ধ্বংস পাহাড় বইটা চুপিচুপি দিলো কামাল। সে সময় আমরা ক্লাস সিক্সের ছাত্র। ’৬০-এর দশকে চাঁদপুরের গণি স্কুলের যে কয়জন ‘নাটক-নভেল পড়ে’, পাঠ্য বই বাধ্য না হলে পড়ে না তাদের অন্যতম এই কামাল। এ দলে আরও ছিল খলিল (ধনী ব্যবসায়ী মো. খলিলুর রহমান) এবং মোহন (চক্ষু বিশারদ, বারডেমের আই বিভাগের সাবেক প্রধান, অধ্যাপক ডা. হজরত আলী)। নাওয়া-খাওয়া ভুলে গোগ্রাসে গল্পের বই পড়ার সে দৃশ্য – এখনও চোখে ভাসে। মনে হয় এই গতকাল বিকালের কথা!
‘একদিনে পড়ে ফেরত দিতে হবে,’ বই সতর্কতার সঙ্গে দিতে দিতে শর্ত জুড়ল কামাল। প্রথমে মনে হলো তাড়াহুড়া করছে কেন গাধাটা! কিন্তু পড়তে যেয়ে সময় উড়ে গেলো। একদিন নয়, পড়া সম্ভব এক বেলাতেই। বা কয়েক ঘন্টায়!

হ্যাঁ, এর আগেই পড়েছি দীনেন্দ্রকুমার মিত্র, নীহাররঞ্জন গুপ্ত, জরাসন্ধ, যাযাবর, শরদিন্দু, শংকর, তারাশংকর, কুয়াশার (একজন লেখক) বই। পড়েছি দস্যু মোহন আর স্বপনকুমারের বইগুলো।
না। এমন ধ্বংস পাহাড়ের মতো টানটান (কেউ কেউ বলে টনকে টন) উত্তেজনায় ভরপুর এমন গতিশীল কাহিনী পড়িনি আগে। কথা বলার ভাষাকে তুলে আনা হয়েছে বইতে। বিশেষ করে ভাষাকে তিনি ভাসিয়ে দিলেন নতুন স্রোতে। ঠিক এভাবেই সে সময় বুঝেছিলাম তা নয়। বুঝেছি ধীরে ধীরে। এই প্রথম থ্রিলারের একটা নতুন ভাষা সৃষ্টি হয়েছে। এ কথা এখন আর নতুন নয়। বলেন অনেকেই। মাসুদ রানার সৃষ্টি পথ ধরেই বাংলাকে এ ভাবে সমৃদ্ধিশালী করা হয়। তবে এজন্য কোনও ঢাক-ঢোল পেটানো হয় নি।
সেই ধ্বংস পাহাড় পড়ার পর থেকেই হা করে বসে থাকতাম কবে আসবে নতুন মাসুদ রানা। কুয়াশা সিরিজের বই কে আগে পড়বে তা নিয়ে আমাদের দুই ভাইয়ে কামড়া-কামড়ি হতো। এ সমস্যার সমাধান হলো ‘সহজেই।’ দু’জনে দু’টো কুয়াশা কিনতাম সে সময়। আর বিদ্যুৎ মিত্রই যে কাজী আনোয়ার হোসেন সে কথা জানলাম পরে।
এর মধ্যে, কামাল একবার ঢাকায় গেল বেড়াতে। এসে সগৌরবে জানাল, সেগুনবাগান মানে সেবা প্রকাশনী ঘুরে এসেছে। সে সাথে, যতটুকু মনে হয় জানাল, কাজী আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে দেখা করতে সাহস পায়নি।
কামালের বাবার চাকরি বদলীর। মেট্রিক পরীক্ষা আগেই ছাড়ল ওরা চাঁদপুর। শুনেছি, ওরা কুমিল্লায় ছিল অনেক দিন। কামালের সঙ্গে আর দেখা হয়নি আজও। অবশ্য, রহস্যপত্রিকার প্রথম সংখ্যায় কামালের চিঠি ছাপা হয়েছিল। সাথে ছিল তার ছবিও।
রহস্যপত্রিকা
১৯৮৪ সাল থেকে রহস্যপত্রিকা দ্বিতীয়বার বের হতে থাকে। সে সময় সাহস করে ফোন করলাম কাজী ভাইকে। সে আলাপের সূত্র ধরেই শুরু হলো রহস্যপত্রিকায় লেখালেখি। সে সময়ই চাক্ষুষ করলাম কাজী ভাইকে। প্রাণবন্ত। জটিলতাহীন। সরস । এবং ব্যবহারবান্ধব ব্যক্তিত্ব। সবার সঙ্গেই সমান তালে চলায় দক্ষ এ ব্যক্তিত্ব তাপ বিলায় না, জ্যোৎস্নায় ভাসায়। আমি ‘কাজী ভাই’ বলেই সম্বোধন করে আসছি যদিও পাঠকের কাছে তিনি ’কাজী দা ‘ বলে অধিক পরিচিত।
লেখকের টাকা-কড়ির ব্যাপারে নগদ বিদায়ে বিশ্বাসী সম্পাদক ও প্রকাশক কাজী আনোয়ার হোসেন। রহস্যপত্রিকায় লিখলে সম্মানী পাওয়া যায়। ঘোষণাই দেওয়া আছে। সাধারণভাবে, মাসের পয়লা তারিখে পত্রিকা বের হয়। সম্মানী ৭ তারিখের মধ্যেই মেলে। ছুটির ফাঁদে পড়ায় ১০ বছরে দুইবার এর ব্যতিক্রম দেখলাম। কাজী ভাইকে বললাম, এটা কোনো কথা হলো, দশ বছরে দুই দুইবার টাকা পেতে দেরি হলো!
