Loading...

কাজী আনোয়ার হোসেন: টুকরো স্মৃতি

| Updated: January 21, 2022 17:33:20


কাজী আনোয়ার হোসেন (১৯৩৬-২০২২) কাজী আনোয়ার হোসেন (১৯৩৬-২০২২)

কাজী ভাইয়ের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল (শেখ আবদুল) হাকিম ভাইয়ের ইন্তেকালের দিনটিতে। হোয়সাটঅ্যাপে ফোন করার সময় ভয় ছিল হয়ত ধরবেন না তিনি। ওটা তাঁর বিশ্রামের সময়। কিন্তু না তিনি ধরলেন।

শেখ আবদুল হাকিম অতি অমায়িক এবং সরল ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে গভীরভাবে ব্যথিত হয়েছেন কাজী আনোয়ার হোসেন। আমি ফোন করলে তিনি বলেন, (সেবার কর্মী) মাসুমের কাছ থেকে খবরটা পেয়েছেন। হাকিমের মৃত্যু সংবাদটা যে তাঁকে বেশ কষ্ট দিয়েছে, সেটা কথাও বললেন। কাজী ভাইয়ের কণ্ঠে এ সময়ে ফুটে ওঠে শোকের আভাস। আলাপ আর সেদিন বাড়াইনি। বিশ্রামের সময়ে ফোন করে বিরক্ত করা….. না, কথা শেষ করতে দেননি তিনি। ফোন করে কোনো ভুল করিনি, বিরক্ত হওয়ার প্রশ্নই আসে না। জানালেন তিনি।

রহস্যপত্রিকার ৩৮ বছর পূর্তি নিয়ে লেখার আগে হোয়াটসঅ্যাপে আরেক দফা ডাক(কল) দিয়েছিলাম কাজী ভাইকে। ওপাশ থেকে শুনতে পেলাম নারী কণ্ঠ। কণ্ঠটি কাজী ভাইয়ের ছোট ছেলে কাজী মায়মূর হোসেনের (রিংকু) সহধর্মিণী এবং রহস্যপত্রিকার উপদেষ্টা  মাসুমা মায়মুরের। (এখানে বলে নেই, মায়মূর ও তাঁর বড় ভাই কাজী শাহনূর হোসেন ওরফে টিংকু এখন রহস্যপত্রিকার দুই সহকারী সম্পাদক।)  জানলাম কাজী ভাই অসুস্থ। টিউমার ধরা পড়েছে। চিকিৎসক তাকে পরীক্ষা করছেন। এখন তিনি কথা বলতে পারবেন না।

এরপরই এ মাসের  ৪ তারিখে ইমেইল পাই রিংকুর। ‘সালাম নেবেন, মূসা চাচা। আপনার দেয়া সালাম আব্বাকে পৌঁছে দেব। সবসময় দোয়া করি বিদেশে আপনারা যেন ভাল থাকেন।  আব্বার শারীরিক অবস্থা খুব নাজুক।  আমাদের আব্বার জন্যেও দোয়া করবেন। আপনি সময় নিন, মূসা চাচা। আপাতত বিজ্ঞান বার্তা লাগছে না। দশ দিন পর পেলেও চলবে।

ভাল থাকুন।-রিংকু।’

জানুয়ারির ১৯ তারিখে হোয়াটসঅ্যাপ বেজে উঠল। ফোন করেছে ঢাকা থেকে তানিম। জানাল। -‘কাজীদা মারা গেছেন।’ (ইন্নালিল্লাহ...রাজিউন)। ল্যাপটপে বসা। কোনো খবর তো চোখে পড়েনি। আমার কথার জবাবে ও আবার বলল, মিনিট দশেক আগে খবর পেয়েছে। প্রিন্সের (সেবার পুরানো লেখক-অনুবাদক নিয়াজ মোরশেদ) সঙ্গেও কথা হয়েছে। খবরটা সেই নিশ্চিত করেছে।

আবার চোখ বুললাম। না সংবাদ মাধ্যমে তখনো আসেনি শোকে খবরটা।

মনে হলও- ভুলও হতে পারে! কিংবা গুজব!

দুই.

