায়াম করুন চেয়ারে বসে।
যারা কম্পিউটারে কাজ করেন, তারা বিরতিতে চোখ, ঘাড় এদিক-সেদিক নাড়ান। চোখে পানির ঝাপটা দিতে পারেন। সুযোগ হলে বাইরের আকাশ দেখে আসুন। এতে চোখে আরাম পাবেন, মনও ভালো থাকবে।
শুধু কাজের বেলায়ই নয়, দীর্ঘকালীন বিশ্রামেও হতে পারে বিপদ। অনেকেই বাড়িতে দীর্ঘক্ষণ বসে টিভি দেখেন, বা একটানা কম্পিউটারে গেম খেলেন। এতেও আপনার ক্ষতি হতে পারে। তাই মাঝে মাঝে উঠে হেঁটে আসুন, এতে আপনার শরীর ও মন উভয়েই ক্ষতি থেকে বাঁচবে।
রহাদুর রহমান কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নরত।
farhadrahman702@gmail.com