তিনিও বললেন, ‘তাইতো, এটা কোনও কথা হলো!’ সাথে সাথে নিয়ম বদলানো হলো। নতুন নিয়মে ছুটি থাকলে আগের দিন দেওয়া হবে টাকা। সম্মানীর তারিখ এগুলো। পেছাল না।
সে সময়ের রহস্যপত্রিকার সন্ধ্যার আড্ডাটা ছিল আনন্দদায়ক এবং উপাদেয়। চা-চানাচুরের খরচ দিত রহস্যপত্রিকা । সহকারী সম্পাদক শেখ আবদুল হাকিমের হাত দিয়ে বাতিল হয়ে যাওয়া অসংখ্য চিঠিপত্র ও লেখাগুলোর ঠাঁই হতো ওয়েস্টপেপার বাস্কেটে। এর সাথে অন্যদেরটাও যোগ হতো। সেগুলো বিক্রি করে একমাসের চা-চানাচুর হবে- এমন একটা কথা ছিল তখন। সে সময় আরেক সহকারী সম্পাদকদের অন্যতম নিয়াজ মোরশেদ (প্রিন্স) এবং শিল্প সম্পাদক আসাদুজ্জামানের (পরে তিনি সহকারী সম্পাদকের কাজও করেছেন কিছুদিন) সঙ্গে আজীবনের খাতির জমে ওঠে এ পত্রিকাকে লেখালেখি এবং আড্ডাকে কেন্দ্র করে। নিয়াজের অনুবাদ শি পাঠ্য তালিকাভুক্ত হওয়া উচিত, যেমন হওয়া উচিত আসাদের অনুবাদ ওজের যাদুকর । খাতির হয় ওসমান পরিবারকে কেন্দ্র করে মনকাড়া ওয়েস্টার্ন কাহিনীর লেখক রওশন জামিলের সঙ্গেও। এ সিরিজের ওয়েস্টার্নের ভাষার কারুকাজ সত্যিই অপূর্ব।
একবার আমার একটা লেখা কাজী ভাই নাকচ করে দিলেন। কিন্তু বিভাগীয় সম্পাদক নিয়াজ তা জানতেন না। তিনি ওটা আমাকে লেখার জন্য দিলেন। কাজী ভাইয়ের নিষেধের কথাটা নিয়াজকে আর বলিনি। পরে, কিভাবে এটা ছাপা হলো কাজী ভাই জানতে চাইলে বললাম,‘নিয়াজ দিয়েছে আমাকে।’
-‘হ্যাঁ তাকে তো মানা করা হয় নি। তবে ছাপা হওয়ার পর কিন্তু পড়তে ভালো লাগছে।’ খোলা মনেই স্বীকার করলেন কাজী ভাই।

রহস্যপত্রিকা প্রকাশের পর থেকে দেখা গেল, সম্মানী এবং সৌজন্য সংখ্যা নেয়ার পর নিয়মিত লেখকদের অনেকেই ডুব দিচ্ছেন। প্রয়োজনে পাওয়া যাচ্ছে না।
সে সময় কাজী ভাই ‘কঠোর’ হলেন। সম্মানীর টাকা রহস্যপত্রিকার দফতর থেকেই নেওয়া যাবে। সমন্বয়কারী দিতে পারবেন। কিন্তু সৌজন্য সংখ্যা দেবেন কেবল বিভাগীয় সম্পাদক! বোঝো ঠ্যালা! অবশ্য, এ জায়গায় আমি থাকলে হয়ত টাকাটাই আটকাতাম।
রহস্যপত্রিকা বিনা পয়সায় কোনও কাজ করায় না – কথাটাও ‘ঠেকে’ শিখলাম। আড্ডা দিচ্ছি। সে সময় আরেক সহকারী সম্পাদক রকিব হাসান জানতে চাইল, ‘মূসা, ব্যস্ত?’