কাজী ভাই চমৎকার গল্প করতে পারতেন। তার গল্প বলা যারা শোনেননি তাদের জন্য এটা বিরাট ক্ষতি। তাঁর গল্পের ভান্ডার ভরে ছিল নানা কাহিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে এক রোগী দেখতে যান তিনি। সাথে ছিলেন তাঁর এক বন্ধু। রোগী কাজী ভাইদের দেশের বাড়ির এবং গরিব। তার অবস্থা দেখে এতোই মায়া হয় যে বৃত্তির পুরো টাকাই রোগীকে দিয়ে দেন কাজী ভাই।

ফেরার পথে কিছুদূর এসে কাজ আছে বলে বন্ধুটি ভিন্ন পথ ধরে। দুয়েক দিন পরে আবার রোগী দেখতে যান কাজী ভাই। রোগী যেন কি বলতে যেয়েও বলেন না। এরপরও কয়েক দফা গেছেন রোগী দেখতে। এক সময়ে সংকোচ ঠেলে রোগী জানাল, তুমি যে বন্ধুকে দিয়ে টাকাটা ফেরত নিলে আর তো দিলে না!

ঘটনা প্রথমে বুঝতেই পারেননি কাজী ভাই। ব্যাখ্যা শুনে বুঝলেন। টাকা দিয়ে সেদিন বের হয়ে আসার পর বন্ধুটি রোগী কাছে উপস্থিত হয়। তাকে ধীরে-সুস্থে বুঝিয়ে বলেন, আপনার অবস্থা থেকে আনোয়ার তার সব টাকাই দিয়ে দিছে। তার কাছে এখন কোনো টাকাই নেই। ও তো চলতে পারবে না। আপনি টাকাটা দিন – দুই তিন দিনের মধ্যে ও টাকা পাবে তখন এসে দিয়ে যাবে টাকাটা। সরল বিশ্বাসে টাকা বন্ধুকে দিয়ে দেন সে রোগী।

রোগী দেখে ফেরার পথে বন্ধুটির ভিন্ন পথ ধরার বিষয়টি এবারে পরিষ্কার হলও কাজী ভাইয়ের কাছের। বারবার অনুরোধ করার পরও ঐ ‘বন্ধু’টির নাম বলেননি কাজী ভাই।  আশির দশকে সেগুন বাগিচায় কাজী মঞ্জিলে কাজী ভাইয়ের দোতালায় পড়া-লেখা ও সম্পাদনার ঘরটিতে বসে এ গল্প শুনি।

প্রবাস জীবনের শুরু হয় ১৯৯৭ সালের মাঝামাঝি। তারপরও ঢাকায় গেলে দেখা করেছি কাজী ভাইয়ের সাথে। সে সময়েও নামটি জানতে চেয়েছি। যথারীতি বলেননি। ২০০০ সালের পরে এক সময়ে প্রশ্ন করি, আপনার সেই বন্ধু কী পরবর্তীতে কোটিপতি হয়েছিলেন এবং এখন কোথায় থাকেন? প্রথম প্রশ্নের হ্যাঁ সূচক জবাব দিয়ে তিনি জানান, মিরপুরের দিকে বিশাল বাড়ি বানিয়েছেন সেখানেই থাকে। তার এই টাকা বানানোর পেছনেও কী এমন কাহিনি আছে? জবাবে হাসলেন।

তিন

কাজী ভাই নিজের বিয়ে নিয়ে গল্প করেছেন মজা করেই। তাঁদের বাসায় ঘন ঘন আসতেন কণ্ঠশিল্পী ফরিদ ইয়াসমিনের ছোট বোন নীলুফার ইয়াসমিস। বার্তাবাহক হয়ে আসত কিনা সে কথা জিজ্ঞাসা করার কথা মনে হয়নি তখন। একদিন কাজী ভাইয়ের বাবা (ড. কাজী  মোতাহার হোসেন) বলেন, “নীলুফারের সঙ্গে তোমার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আমরা যাচ্ছি ওদের বাসায়।”

কাজী ভাই থামালেন তাঁর বাবাকে। “না, না, নীলুফার নয়, ফরিদার জন্য প্রস্তাব নিয়ে যান,” বলেছিলেন তিনি। সেটা ষাটের দশকের গোড়ার কথা। উল্লেখ্য, কাজী আনোয়ার হোসেনের সাথে ফরিদা ইয়াসমিনের বিয়ে হয় ১৯৬২ সালে। রেডিওতে গান গাইতে গিয়ে পরিচয়। সেখান থেকে পছন্দ। তারপর পরিণয়।