অবাক হয়ে জবাব দিলাম, ‘কই, নাতো!’
‘তাইলে এই ছোট্ট জিনিসটা অনুবাদ করে দেন।’
জিনিসটা আর কিছুই না একটা চুটকি। হাসতে হাসতেই অনুবাদ করলাম। পরের মাসে সম্মানীর টাকা দেখলাম বেড়েছে। ওই চুটকি অনুবাদের টাকা যোগ হয়েছে।
‘কিন্তু আমি তো টাকার জন্য অনুবাদ করি নাই।’
‘রহস্যপত্রিকা মাগনা কোনও কাজ করায় না,’ চাঁচা ছোলা জবাব রকিবের।কিশোর থ্রিলার সিরিজ তিন গোয়েন্দা লিখে তিনি তখন দারুণ জমিয়ে ফেলেছেন, কিশোরকুলে ভক্ত বাড়ছে প্রতিদিন।
এর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। একটা ফিচার জমা দিলাম নিয়াজের কাছে। ওটা মনোনীত হওয়ার পর একটা বিশেষ ধরনের ছবির কথা বলল নিয়াজ।
‘একটা বইতে দেখেছি। বায়তুল মোকাররমের কাছে বইটা বিক্রি হয়।’ বলে দ্রুত সেবা থেকে বের হয়ে রিকশা নিয়ে ছুটলাম বায়তুল মোকাররম। বইটা কিনে আনলাম। দিলাম নিয়াজকে।
‘কোথা থেকে পেলেন?’ জানতে চাইল ও।
‘বায়তুল মোকাররমের সামনে থেকে নিয়ে আসলাম।’
বইটার দাম এবং যাতায়াতে রিকশা ভাড়া কতো কতো লেগেছে জেনে নিল নিয়াজ। তারপর বলল, ‘এ টাকাটা সম্মানীর টাকার সঙ্গে পেয়ে যাবেন।’
বললাম, ‘বইটা আমার কাজে লাগবে। দাম দেওয়ার দরকার নেই।’
‘ছবির কাজ শেষে বইটা নিয়ে যাবেন। আর রহস্যপত্রিকার কাজে লাগছে তাই দামটা এখান থেকেই নেবেন।’
প্রতিবাদ করে লাভ হয়নি।
মোটর সাইকেলে রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা
কাজী ভাই দুর্দান্ত মোটর সাইকেল চালাতেন। সে কথা অনেকেই জানেন। তবে এ বাবদ আমার অভিজ্ঞতা প্রায় রোমহর্ষক। ধানমণ্ডি লেক নিয়ে একটা ফিচার করার কথা ছিল। (করা হয়নি আমার গাফলতির জন্য।) সে জন্য কয়েক জনের সাথে আলাপ করিয়ে দিতে আমাকে নিয়ে লেকের দিকে চলেছেন কাজী ভাই। সায়েন্স ল্যাবের কাছাকাছি এলাকায় এক তরুণ বড়ো চাকার চকচকে কাওয়াসাকি মোটর সাইকেল নিয়ে কাজী ভাইয়ের ভেসপাকে ভুল ভাবে ওভারটেক করার চেষ্টা করল। কাজী ভাই বললেন- ‘মূসা শক্ত হয়ে বসেন।’
কথা শেষ করার আগেই পুরানো ভেসপা গর্জে উঠল। গতি ধা করে বেড়ে গেল। তরুণ বেশি দূর যেতে পারে নি। তাকে ধাওয়া করলেন কাজী ভাই। ভেসপার দাবড়ানির এক পর্যায়ে সড়ক ছেড়ে সোজা ফুটপাতে উঠে যেতে বাধ্য হলো তরুণটি। আর ততক্ষণ কানে পানি ঢুকেছে যে ভেসপার চালক দক্ষ। তাকে সম্ভ্রম করতে হবে।
আমার মনে হলো, ‘এই না হলে মানায় মাসুদ রানার স্রষ্টাকে! রানার মোটর সাইকেল চালানোর হাতেখড়ি হয়েছে নিশ্চিতভাবেই কাজী ভাইয়ের কাছে! আল্লাহ জানে, হয়ত রাহাত খানেরও গুরু তিনি!’
syed.musareza@gmail.com
[আজ ১৯ জুলাই বাংলা রহস্যসাহিত্যের পুরোধা এবং একাধারে লেখক, অনুবাদক, সম্পাদক ও প্রকাশক কাজী আনোয়ার হোসেনের ৮৫তম জন্মবার্ষিকী। সেবা প্রকাশনীর কর্ণধার ও মাসুদ রানার স্রষ্টাকে শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা জানাতে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের এই নিবেদন]