চার

কাজী ভাইয়ের বাবা মারা যাওয়ার পর অনেকেই শোক প্রকাশ করে চিঠি দিয়েছেন। এসব ক্ষেত্রে বিখ্যাত ব্যক্তিদের সে সময়ে চল ছিল কাগজে বিজ্ঞাপন সবার প্রতি গণকৃতজ্ঞতা জানান। সে সাথে এও জানান, সময়ে অভাবে ব্যক্তিগতভাবে জবাব দিতে না পারায় দুঃখিত। কাজী ভাই প্রচলিত পথ ধরলেন না। জবাব দিলেন ব্যক্তিগতভাবে। তখন মাসুদ রানাসহ সেবার বিভিন্ন বইয়ের শেষে আলোচনা বিভাগে পাঠকের প্রশ্নের জবাব দেওয়া হতো। সেখানেই অনেকের নাম প্রকাশ করে জানালেন, ঠিকানা না থাকায় ব্যক্তিগত জবাব দিতে না পারায় দুঃখিত। জাতিকে কাজী ভাই সৌজন্য শেখালেন নিজে তা করে, শুকনা উপদেশ দিয়ে নয়।

পাঁচ

কাজী ভাইকে বলেছি, রহস্যপত্রিকার মতো চালু একটি মাধ্যম হাতে আছে। তাতে নিয়মিত আপনার জীবনের গল্পগুলো আমাদের শোনান। ভদ্রলোকের এক জবাবের মতোই উনি বলতেন, মরার ফুরসত নেই। লেখার সময় পাই কোথায়? শেষে বলেছি, লেখার দরকার নেই। বলে যান। রেকর্ডের ঝামেলা সেল ফোন আসার পর শেষ হয়ে গেছে। এমপিথ্রিতে ফাইল রাখলে জায়গাও নেবে অল্প। পরে না হয় লেখা যাবে –সময় ও সুযোগ করে। কথাটা তাঁর ভালো লেগেছে বলেই মনে হয়েছিল। মেনেছে  কিনা – তা এখনো জানা নেই।

কাজী ভাইয়ের গল্প বলার দুর্দান্ত ক্ষমতা ছিল। এ রকম ক্ষমতা না হলেও হিংসা ধরানোর মতেই ক্ষমতা রয়েছে সেবার খ্যাতনামা লেখক আসাদুজ্জামান, নিয়াজ মোরশেদ বা রওশন জামিলের। প্রত্যেকের ঝুলিতে রয়েছে চমকে দেওয়ার মতো গল্প। কাহিনি। বা ঘটনা। কিন্তু ‘নিজ ঢোল পেটানোর’ ভয়েই কিনা জানি না তাঁরা কেউ সে পথ মাড়ায় তা। রওশন ছাড়া বাকিদের রেকর্ড করার ‘সুবুদ্ধি’ দিয়েছি। সুযোগ পেলেই দেই। রওশনকে  যুতসই মতো নাগালে পাইনি। তাই এমন ‘ঘ্যান ঘ্যান’ করার সুযোগ হয়নি।  এ ক্ষেত্রে কাজী ভাইয়ের ছায়া তাদের ওপর থেকে সরে যাক। গল্প না লিখুক। অন্তত বাণীবদ্ধ করুক। তাদের স্বর শুনতে পাবো। এটাই একান্ত ইচ্ছে। প্রাণভরে কামনা।

ছয়.

বাংলা ভাষাকে থ্রিলার লেখার উপযুক্ত করার পুরো কৃতিত্ব কাজী আনোয়ার হোসেনের। এর আগে এমন ভাবে আর কেউ লেখেননি। আমাদের এক বন্ধুর ভাষায়: ‘বিদেশি গপ্পো এমন ‘আত্মীয়’করণ করতে পারে নাই আর কেউ। সেবার বই বিশেষ ‘কইরা’  মাসুদ রানা পড়ার সময় মনে হয় পড়তাছি না দেখতাছি। কাহিনি মনের মধ্যে পুরাই একটা সিনেমা চালু করে দ্যায়।’

ভাষার এ রূপান্তরে কাজী ভাইয়ের ভূমিকা ব্যাপক আলোচনার অবকাশ রাখে। ভাষার কাজে যারা দিনরাত উৎসর্গ করেছেন তাদের কেউ এগিয়ে আসবেন। হয়ত আজ নয়, অন্য দিন।

 এ ছাড়া, বিদেশি কাহিনিকে ‘আত্মীয়’করণের বিদ্যার গণশিক্ষা কার্যক্রম মনে হয় কাজী ভাই চালু করেন সেবার মাধ্যমে।  ‘স্কুল খুইল্যাছেরে কাজী স্কুল খুইল্যাছে’ বলে সুরেলা কণ্ঠে কেউ গান ধরার হক রাখে এ বাবদ। এমন ‘স্কুল’ আমাদের লেখার জগতে বিরল। বা অভূতপূর্ব। সেবার এ ধারাপ্রবাহ থামবে না সে আশা করতে পারি আমরা।

সাত

আশির দশকের শেষ দিকের কথা। আমাদের এক অতিপ্রিয় খালু অসুস্থ হয়ে ঢাকায় সোহরওয়ারদি হৃদরোগ ইন্সটিটিউটে ভর্তি হয়েছেন। সন্ধ্যারাতে খবরটা পেলাম। শেষ রাতে খবর পেলাম তিনি নেই। ইন্তেকাল করেছেন। সকালে খালু লাশ এসে পৌঁছায়নোর পর বাড়িজুড়ে কান্নার রোল। শত শত মানুষের উপস্থিতি নারায়ণগঞ্জের ঐ বাসায়। ছোট ছেলেটিকে দেখিয়ে আম্মা আমাকের বললেন, ‘ওকে আমাদের বাসায় নিয়ে যা।’ ভারি চশমা চোখে নবম শ্রেণীতে পড়া সুবোধ বালক আমার সাথে বাসায় চলে এলো। অনেকবার বলল- ‘উহ! কি বিপদ। বলেন তো ভাই, কি বিপদই না হলও।’  বাসায় এসে সে বলল- ‘ভাই, আপনার রহস্য পত্রিকাগুলো আমাকে দিবেন।’

’অবশ্যই। শুধু তাই না। সেবার যা বই আছে সব তুই নিয়ে যা। অন্য বইও নিতে পারস।’

বেছে বেছে সেবার বই আর সব কয়টি রহস্যপত্রিকা নিলো। বাসায় যতক্ষণ ছিল মগ্ন হয়ে ছিল ওতে।

বই বিশেষ করে সেবার বইয়ের প্রতি মুগ্ধতা তাকে টেনে নিয়েছে অনেকদূর। সৃজনশীল লেখকের কাতারে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে, যদিও বেশি লেখেনি । সুসাংবাদিক হিসেবে নাম করেছে । কাজী ভাই ও সেবা প্রকাশনীর সাথে সখ্যতা গড়েছে। কাহিনিটা বললাম। পরিচয় ইচ্ছে করেই পুরো প্রকাশ করলাম না।

আমার স্মৃতির সত্যিই কোনো শক্তি নেই। ভুলে যাই বিশাল সব ঘটনা। অন্যদিকে তুচ্ছ কাণ্ড মস্ত হয়ে মনজুড়ে থাকে। এ ঘটনাও বহুকাল মনেই গেছিল হারিয়ে । কাজী ভাইয়ের ইন্তেকালের খবর পেয়ে এক ঝলকে মনে আবার তা ভেসে উঠল। 

সেবার বই কীভাবে টেনে ধরে রাখতে পারে – তার উদাহরণ তুলে ধরতেই এ ঘটনাকে এখানে এনেছি। পাঠককে তার চরম দুঃসময়ে মোহমুগ্ধ করতে পারাই কাজী আনোয়ার হোসেনের সার্থকতা। কেবল মোহমুগ্ধ করে না পাঠককে চলার শক্তিও যোগায়। এখন বুঝি, পাঠকের মাঝেই চিরজীবী হয়ে রবেন কাজী আনোয়ার হোসেন।

syed.musareza@gmail.com

 

আরো পড়ুন:

‘মাসুদ রানা’র স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেন আর নেই

‘কাজীদাকে মনে হয়েছিল মেজর জেনারেল রাহাত খান’

কাজী ভাই, রহস্যপত্রিকা এবং দুর্দান্ত মোটর সাইকেল

বাংলা প্রকাশনার ভিন্ন বিপণন মডেল

Share if you like

Filter By Topic